সুন্দরবনে ডুবে যাওয়া জাহাজ ৪দিনেও উদ্ধার হয়নি

সুন্দরবনের নদীতে সারের বিষ ছড়িয়ে পড়ছেসুন্দরবন থেকে ফিরে : পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা নদের বিমলের চর এলাকায় ৫০০ মেট্রিক টন পটাশ সার নিয়ে ‘জাবালে নূর’ নামে জাহাজ ডুবি ঘটনার চার দিন অতিবাহিত হলেও এখনো উদ্ধার কাজ শুরু হয়নি। তবে বনবিভাগের নিজস্ব তৎপরতায় শুধু গলিত সার অপসারণের চেষ্টা চলছে।

এঘটনায় বনবিভাগের পক্ষ থেকে বাগেরহাটের শরণখোলা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও বনবিভাগের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বুধবার (৬ মে) সকাল ১০টায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর আলম, খুলনা অঞ্চলের বনসংরক্ষক (সিএফ) ড. সুনীল কুমার কুন্ডু, পূর্ব বনবিভাগ বাগেরহাটের ডিএফও মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী ও কৃষি বিভাগ বাগেরহাটের উপপরিচালক (ডিডি) মো. জয়নুল আবেদীন।

তারা বলছেন, পটাশ সার গাছপালার জন্য উপকারী। এই সার পানিতে মিশলেও তাতে নদীতে চলমান জলজ প্রাণির কোনো ক্ষতি হবেনা। তবে, শামুক ও ঝিনুক প্রজাতির কিছু জলজ প্রাণির সামান্য ক্ষতি হতে পারে। অপরদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, সারের রাসায়নিক বিষক্রিয়া জলজ প্রাণির জন্য ক্ষতিকারক।  এটি তেলের চেয়েও আশঙ্কাজনক বলে তারা দাবি করেন।

বুধবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জাহাজটি এখনো পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। সারের লাল পুরু আস্তরণ নদীর পানিতে ভাসছে। বনবিভাগের শ্রমিকরা বালতি ভরে গলিত সেই সার তাদের ট্রলারে তুলছেন। ঘটনাস্থলে ওই জাহাজের মালিক পক্ষ বা মাষ্টার-নাবিক কাউকেই পাওয়া যায়নি। তারা ঘটনার পর পরই পালিয়ে গেছে। এছাড়া মঙ্গলবার আসা উদ্ধারকারী জাহাজ এমবি নুসরাত-ই-হক ও এমবি তছির উদ্দিনও ওই দিন রাতে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেছে বলে বনবিভাগ জানিয়েছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শণকালে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ড্রেজার দিয়ে সার তোলার চেষ্টা করা হবে। ডুবে যাওয়া জাহাজের সার বিদেশ থেকে আমদানিকৃত। ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. শফিকুল ইসলামকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিন দিনের মধ্যে তাদেরকে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক আরো বলেন, বিকল্প রুট চালু না হওয়া পর্যন্ত সুন্দরবনের অভ্যন্তর থেকে সিমিত পরিসরে জাহাজ চলাচল করার নিদের্শনা দেয়া হয়েছে। মংলার ঘষিয়াখালী নৌ-চ্যানেল চালু হলে সুন্দরবন থেকে জাহাজ চলাচল বন্ধ করা হবে।

খুলনা অঞ্চলের বনসংরক্ষক (সিএফ) ড. সুনীল কুমার কুন্ডু বলেন, মঙ্গলবার সারবাহী জাহাজ ডুবির খবর পেয়েছি। ডুবে যাওয়া জাহাজের মালিক পক্ষের কোনো লোকজনের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব না হওয়ায় বনবিভাগের তৎপরতায় সার অপসারণের কাজ চলছে। বাগেরহাটের ডিএফও মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীকে প্রধান করে বনবিভাগের পক্ষ থেকে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, পটাশ সার জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর নয়।

বাগেরহাটের কৃষি বিভাগের উপপরিচালক (ডিডি) মো. জয়নুল আবেদীন বলেন, পটাশ সার পানিতে মিশলেও চলন্ত মাছ বা ডলফিনের তেমন কোনো ক্ষতি হবেনা। তবে শামুক, ঝিনুকসহ ক্ষুদ্র কিছু জলজ প্রাণির ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

সুন্দরবন বিষয়ক বেসরকারি গবেশনা সংস্থা সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেমনের চেয়ারম্যান ড. ফরিদুল ইসলাম বলেন, সারের রাসায়নিক বিষক্রিয়ায় জলজ প্রাণির মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

খুলনা বিশ্ব বিদ্যালয়ের এ্যাগ্রো টেকনোলজি বিভাগের প্রফেসর সরদার সরিফুল ইসলাম জানান, সার গলে পানির গুণগত মান ও  জলজ প্রাণির ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এটি তেলের চেয়েও কম ক্ষতিকারক নয়। সুন্দরবনে বার বার এধরেণের জাহাজ ডুবির ঘটনা সুন্দরবন বিপর্যয়ের কারণ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ অতুল মন্ডল জানান, তিনি মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে জাহাজের কিছু কাগজপত্র জব্দ করেন। এতে আমিনুল ইসলাম গং নামে মালিক পক্ষের একটি নাম পাওয়া গেছে। জব্দকৃত কাগজপত্র যাচাইবাছাই করা হচ্ছে।

শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. কামাল আহমেদ জানান, ডুবে যাওয়া জাহাজের মালিক বা অন্য কারোর নাম ঠিকানা না পাওয়ায় অজ্ঞাতদের আসামী করে মঙ্গলবার রাতেই শরণখোলা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়ে।

উল্লেখ্য, গত ৩ মে বিকেল ৫টার দিকে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা নদের মরাভোলা বিমলের চর এলাকায় ডুবো চরে ধাক্কা লেগে ‘জাবালে নূর’ নামের মেসার্স আল এহসান শিপিং লাইন্স (এম-৬৯৪৩) এর জাহাজটি ডুবে যায়।

//শেখ মোহাম্মদ আলী/ উপকূল বাংলাদেশ/শরণখোলা-বাগেরহাট/০৬০৫২০১৫//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য