দ্বীপ মনপুরায় সংকটের শেষ নেই

arif-barosal-photo-23.jpgদেশের সর্বদক্ষিণে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মনপুরায় সংকটের শেষ নেই। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ সব ক্ষেত্রেই রয়েছে নানা সমস্যা। ফলে ভোলার এই দ্বীপের প্রায় দেড় লাখ মানুষের জীবন চলছে ধুঁকে ধুঁকে। দু’জন ডাক্তার দিয়ে চলছে সেখানকার ৩১ শয্যার হাসপাতাল। দারিদ্র্যতার কারণে শিক্ষায় পিছিয়ে আছে দ্বীপটি। সব মৌসুমেই ভাঙ্গণে গ্রামের পর গ্রাম বিলীন হয়। যোগাযোগ সংকটে দ্বীপের জীবনযাত্রার নানা স্তরে প্রভাব ফেলছে। বিচ্ছিন্ন এই ভূখন্ডের জেলেরা যুগ যুগেও মহাজনী দাদনের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছেনা।
তবে এত সংকটের মাঝেও মনপুরায় রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। দ্বীপের দক্ষিণে জেগে ওঠা চর ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্র। স্থাপিত হতে পারে শিল্প-কারখানা। তবে এজন্য যোগাযোগ ও বিদ্যুত সংকট কাটাতে হবে।
৩১ শয্যার হাসপাতালে দু’জন চিকিৎসক: মাত্র দু’জন চিকিৎসক দিয়ে চলছে মনপুরার ৩১ শয্যার উপজেলা হাসপাতাল। এরমধ্যে একজন অধিকাংশ সময় ছুটিতে থাকছেন। চিকিৎসকের ১১টি পদের মধ্যে বাকিগুলো খালি রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। মাত্র একজন চিকিৎসককে সামলাতে হচ্ছে বর্হিবিভাগ ও আন্তবিভাগের রোগীদের চাপ। চিকিৎসকের অভাবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের একমাত্র ভরসা নার্স।
সরেজমিন ঘুরে হাসপাতালের বারান্দায় রোগীদের ভিড় চোখে পড়ে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা ডাক্তারের অপেক্ষায় রয়েছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কক্ষের সামনের বেঞ্চে বসেছেন নারীরা। কক্ষের ভেতরেই রোগী দেখছেন চিকিৎসক। একজনের বের হওয়ার অপেক্ষায় অনেকজন। অন্যদিকে বর্হিবিভাগ থেকে স্লিপ নিয়ে কেউ কেউ ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। প্যারাসিটামলসহ কিছু সাধারণ ওষুধ হাসপাতালে পাওয়া যায়। বেশিরভাগ ওষুধ কিনতে হয় বাইরে থেকে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাসপাতালের সবগুলো বিভাগের অবস্থা শোচনীয়। বর্হিবিভাগে দু’জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও আছেন একজন। এক্সরে টেকনিশিয়ান থাকলেও মেশিন নেই। ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি নেই, টেকনিশিয়ান নেই। হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটার নেই। নেই পরিক্ষা-নিরীক্ষার কোনো ধরণের ব্যবস্থা। ডায়াবেটিস রোগীর গ্লুকোজ টেষ্ট করাতেও ছুটতে হয় ঢাকা। বিদ্যুত সংকটে হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যহত হয়। মনপুরায় সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত বিদ্যুত সরবরাহ করা হয়। দিনের মনপুরা থেকে বিদ্যুত বিহিন।
সংকটের কথা জানাতে গিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এএফএম রফিকুল হাসান বলেন, হাসপাতালে সব ধরণের চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ নেই। এখানে অপারেশনের ব্যবস্থা নেই। এমনকি ছোটখাটো পরিক্ষা নিরীক্ষার ব্যবস্থাও নেই এখানে। তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারিদের অনেক পদ শূণ্য রয়েছে। এভাবে একটি সরকারি হাসপাতাল চালানো কঠিন।
শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার কারণ দারিদ্র্যতা: নয় বছরের শিশু মমিন স্কুলে না গিয়ে বাবার সঙ্গে সাগরে মাছ ধরছে। বাড়ি মনপুরা উপজেলা সদরের কাছেই চর বোয়ালিয়া এলাকায়। বাবা আবদুল মালেক প্রায় ১৫ বছর ধরে সাগরে মাছ ধরে সংসার চালাচ্ছে। নিজের জমিজমা নেই। পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন সরকারি খাস জমিতে। অভাব-অনটনের সংসারে ছেলেকে স্কুলে না পাঠানোর চেয়ে মাছ ধরতে নেওয়া লাভজনক বলে মনে করছেন।
