ভিজিডি তালিকা তৈরিতে হরিলুট !

mdg-bangladesh-maternal-008.jpgমেজবাহউদ্দিন মাননু ॥ সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও সরকারি খামখেয়ালিপনা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতিকদের বিরোধের কারনে উপকূলীয় সাগরপারের কলাপাড়ায় সাতটি ইউনিয়নের দুই হাজার ৯১ দুঃস্থ মহিলা পরিবার ভিজিডির খাদ্যশস্য এখনও পায়নি। ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাস থেকে এই খাদ্য সহায়তা পাওয়ার কথা। ফলে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তার অংশ হিসাবে দুঃস্থ মহিলা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৪ মাসের ভিজিডি চক্রে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। নির্দেশনা মতে ২০১২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কলাপাড়ায় নির্বাচিত ৩৩৮৯জন দুঃস্থ মহিলাদের ভিজিডি কার্ড বিতরনের কথা রয়েছে।
একাধিক নির্ভরযোগ্য সুত্রমতে এখন পর্যন্ত সবক’টি ইউনিয়নের তালিকা সম্পন্ন করা হয় নি। ১২ টি ইউনিয়নের মাত্র পাঁচটি ইউনিয়নের ১২৯৮ পরিবারকে অতি সম্প্রতি এক সঙ্গে তিনমাসের খাদ্য শস্য বিতরণ করা হয়েছে। তাও প্রত্যেক পরিবারকে অন্তত নয় কেজি করে চাল কম দেয়া হয়েছে। লোপাট হয়েছে সাড়ে ১১ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তার নামে এখানে যেন চলছে হরিলুট। বাকিসব ইউনিয়নের তালিকা এখনও চুড়ান্ত করা হয়নি। আর তালিকা তৈরিতে চাঁদাবাজির পাশাপাশি পরিপত্রের নিয়ম কানুন উপেক্ষিত হয়েছে চরমভাবে। তালিকা তৈরিতে ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি ও সরকারি দলের তৃণমূল পর্যায়ের একশ্রেণীর কর্মীরা বহু দুঃস্থ মহিলাদের কাছ থেকে এক/দুই হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়ার এন্তার অভিযোগ রয়েছে। এভাবে তালিকাভুক্তিতে অন্ততপক্ষে ৩৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে দুঃস্থ পরিবারগুলোর কাছ থেকে। তালিকা তৈরিতে সরকারি নির্দেশনা মানা হয় নি এমন ভুরি ভুির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ধুলাসার ইউনিয়নের ২৫৬ জনের তালিকায় ১০৮টি নাম তালিকাভুক্তিতে অনিয়মের লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে। যেখানে এলাকার ভোটার নয়, অন্য সুবিধা পাচ্ছেন, বয়স ৪০ এর উর্ধে এমনসব মানুষকে অন্তর্ভূক্তির অভিযোগ দেয়া হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য ইউএনও একজন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন। এমনসব ব্যাপক অনিয়ম আর দুর্নীতির কারনে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি মারাত্মভাবে এখানে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে চরম দুর্দশাগ্রস্ত অত্যন্ত দরিদ্র দুই হাজার ৯১টি পরিবার সরকারি নির্দেশনার চার মাস পরেও খাদ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে।
সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের অধীনে ২০১২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর এক আদেশ বলে ২০১৩-২০১৪ ভিজিডি চক্রে উপজেলার নির্ধারিত এনজিওর সহযোগিতায় উপকারভোগী ভিজিডি (ভালনারেবল গ্রুপ ডেভেলপমেন্ট) মহিলা বাছাই সম্পন্নের নির্দেশ দেয়া হয়। বাছাইকৃত এসব দুঃস্থ মহিলারা টানা ২৪ মাস খাদ্য সুবিধা পাওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। প্রত্যেক মহিলা প্রতিমাসে ৩০ কেজি গম অথবা ২৪ কেজি ৩০০ গ্রাম চাল পাওয়ার কথা। যা জানুয়ারি মাস থেকে বিতরনের নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু আজ অবধি তালিকা চুড়ান্ত করা হয় নি।
