শিশুর কাঁধে কাজের বোঝা সারা বছর

ঝালকাঠির চরাঞ্চলের অবহেলিত শিশুঝালকাঠি : নাইলনের বস্তা, টিনের  প্লেট আর ভাঙা ঝুড়ি মাথায় নিয়ে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ে নয়ন। হাড্ডিসার শরীর নিয়ে খেয়ে না খেয়ে ছোটে হাসপাতাল-ক্লিনিক, অফিস-আদালত, বাসা-বাড়ির পিছনে এবং নর্দমা ও ডোবায়। সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরে সিরিঞ্জ, সুচ, স্যালাইনের প্লাস্টিক ব্যাগ, বর্জ্য প্লাস্টিসহ নানা বর্জ্য কুড়ায়। সন্ধ্যায় তা ভাঙারী বিক্রেতাদের হাতে জমা দিয়ে পায় ৫০ থেকে ৯০ টাকা। তাই দিয়ে দিন চলে তার।
শুধু নয়ন নয়, এভাবে ‘ভাঙারী কুড়ানো’ই বহু শিশুর পেশা। কেউ কেউ জীবন নির্বাহ করে তা ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে। এ দূষিত ও জীবাণুযুক্ত বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিষ্কার করা যে কত ভয়াবহ ঝুঁকির তারা জানে না তারা। শুধু জানে, হাত-পা আঙ্গুল পচে যায়, ঘা হয়, তাই নিয়ে পোহাতে হয় যন্ত্রণা। কিন্তু না করে উপায় কী?

অথচ হাসপাতাল ও ক্লিনিক সংশ্লিষ্টরাই বলছেন, এ জীবাণুবাহী বর্জ্য কোনোভাবেই বাইরে যাওয়ার কথা নয়। আবার তা পুড়িয়ে নষ্ট করার জন্য রয়েছে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, খরচ করা হয় বিপুল অর্থও। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। বরং অসৎ নার্স, আয়া, বয় ও কর্মচারীদের সঙ্গে যোগসাজশে এসব সিরিঞ্জ ও ব্যাগ পুনর্ব্যবহারও হয় প্রকাশ্যেই। এছাড়াও বিভিন্ন অফিসের পিছনে গিয়ে বর্জ্য প্লাস্টিকের সামগ্রীসহ নানা পরিত্যক্ত সামগ্রী কুড়িয়ে নেয় টোকাই শিশুরা। বাড়িওয়ালা বা স্থানীয়রা অনেকসময় টোকাই শিশুদের চোর বলে প্রচন্ড মারধরও করে থাকেন।

ঝালকাঠির সিটি পার্ক নতুন চর ও কলাবাগান এলাকায় ঘুরে অবহেলিত টোকাই শিশু-কিশোরদের সাথে কথা বলে জানাগেছে বিভিন্ন তথ্য।

সিটি পার্ক নতুন চর এলাকায় কথা হয় এগারো বছর বয়সী নয়নের সাথে। ৫-৬ বছর বয়স থেকেই সে বর্জ্য কুড়ানোর পেশায় নিয়োজিত। বাবা-মা থেকেও নেই, অবহেলিত ও অভাবী সংসারের শিশু হিসেবে শুধু রাতটিই বাসায় কাটায়। অথচ পড়াশোনা করতে চেয়েছিল সে। কিন্তু ‘সুযোগ চাই, মানুষ হব’ স্লোগানও দিতে পারেনি। বরং তীব্র মানসিক যন্ত্রণা নিয়েই বাধ্য হয়ে লাগে ভয়াবহ ঝুঁকির এ কাজে ।

একই কথা শিশু সুমনেরও। বলে, ‘এসব করতে একদম ভালো লাগে না। ময়লা-আবর্জনার ঘায়ে (আঘাতে) হাত-পা পইচ্চা (পঁচে যায়, পুঁজ বের হয়) থাকে। শুকায় না। ওই অবস্থায় কেউই আমাদের সঙ্গে মানুষের মতো ব্যবহার করে না। কারো কাছেই কোনো আদর-স্নেহ পাই না। কিন্তু শুধু বেঁচে থাকার জন্যই তা করতে হচ্ছে।

কলাবাগান এলাকায় গিয়ে কথা হয় কিশোর রুবেলের সাথে। রুবেলে সংগৃহীত (কুড়িয়ে আনা) প্লাস্টিকের বোতলের ভেতর জমে থাকা ময়লা পানি পরিষ্কার করছে। রুবেল জানায়, আরও ১২-১৩ শিশু বিভিন্ন বাসা-বাড়ির পেছন, ডোবা, নর্দমা ও ড্রেন থেকে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক ও কাঁচের বোতল সংগ্রহ করে।

এসব শহর ও শহরতলী এলাকার ভাঙারী ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ভাঙারী ব্যবসায়ী জানান, অবহেলিত শিশুরা পরিত্যক্ত বর্জ্য কুড়িয়ে এনে আমাদের কাছে সুবিধামত দামে বিক্রি করে। আমরা যদি ওদের নিয়ে আসা মাল না কিনি (ক্রয় করি) তাহলে ওরাতো আরো অবহেলার স্বীকার হবে। এমনিতেই হাড্ডিসার তারপরে বেঁচে থাকতেও কষ্ট হবে।

//মোঃ আতিকুর রহমান/ উপকূল বাংলাদেশ/ঝালকাঠি/১৬০৩২০১৫//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য