মনপুরার অধিকাংশ জেলে পরিবারের অবস্থা এমনই। হাজিরহাট, সাকুচিয়া, চর গোয়ালিয়া, রামনেওয়াজ, আন্দিরপাড়, কলাতলীসহ বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে একই চিত্র মেলে। সংসারে অভাব-অনটনের কারণে অভিভাবকেরা ছেলেমেয়েদের স্কুলে না পাঠিয়ে কাজে পাঠায়। প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার প্রায় ৪০ শতাংশ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যাও তূলনামূলক অনেক কম। কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর তূলনায় শিক্ষক কম। আবার কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষকের তূলনায় শিক্ষার্থী কম। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পর দীর্ঘদিন ধরে খালি রয়েছে। দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী শিক্ষা অফিসার।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই দুরাবস্থার প্রভাব পড়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পড়ছে বলে দাবি করেন দুই কলেজের অধ্যক্ষ। মনপুরা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার মান অত্যন্ত খারাপ। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানও ভালো নয়। এর প্রভাব পড়ছে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে। এখানকার শতকরা ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী মনপুরার বাইরে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পায়। বাকিদের এখানেই লেখাপড়া করতে হয়। এজন্য এখানকার একটি কলেজ সরকারিকরণ করা প্রয়োজন।
মনপুরার শিক্ষার সংকট প্রসঙ্গে মনোয়ারা বেগম মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. মহিউদ্দিন লেন, নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে মনপুরা অনেকটাই পিছিয়ে। শিক্ষার্থী কমছে বছরে বছরে। কলেজের প্রতিষ্ঠাকালে ২০০২-২০০৩ শিক্ষাবর্ষে ১১৭জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও পরের বছরই শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৩ জনে নেমে আসে। পরের বছরগুলোতে কোনো বছর শিক্ষার্থী কমেছে, কোনো বছর সামান্য বেড়েছে।
মহাজনী দাদনে জেলেরা বন্দি: চরজ্ঞানের জেলে মতলব বেপারি মহাজনের কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা দাদন নিয়েছিলেন সাত বছর আগে। মাছ বিক্রি করে এ সময়ে কমিশন হিসাবে ৭০ হাজার টাকা মহাজনকে শোধ করেছেন তিনি। তারপরও আসল টাকা শোধ হয়নি। আন্দিরপাড়ের জেলে আবদুল খালেক, জুয়েল মিয়া, সালাহউদ্দিন আহমেদ, সাকুচিয়ার জনতা বাজারের সাইফুল ইসলামসহ অনেকের অবস্থা এমনই। এভাবেই মনপুরার হাজার হাজার জেলে বন্দি হয়ে আছে মহাজনী দাদনের জালে।
জেলেরা জানান, মাছধরার জন্যে দাদন নিয়ে তারা নৌকা ও জাল কিনে নদীতে মাছ ধরতে নামে। দাদন নেওয়ার কারণে নির্ধারিত মহাজনের কাছেই মাছ বিক্রি করতে বাধ্য জেলেরা। প্রতিবার মাছ বিক্রির টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ কমিশন কেটে রাখে মহাজন। একবার দাদন নিলে দাদনের বৃত্ত থেকে জেলেরা আর বের হতে পারে না। ব্যাংকের ঋণ নীতিমালা মেনে জেলেরা ঋণ নিতে পারে না। তাদেরকে ব্যাংক ঋণ নিতে হয় কৃষক সেজে। কিন্তু তা অনেকের ভাগ্যেই মেলে না। একারণেই জেলেরা মহাজনী দাদনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ব্যাংক ঋণ প্রক্রিয়া আরও সহজ করে জেলেদের মহাজনী দাদনের হাত থেকে বাঁচানোর দাবি জানিয়েছেন জেলেদের।
সাকুচিয়ার জনতা বাজারের মৎস্য আড়তদার (দাদনদার) ওমর ফারুক জানান, ৯০টি জেলে নৌকায় দাদন দিয়েছেন তিনি। এতে দাদনের পরিমাণ প্রায় ৭০ লাখ টাকা। দাদন নিয়ে জেলেরা নির্দিষ্ট আড়তে মাছ বিক্রি করতে বাধ্য। এক সময় দাদন নিয়ে জেলেরা দাদনদারদের কাছে জিম্মি হলেও এখন আর সে অবস্থা নেই। দাদন নিয়ে জেলেদের অবস্থার উন্নতি রয়েছে।
বিচ্ছিন্নতাই বড় সমস্যা: যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সবদিক থেকেই পিছিয়ে রয়েছে মনপুরা। নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র যায় বাইরে থেকে। কোন কারণে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলেই সব পণ্যের দাম বেড়ে যায়। স্বাভাবিক সময়েও বিভিন্ন পণ্যের দাম অনেক বেশি থাকে। ভোলা থেকে তজুমদ্দিন হয়ে মনপুরা যেতে হয়। তজুমদ্দিন ঘাট থেকে বেলা ২টায় একটি সী-ট্রাক ছাড়ে মনপুরার উদ্দেশ্যে। তবে এ সী-ট্রাক অধিকাংশ সময়ই অকেজো থাকে। বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে রয়েছে ট্রলার। সকাল ১০টা ও দুপুর ২টায় দৈনিক দু’বার মনপুরা থেকে ভোলা যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য