অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র সজ্জিত দস্যুদের ৫০টি গ্রুপ সাগরপাড়ে সক্রিয়

250px-coxs_bazaar_fishermen.jpgঅত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র সজ্জিত দস্যুদের ৫০টি গ্রুপ সাগরপাড়ে সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্রুপের কাছে রয়েছে স্পিডবোটের মতো নৌযানও। এ ডাকাতদের অত্যাচারে জেলেদের জীবন এখন ভয়াবহ হুমকির মধ্যে। উপকূলে প্রায় পাঁচ লাখ জেলের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে তাদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে। এমনিতেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভোগান্তি তাদের নিত্যসঙ্গী। তার ওপর ডাকাতদের দৌরাত্ম্যে তাদের জীবন-জীবিকা বিপন্ন হয়ে পড়েছে।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভোলা নোয়াখালী ও হাতিয়া উপকূল নিয়ন্ত্রণ করে বাহার কেরানী গ্রুপ, কালাম চৌধুরী গ্রুপ, রানী গ্রুপ, টাইগার গ্রুপ, লায়ন গ্রুপ, মহিউদ্দিন গ্রুপ, নিজাম গ্রুপ, হাতকাটা হারুণ গ্রুপ, সাদ্দাম গ্রুপ, গেইস্যা গ্রুপ, মুন্সিয়া গ্রুপ। তাদের প্রত্যেকের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্রসহ অর্ধশতাধিক সশস্ত্র দস্যুবাহিনী।

সম্প্রতি নোয়াখালীর হাতিয়া উপকূলে দস্যুদের হাতে খুন হয়েছে ১৫ জেলে। তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তাছাড়া নিখোঁজ হয়েছে অর্ধশতাধিক জেলে। হামলার শিকার হয়েছে অনেকে।

রহিমা বাহিনী, বাচ্চু, আহসান, এনাম, বাহার কেরানী, এবাদুল্লাহ, নাসু, জয়নাল স্পিকার, জিয়া, রাজু, জুলফিকার, মোতালেব, গামা, মোর্তজা, আল আমিন,আজমত, রশিদ, কালাম ডাকাত, রানী বাহিনী, মামুন, নূরনবী, সবুজ, আবুল, জামাল, শাহজাহান, মতিন, সোহরাব, ইয়াকুব, মনির, মামুন, জাম্বু, মজিবুর, আজমত, মতিন গ্রুপ, কালা সেন্টু, নান্টু, রনি, উজ্জ্বলের মতো জলদস্যুদের হাত থেকে রেহাই পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে জেলেরা।

বঙ্গোপসাগর ও আশপাশের এলাকায় মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত রয়েছে অন্তত ৫০ হাজার ট্রলার। বৃষ্টিবাদল আর ঝড়তুফান উপেক্ষা করে নদীতে মাছ ধরতে যায় জেলেরা। কিন্তু দস্যুদের কবলে পড়ার আশঙ্কা থাকে প্রতি মুহূর্তেই। চাঁদার দাবিতে মাছ ধরার ট্রলার, জেলে ও মাঝিদের অপহরণ করা হচ্ছে। মুক্তিপণ না দিলে হত্যা করে নদীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে যায় দস্যুরা।

এনিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ কারো যেন কোনো মাথা ব্যথা নেই। নেই কোনো দায় দায়িত্ব। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জলদস্যুদের এমন নৃশংসতায় যেন হার মানিয়েছে সোমালিয়ার জলদস্যুতাকেও। জেলেদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষে থেকেও কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। মাঝে মধ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নামমাত্র নানা কৌশল অবলম্বন করেও তাদেরকে আনতে পারছে না নিয়ন্ত্রণে। এনিয়ে চরম ক্ষোভ রয়েছে জেলেদের মধ্যে।

নদীতে দস্যুদের তাণ্ডবের পর সংবাদ কর্মীদের পক্ষে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও কোস্টগার্ড প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে অধিকাংশ সময় তারা বিষয়গুলো তাদের আওতাধীন নয় কিংবা নৌযানের দুর্বলতার কথা বলে এড়িয়ে যান।

