‘স্কুলের ছারেরা কি পড়ায় কিচ্ছুই বুঝি না’

kalapara-jithi-pic-012610.jpgমিলন কর্মকার রাজু, কলাপাড়া।।  “মোরা আপার ধারে পড়লে স্কুলে ছারগো(স্যার) বকা খাই না। আপায় মোগো খুব ভালো কইর‌্যা বুজাইয়া দেয়। স্কুলের ছারেরা কি পড়ায় কিচ্ছুই বুঝি না”। এভাবেই নবম শ্রেনীর ছাত্রী জিথি বিশ্বাসের ছাত্র-ছাত্রীরা তার প্রশংসা করে। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার এসকেজেবি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেনীর ছাত্রী জিথি বিশ্বাস। নদীভাঙ্গন কবলিত লালুয়া ইউনিয়নের চান্দুপাড়া গ্রামের তাদের টিনসেট অর্ধভগ্ন ঘরটিই এখন জিথির পাঠশালা। আর এ পাঠশালায় সবার প্রিয় আপুর কাছে পড়তে আসে এ হতদরিদ্র গ্রামের ১২ শিশু। যাদের পরিবারে একমুঠো ভাতের জন্য নিয়মিত যুদ্ধ করতে হলেও জিথি তাদের শিক্ষিত করে তোলার চেষ্টা করছে নিজ উদ্যেগে।
লালুয়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার কাঁচা কর্দমাক্ত রাস্তা পায়ে হেঁটে চান্দুপাড়া গ্রামে পৌছতেই কলাপাড়া থেকে আসা আমরা একদল সংবাদকর্মী থমকে দাড়াই। দুপুর তখন দুইটা। এখন গ্রামের শিশুরা ঘুমিয়ে কিংবা খেলাকরে সময় কাটানোর কথা থাকলেও বাচ্চাদের আদর্শলিপি, নামতা পড়া, কারো কবিতা আবৃত্তির শব্দ শুনে আমরা এগিয়ে যেতেই দেখতে পাই ১৩/১৪ বছরের একটি মেয়ে তাদের পড়াচ্ছে। নিজেও সাথে পড়ছে ক্লাসের পাঠ্যবই। মাটির ঘরের বাড়ান্দায় বস্তা পেতে বসে আপন মনে পড়ছে শিশুরা। এ শিশুদের শিক্ষিকা জিথি ।
জিথি জানায়, তার পিতা মো. এনায়েত বিশ্বাস পেশায় একজন কৃষক। মা ফজিলাতুন্নেছা বেগম একজন গৃহিনী। তার ছোটভাই জিদান বিশ্বাস ৫ম শ্রেনীর ছাত্র। সে জানায়, তার এবং ছোটভাইয়ের প্রতিমাসে ১৫’শ থেকে দুই হাজার টাকা পড়াশোনার জন্য খরচ হয়। কিন্তু তার পিতার পক্ষে সবসময় এটা দেয়া অসম্ভব। তাই এ উদ্যেগ। তার বাসায় পাশ্ববর্তী গ্রাম থেকে সকাল-বিকাল ১২ জন শিশু আসে। যাদের পরিবার খুবই দরিদ্র। এ দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষিত করার জন্য এবং নিজেই নিজের কিছু পড়ার খরচ মেটানোর জন্য শিশুদের পড়াচ্ছি। তার ইচ্ছা বড় হয়ে দেশের জন্য কিছু করা। তাই দরিদ্র শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি।
এখানে পড়তে আসা দ্বিতীয় শ্রেনীর ছাত্র শওকত, প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী লিমা ও লিজা জানায়“ আপার ধারে পড়লে আর বাড়তে যাইয়া পড়া লাগেনা। এইহানেই সব মুকস্থ হয়। এইয়া ছাড়াও আমাদের বাড়িতে তো কারেন্ট নাই। আর ল্যামের আলোতে তো ভালো পড়াও যায়না”।
জিথির মা ফজিলাতুন্নেছা বেগম জানান, তার মেয়ে যখন প্রাইভেট পড়তে যায় তখন এ শিশুদের তিনিই পাঠদান করান। মাস শেষে তাকে জনপ্রতি খুশি হয়ে দুই/একশ টাকা দেয়। এটাই তাদের কাছে অনেক বলে জানান। তিনি জানান, এইগ্রামে অনেক বাচ্চা আছে যাদের পড়ালেখার ইচ্ছা থাকলেও আর্থিক সংকটের কারনে পড়তে পারছে না। এখানে যারা পড়তে আসে তাদেরও ঠিকমতো খাতা-কলম কিনতে পারে না। কিন্তু এ শিশুদের দিকে কেউ তাকায় না। এগিয়ে আসে না হতদরিদ্র শিশুদের শিক্ষা সহায়তায়।

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য