চলে গেলেন উপকূলের কৃতি সন্তান কাইয়ূম চৌধুরী

বরেণ্য চিত্রশিল্পী কাইয়ূম চৌধুরীঢাকা : কাইয়ুম চৌধুরী আর নেই, এক অনুষ্ঠানে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন উপকূলীয় জেলা ফেনীর কৃতি সন্তান এই বরেণ্য চিত্রশিল্পী।

রোববার (৩০ নভেম্বর) রাতে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে উচাঙ্গ সঙ্গীতের উৎসবে ব্ক্তৃতা রাখতে গিয়ে হঠাৎ পড়ে যান কাইয়ুম চৌধুরী। সঙ্গে সঙ্গে তাকে নেওয়া হয় কাছের ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ)। সেখানে চিকিৎসকরা দেখে তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে হাসপাতাল সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এরপর বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ওই উৎসবের মঞ্চ থেকে এই শিল্পীর মৃত্যুর কথা জানানো হয় এবং অনুষ্ঠানে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত কাইয়ুম চৌধুরীর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক জানিয়েছেন।

বেঙ্গলের সঙ্গীত উৎসবের তৃতীয় দিনের অনুষ্ঠান শুরুর আগে রাত সাড়ে ৮টার দিকে মঞ্চে উঠে বক্তৃতা রেখেছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। কাইয়ুম চৌধুরী বক্তৃতা দিয়ে নেমে যাওয়ার পর অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বক্তৃতা দিতে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু নেমে আবার ফিরে এসে কাইয়ুম চৌধুরী বলেন- ‘আমার একটি কথা বলার রয়েছে’।

কিন্তু সে কথা বলার আগেই ৮টা ৪০ মিনিটে হঠাৎ পড়ে যান কাইয়ুম চৌধুরী। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

এতে অনুষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে আবৃত্তিশিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় তখন বলেন, পড়ে গিয়ে কাইয়ুম চৌধুরী মাথায় আঘাত পেয়েছেন।

এরপর হাসপাতালে নেওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই কাইয়ুম চৌধুরীর মৃত্যুর কথা জানা যায়। কী কথাটি তিনি বলতে চেয়েছিলেন, তা আর জানা যায়নি।

বইয়ের প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জার পাশাপাশি তেল ও জল রঙে আবহমান বাংলা ও বাংলার লোকজ উপাদানগুলোকে চিত্রে আধুনিক ফর্মে ফুটিয়ে তোলার জন্য কাইয়ুম চৌধুরীর কৃতিত্বকে স্মরণ করেন তার অনুজরা।

১৯৩২ সালের ৯ মার্চ ফেনীতে জন্ম নেওয়া কাইয়ুম চৌধুরী ১৯৫৪ সালে ঢাকা আর্ট কলেজ থেকে ফাইন আর্টসে ডিগ্রি নেন। এরপর নিজের কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকায় মনোযোগী হয়েছিলেন তিনি।জহির রায়হানের ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ আঁকার মধ্য দিয়ে এই শিল্পে তার পদচারণা শুরু। বিশ্লেষকরা বলেন, বইয়ের প্রচ্ছদের শিল্পমানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী।

কবি শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’র প্রচ্ছদশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীই। সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম দিককার গ্রন্থগুলোর প্রচ্ছদও তার তুলিতেই আঁকা হয়।

১৯৫৭ সালে আর্ট কলেজে শিক্ষকতায় যোগ দেন কাইয়ুম চৌধুরী। আর্ট কলেজে নিজের দুই বছরের কনিষ্ঠ তাহেরা খানমকে ১৯৬০ সালে বিয়ে করেন তিনি।

ওই বছরই কাইয়ুম চৌধুরী আর্ট কলেজ ছেড়ে যোগ দেন কামরুল হাসানের নেতৃত্বে নবগঠিত ডিজাইন সেন্টারে। ১৯৬১ সালে ডিজাইন সেন্টার ছেড়ে অবজাভার হাউজে চিফ আর্টিস্ট হিসেবে যোগ দেন তিনি।

পরে ১৯৬৫ সালে আবার আর্ট কলেজে ফিরে যান কাইয়ুম চৌধুরী, চারুকলা ইনস্টিটিউট হওয়ার পর এর অধ্যাপক হিসেবে ১৯৯৭ সালে অবসর নেন তিনি।

প্রায় দুই দশক আগে দৈনিক প্রথম আলো বের হলে এর সঙ্গে যুক্ত হন কাইয়ুম চৌধুরী। এরপর থেকে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন তিনি।

শিল্পকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৬ সালে একুশে পদক লাভের পর ২০১৪ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার পান তিনি। এছাড়াও কাজের স্বীকৃতি হিসেবে শেলটেক পুরস্কার, সুলতান পুরস্কারসহ বহু দেশি-বিদেশি সম্মাননা পান তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নোট ডিজাইন এবং ম্যুরাল কমিটির সদস্য ছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। বাংলাদেশে প্রচলিত কয়েকটি টাকার নোটের ডিজাইন তারই করা। -বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর.কম থেকে সংগৃহিত

//ডেস্ক উপকূল বাংলাদেশ/৩০১১২০১৪//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য