অতিমাত্রায় খাদ্য নিরাপত্তাহীন অর্থাৎ যে পরিবারের সদস্যরা খাদ্যের অভাবে প্রতিদিন কোন না কোন বেলা খাবার খেতে পারেন না। প্রকৃত অর্থে ভূমিহীন, ১৫ শতক পর্যন্ত জমি নেই। বসতবাড়ির অবস্থা খুবই নি¤œমানের। অনিয়মিত দিনমজুর হিসাবে অতি সামান্য আয় করে এবং সুনির্দিষ্ট কোন আয়ের উৎস নেই। এছাড়া পরিবার প্রধান মহিলা এবং উপার্জনোক্ষম কোন পুরুষ সদস্য নেই। এইসব শর্তের মধ্যে চারটি শর্তযুক্ত মহিলারা ভিজিডির এই সুবিধা পাওয়ার কথা।
এছাড়া বাছাইকৃত মহিলার বয়স অবশ্যই ১৮ থেকে ৪০ বছর হতে হবে। অন্য কোন খাদ্য বা অর্থ সাহায্য প্রদানকারী কর্মসূচির আওতাভূক্ত থাকলে এবং ২০০৯ থেকে ২০১২ সালে একই চক্রে ভিজিডি কার্ডধারী থাকলে ওইসব মহিলা ফের এই সুবিধা পাবেন না।
তালিকা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউপি চেয়ারম্যানকে সভাপতি করা হয়েছে। এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের পুরুষ/মহিলা সকল সদস্য, সহযোগী এনজিও প্রতিনিধি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক (মহিলা অগ্রাধিকার), একজন মুক্তিযোদ্ধা, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের পুরুষ ও মহিলা দুইজন অধিবাসী, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কর্মীকে সদস্য এবং ইউপির সচিবকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া শুধুমাত্র কাগজে কলমে মানা হয়। অধিকাংশরাই জানেন না কাদের নাম তালিকাভূক্ত করা হয়েছে। একইভাবে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে উপদেষ্টা করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি, ভাইস চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে উপজেলা কমিটি করা হয়েছে। এক্ষত্রে যাচাই বাছাই প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু  এতাসব নির্দেশনা থাকার পরও এখন পর্যন্ত দুই সহ¯্রাধিক দুঃস্থ মহিলাদের তালিকা চুড়ান্তভাবে বাছাই করা এখনও সম্পন্ন হয় নি। ফলে অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে খাদ্য সহায়তা দেয়ার সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা এসব পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের উদাসীনতা এবং অনিয়মের কারনে ভেস্তে যাচ্ছে।
বর্তমানে সাগরপারের এই জনপদে গ্রামে কোন কাজ নেই। সাগরে মাছের আকাল। দরিদ্র নারীরা ভুগছে খাদ্য সঙ্কটে। এসব দুর্দশার কথা চিন্তা করেই সরকারিভাবে পরপর দুই বছর করে তিনবার ভিজিডির মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা দেয়ার কর্মসূচি চালু করেছে। কিন্ত্র ২০১৩-২০১৪ সালের এই কর্মসুচি বছরের চার মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত এক ছটাক খাদ্যশস্যও ভাগ্যে জোটেনি দুই সহ¯্রাধিক দরিদ্র মহিলাদের। এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, তালিকা তৈরির কাজ চুড়ান্ত করা হয়েছে। পাঁচটি ইউনিয়নে খাদ্যশস্য বিতরণ করাও হয়েছে। মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা বিপাশা দেবি তনু জানান,  এ পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি ইউনিয়নের তালিকা অনুমোদন হয়েছে, যাদের খাদ্যশস্য দেয়া হয়েছে। বাকি সাতটি ইউনিয়নের তালিকা নিয়ে যাচাই বাছাই শেষ পর্যায়ে। তাই সমস্যা হয়েছে। একাধিক ইউপি চেয়ারম্যানরা জানান, সরকার দলীয় কর্মীদের হস্তক্ষেপেরে কারণে সঠিকভাবে নাম তালিকাভূক্ত করতে তাদের সময় লেগেছে। অনেক দেরিতে হলেও অধিকাংশ ইউনিয়নের তালিকা জমা দেয়া হয়েছে বলেও চেয়ারম্যানরা জানিয়েছেন। তবে কয়েকটি ইউনিয়নের মেম্বারসহ একটি চক্রের বিরুদ্ধে তালিকা তৈরিতে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে তালিকা তৈরিতে হাজার হাজার টাকা নেয়ার অভিযোগ।

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য