অভিযোগ উঠেছে জলদস্যু কিংবা অন্য কোনো বিপদের কবলে পড়ে জেলেদের পক্ষ থেকে পুলিশ কিংবা কোস্টগার্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা কোনো সহযোগিতা করেন না। বরং জলদস্যুদের অনেক চিহ্নিত সোর্স আবার কোস্টগার্ডের সোর্স হিসেবেও কাজ করেন। ফলে আইনশৃংখলা বাহিনীর অভিযান শুরু না হতেই জলদস্যুরা খবর পেয়ে যায়।

ভোলা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, বরগুনা, কক্সবাজার, উখিয়া, মহেশখালীসহ উপকূলীয় সীমানায় গত এক বছর জলদস্যুরা ছিল অপ্রতিরোধ্য। একের পর এক নৌ-ডাকাতির ফলে জেলেদের দিন কাটে আতঙ্কে। এসব অঞ্চলের পাঁচ লাখ জেলে নিরাপদে জাল ফেলতে পারেনি। ঝুঁকি নিয়ে নদীতে গেলেই শিকার হতে হয়েছে হামলা, অপহরণ ও হত্যার।

গত ২৪ জানুয়ারি চরঈশ্বর ইউনিয়নের কাজীর বাজার সংলগ্ন মেঘনা নদীতে ভাসমান অবস্থায় ৫ জনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ৫ মার্চ উপজেলা নলচিরা ঘাটের কাছে পুলিশ জনতার ত্রিমুখী সংঘর্ষে কাঞ্চন নামে এক ডাকাত নিহত হয়েছেন। এসময় পুলিশ ৪টি বন্ধুক, ১০টি দেশীয় অস্ত্র ও ডাকাতির কাজে ব্যবহত ২টি ট্রলারসহ ১৫ ডাকাতকে আটক করে।

নোয়াখালী ও ভোলার মেঘনার ত্রাস নিজাম বাহিনীর প্রধান নিজামও এ মাসে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন। জলদস্যুদের প্রধানরা মারা ভেঙে যায়নি তাদের নেটওয়ার্ক। এদের অস্ত্রভাণ্ডার অক্ষত থাকায় এরা ফের নতুন নেতৃত্বে সংগঠিত হয়ে নতুন নতুন দলে বিভক্ত হয়ে চালিয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।

ভোলা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে মেঘনা ও সাগর মোহনায় ডাকাতি করার সময় পুলিশ ও দস্যুদের বন্দুকযুদ্ধে, গণপিটুনিতে মারা গেছে ১৪ দস্যু। চোখ তুলে নেয়া হয়েছিল ১২ জনের। গুলিবিদ্ধ হয়েছিল ৫ পুলিশসহ অর্ধশতাধিক দস্যু। উদ্ধার করা হয়েছে কিছু সংখ্যক অস্ত্রও।

গত ২৩ জানুয়ারি ভাসানচরে বন্দুকযুদ্ধে মজিদ বাহিনীর মজিদসহ নিহত হয় ৩ জন। গত বছরের ২৯ মে ঢালচরে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযদ্ধে নিহত হয় ৫ দস্যু। ৩০ মে ভাসানচরে ৮ দস্যুর চোখ তুলে নেয় স্থানীয়রা। ১৩ আক্টোবর মনপুরায় বন্দুকযুদ্ধে ৩ পুলিশ গুলিবিদ্ধ হয়। ওই সময় জলদস্যুদেরও ১২ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। আটক হয় ৫ জন।

জেলেরা জানায়, জেলার ৭ উপজেলায় মাছঘাটের সংখ্যা ৯৫টি। এদের মধ্যে গত এক বছরে ডাকাতির শিকার হয়েছে এক হাজার ট্রলার। একই চিত্র লক্ষ্মীপুরেরও।

গত ১ এপ্রিল সোমবার কক্সবাজারের কুতুবদিয়া বাশখালী সমুদ্র এলকায় জলদস্যুদের নৃশংসতার শিকার হয় অর্ধশতাধিক জেলে। এদের মধ্যে ২১ জনের লাশ উদ্ধার হলেও বাকিদের কোনো খোঁজ খবর পাওয়া যায়নি।

