হাত বাড়ালে ওরাও হবে আলোকিত মানুষ

অবহেলায় বেড়ে ওঠা দুই কন্যাশিশুখুলনা : ওরা অবহেলিত শিশু। সুশিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বেড়ে ওঠার নানা দিক থেকে সুবিধাবঞ্চিত হয়েই ওদের দুনিয়াতে আসা। কিন্তু সামান্য সহায়তা ও দিকনির্দেশনা পেলে ওরাই ওদের মেধার বিকাশ ঘটাতে পারবে- হয়ত হতে পারবে সুযোগ্য-আলোকিত এক-একজন।কিন্তু সেই উদ্যোগটা যদি রাষ্ট্রের, সমাজের বা আমাদের না থাকে তবে হয়ত তারা সেই অবহেলিত-বঞ্চিতই থেকে যাবে। ওদের পাঠশালায় যাওয়া, সন্ধ্যা-প্রদীপ জ্বালিয়ে বর্ণ পরিচয়ে বসানো- সর্বোপরি ওদের শিক্ষিত হয়ে, যোগ্য মানুষ হয়ে গড়ে ওঠা হবে-কি হবে না- তা যে অনিশ্চয়তায় ও বাধার প্রাচীরে ঘেরা। ওরা বেদে পল্লীর শিশু।

খুলনা-মংলা খুলনা-সাতক্ষীরা সড়কের পাশে অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি ও ফাঁকা জমিতে মাঝে মধ্যে বিভিন্ন স্থান থেকে বেদেরা এসে আস্তানা গড়ে। ওখানে ওদের ২৫/৩০টি ছাপড়া ঘর। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, প্রায় প্রত্যেকটি ঘরের সামনে মহিলারা টিনের চুলায় রাতের রান্না বসিয়েছে, কেউ রান্নার আয়োজন করছে। কয়েকজন মহিলা গোল হয়ে বসে গল্প করছে। পুরুষরা দু’-একজন বসে জ্বালানী কাঠ কাটছে, বাকীরা অলস ভঙ্গিতে বসে আছে।

ছাপড়া ঘর থেকে একটু দূরে খোলা পশ্চিমে খোলা মাঠে বেদে পরিবারের শিশুরা বল নিয়ে মনের আনন্দে দৌড়াদৌড়ি করে খেলছে। গোধূলীর সোনালী আলো ওদের স্নান না করা মলীন বিবর্ণ চেহারাকে সযত্নে ঢেকে দিয়ে যেন পরম আদরে খানিকটা সোনালী করে দিয়েছে। দৃশ্যটা ভারী সুন্দর। কোনো শিল্পীর চোখে পড়লে হয়তবা তার তুলির আঁচড়ে একটি অনন্য কাজ বেরিয়ে আসত। কিন্তু এদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করলে সচেতন যে কেউরই একটা বেদনা সমস্ত হৃদয় মনকে আচ্ছন্ন করে দিবে। কারণ ওদের জীবন অবহেলা ও বঞ্চনায় ঘেরা।

ওরা খোলা মাঠে তীব্র শীতে, মুষলধারে বৃষ্টিতে অথবা দুরন্ত ঝড়ে মাঠের ঘাসে ময়লা বিছানায় শুয়ে রাত কাটাবে। মানবশিশু হয়েও মানবেতর জীবনের পথে ওরা নির্বিকারে হেঁটে যাবে। মেয়ে শিশুটি একদিন বড় হয়ে ওর মায়ের মতোই শালীনতাহীনভাবে শরীর প্রদর্শনের মাধ্যমে বাত সারানোর মত অদ্ভুত পেশাগ্রহণ করবে। সেখানে ভাল আয় না পেলে হয়ত শহরের ভিড়ে কিশোরী মা হয়ে, কোলে নোংরা খাড়ি ওঠা চুলের একটি বাচ্চাকে নিয়ে জবরদস্তী ভিক্ষার পেশা নিবে। আর ছেলেগুলি বড় হয়ে পান খাওয়া দাঁত আর অপরিচ্ছন্ন শরীর নিয়ে ছাপড়া পাহারা দিবে। আর সময় সুযোগ মতো সাপ ধরা, বা কোনো বাজারে গাছ-গাছড়ার ওষুধ বিক্রির মত প্রতারণামূলক পেশায় নিয়োজিত হবে।

বেদেদের একজন চব্বিশ-পঁচিশ বছরের তুরতুরি বেগম জানালেন, দাঁতের পোকা, মাজার ব্যথা সারিয়ে তাদের জীবন চলে। সংসার চালাতে যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে শিশুদের পড়াবে কীভাবে? তা ছাড়া কবে বাড়ী ফিরবে তা কেউ জানে না সেখানে স্কুলে পাঠাবে কেমনে? তার মতে, তাদের যাযাবর জীবনে শিশুদের শিক্ষা দেওয়া সুযোগ বা বাস্তবতা নেই।