এ কিলিং মিশনে অংশ নেয় ৩০ ডাকাত। এর মধ্যে রয়েছে মহেশখালীর কালারমারছড়ার ইউনিয়নের চালিয়াতলী এলাকার ছাবের আহমদের ছেলে দেলোয়ার হোসেন টুইট্টা, বদিউল আলমের ছেলে ফরিদুল আলম, মনিয়া, উলা মিয়ার ছেলে নেজাম উদ্দিন নেজাইয়া, শেখ আহমদ, প্রকাশ (সেক্কা), নেয়ামত উল্লাহ মধু, জনু ডাকাত, বদি আলম বদ্দ্যা, সোনাইয়াসহ প্রায় ৩০ জন।

গত ৬ জানুয়ারি বরগুনা জেলার সোনাচর সমুদ্র চ্যানেল ১১ জেলেকে হত্যা করে থেকে ট্রলার ছিনতাই করে দস্যুরা। ১১ জানুয়ারি বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার নিকটবর্তী প্রায় ৫টি ফিশিং ট্রলারে ডাকাতির ঘটনায় নিখোঁজ ওয়া ৬ জেলে উদ্ধার হয়নি। তাদের লাশ কিংবা কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি এখনো। ১৭ জানুয়ারি নিখোঁজ হওয়া ৫ জেলের মধ্যে ১ জেলের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

২৭ জানুয়ারি কক্সবাজারের কাছে ২টি ফিশিং ট্রলারে ডাকাতির ঘটনায় গুলিবিদ্ধ ৬ জেলেকে উদ্ধার করে। সে ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছে ২৯ মাঝিমাল্লা।
২৬ জানুয়ারি অপর এক ট্রলার ডাকাতির ঘটনা ৩৫ মাঝি-মাল্লা নিখোঁজ হয়েছে। ৭ মার্চ বৃহস্পতিবার মহেশখালী ও কুতুবদিয়া চ্যানেলে ১১টি মাছ ধরার ট্রলারে ডাকাতির ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ ২৪ মাঝিমাল্লা আহত হয়েছে। ১১ অক্টোবর কক্সবাজার উপকূলবর্তী এলাকা থেকে ২টি মাছ ধরার ট্রলারসহ ২১ নিখোঁজ হয়েছে। তাদের কয়েকজন উদ্ধার হয়েও বাকিদের কোনো খোঁজ খবর পাওয়া যায়নি।

জেলেরা অভিযোগ, জলদস্যুদের ব্যাপারে পুলিশকে জানালে কোনো কাজ হয় না। বরং এজন্য আরও দস্যুদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়। তাই তারা জলদস্যুদের নেটওয়ার্কের সদস্যদের সঙ্গে আপোষ করে ২০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ট্রলার ছাড়িয়ে আনে। জলদস্যুদের চাঁদা পরিশোধ না করলে অনেক সময় হত্যার শিকার হতে হয়।

জেলে ও মাঝিদের অভিযোগ, সাগরে নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো টহল নেই। মাছ ধরার আড়ালে অনেক নৌকা ব্যবহৃত হচ্ছে ডাকাতি, চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।

এসব দস্যুর বিভিন্ন মাছ ধরার ঘাটে রয়েছে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। বিভিন্ন ঘাটের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে দস্যুদের লুটের শিকার হয়েছে সহস্রাধিক নৌকা-ট্রলার। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে কমপক্ষে ৫ হাজার জেলেকে অপহরণ করে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছাড়া হয়েছে। লুট করা হয়েছে ২ হাজার মাছধরা ট্রলার।

উপকূলে এসব দস্যুবাহিনীর কর্মকাণ্ডে দিশেহারা হয়ে বিভিন্ন সময়ে জেলেরা মিছিল সমাবেশ ও মনববন্ধন কর্মসূচি পালন করলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। ফলে চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার জেলের জীবন। জীবনের নিরাপত্ত দিতে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে তারা।

কোস্ট গার্ডের ভোলা দক্ষিণ জোনের ক্যাপ্টেন সেলিম রেজা হারুন নৌডাকাতদের নৃশংসতার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘এরইমধ্যে উপকূল থেকে নৌডাকাতরা গভীর সাগরকে বেছে নিয়েছে। গভীর রাতেও আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকে। কিন্তু সময়মতো সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। জনবল ও নৌযানের সঙ্কট রয়েছে। এরইমধ্যে আমরা শীর্ষ কয়েকজন ডাকাতকে গ্রেপ্তার করেছি। আমাদের এ অভিযান অব্যাহত আছে।’

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য