একই কথা বেদে বোরহান সরদার আর নাসরীন বেগমের। তারা জানালেন, এখন আর সাপ ধরা হয় না, গ্রামের গরীবরা ছাড়া তাদের কাছে কেউ ব্যথার চিকিৎসা করায়ও না। ফলে ক্রমেই তাদের আয়-রোজগার কমে গেছে বা আরও কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় শিশুদের স্কুলে পাঠানো কীভাবে সম্ভব? তাদের দাবী সরকার যদি তাদের কাজ দেয়, তাহলে তারা কোনো রকম খেয়ে পরে বাচঁতে পারে, শিশুদেরও ভবিষ্যতের কথা ভাবতে পারে। তারা জানালেন, জন্ম থেকে বাপ-দাদারা যা করেছেন, তারাও তা-ই করছেন; তাদের ছেলে-মেয়েরও তাই করবে বৈকি!

সময় বদলেছে। আজ আর সাপ খেলা আমাদের শিশুদের বিনোদন দেয় না। আমাদের শিশুরা কম্পিউটারে গেম খেলে, ইন্টারনেটে বিশ্ব ভ্রমণ করে। তাই সাপের খেলার ব্যবসা আর আগের মতো জনপ্রিয় নেই। তার উপর সাপ ধরাও নিষেধ। অথচ আমাদের সন্তান ও বেদেদের সন্তান- সবাই এই বাংলাদেশের সন্তান। এরপরও আমাদের শিশুরা যখন কম্পিউটারে বিশ্বকে হাতের মুঠোয় নিয়ে সম্ভাবনাময় আগামী পৃথিবীর পথে হাঁটছে, তখন এই বেদে শিশুরা ওদের বাবা-মায়ের অভিশপ্ত যাযাবর জীবনের কারণে শিক্ষার আলো থেকে ছটকে পড়ছে। আমরা কেউ-ই কি ভাবছি তাদের কথা? তারা শেওলার মতো ভেসে চলেছে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।

অবশ্য খুলনা সমাজসেবা অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মাহবুবা রহমান জানালেন, সরকারের হরিজন, হিজড়া ও বেদেদের জন্য নানা প্রকল্প রয়েছে, তবে খুলনা অঞ্চলে এখনও এই বেদে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। এ ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টি রয়েছে বলেও তার দাবী ।

এদিকে এই ভাসমান বেদে পরিবারের সংখ্যা কত তার কোনো পরিসংখ্যান নাই। কিন্তু এটা তো নিশ্চিত, ঐ শিক্ষাহীন, স্বাস্থ্যহীন, মূল্যবোধহীন, সম্ভ্রম-শালীনতাহীন ভাসমান পরিবারগুলি থেকে যে মানব শিশুরা বেরিয়ে আসছে, তারাও চলেছে তেমনি নিকষ কালো অন্ধকারের দিকে। ওদের জন্য আলো জ্বালাতে না পারলে আমাদের সামাজিক উন্নয়ন পূর্ণতা পাবে কি?

সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন পরিমাপকে পার্শ্ববর্তী ভারতের তুলনায় এ দেশ বহুদূর এগিয়ে গেছে। চলেছি আমরাও অগ্রযাত্রার দিকে। এই অগ্রযাত্রায় ওদের কি আমরা সাথে নেব না ?

ওরা কি আমাদের সন্তান নয়? তবে ওরা কেন অন্ধকারের পথ হারাবে? ওদের জন্য দেশ কি পারে না একটি স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা দিতে? কোনো কর্মসংস্থান দিতে? যেখানে মায়েরা শালীনতার সাথে বাচ্চাদের নিয়ে বসবাস করবেন। সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বেলে বর্ণ পরিচয়ের বইটি সামনে দিয়ে পাশে বসে মা তার নকশী কাঁথায় ফুল তুলবেন। ওরা স্কুলে যাবে। ওরা ধীরে ধীরে আলোকিত মানুষ হয়ে উঠবে।

ঐ গোধূলীবেলার সোনালী আলো যেমন করে পরম আদরে ওদের বাহ্যিক সব মলীনতাকে ঢেকে দিয়ে ওদের আলোকিত করছে, আমাদের ভালবাসাময় পরিকল্পিত ও সমন্বিত পদক্ষেপ কি ওদের হৃদয়কে আলোকিত করতে পারে না? রাষ্ট্র-সমাজ-ব্যক্তি বা আমরা যদি একটু হাত বাড়ায়, তাহলে হয়ত ওদের আগামীপ্রজন্মের জন্য তা হবে অন্যরকম এক জীবনের কারণ- ওরাও হবে আলোর পথযাত্রী। সূত্র : দ্য রিপোর্ট

//ডেস্ক উপকূল বাংলাদেশ/০৩০৪২০১৫//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য