উপকূলের কাছিম ও লাল কাকড়া বিলুপ্তির পথে

gianttortoise_112689_353082.jpgএক সময় দাদা নাতিকে গল্প শোনাতেন, ‘তোরে দইজ্যার চরত নিয়ুম, লাল কেয়ারা-ডর ডর কচ্ছপ দেখাইয়ুম।’ অর্থাৎ তোমাকে সৈকতের বালিয়াড়িতে নিয়ে লাল কাকড়া ও বড় বড় কাছিম দেখাব। পর্যটন শহর কঙ্বাজার সমুদ্র সৈকতে এখন আর চোখে পড়ে না ওইসব লাল কাকড়া ও বড় বড় কাছিম। সৈকতের বালিয়াড়িতে সৌন্দর্যবর্ধনকারী প্রাকৃতিক সম্পদ লাল কাকরা ও সামুদ্রিক কাছিম বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায়। বছর কয়েক আগে দেশ-বিদেশ থেকে ভ্রমণে আসা পর্যটকরা সৈকতে নেমে দেখতে পেত টকটকে লাল ঝাঁক বাঁধা সেই কাকড়া। মনে হতো সৈকত রাজ্যে বেড়াতে আসা অতিথিদের যেন লালগালিচা সংবর্ধনায় সম্মান ও আনন্দ দিচ্ছে সৌন্দর্যের প্রতীক প্রাকৃতিক জীব লাল কাকড়ার দল। পাশাপাশি ডিম পাড়তে কূলে আসা অসংখ্য কাছিমও সকলের নজর কেড়ে নিত সমানতালে। তবে সমপ্রতি পরিবেশবিরোধী কিছু ব্যবসায়ী অর্থের বিনিময়ে সৈকতে ঘোড়া ও বিচ বাইকের বেপরোয়া গতিতে চলাচলে তাদের পিষ্ট করছে প্রতিনিয়ত। ইদানীং তারা পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকা- শুরম্ন করায় হারিয়ে যাচ্ছে অপূর্ব সুন্দর লাল কাকড়া ও বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক কাছিম। এতে সৈকতের সৌন্দর্যের পাশাপাশি মারাত্মকভাবে ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের। সৈকতের সৌন্দর্য রক্ষার্থে থাকা ওসব প্রাকৃতিক জীব বিলুপ্ত হওয়ায় কঙ্বাজারবিমুখ হয়ে পড়েছে পর্যটকদের অনেকে। মনোরম সুন্দর প্রাকৃতিক জীব রক্ষায় পরিবেশবাদীসহ সংশিস্নষ্ট কারও কোন মাথাব্যথা নেই বলা চলে।
সমুদ্র সৈকতের হিমছড়ি সেনাক্যাম্প, ইনানী ও ডায়াবেটিক পয়েন্টের অদূরে উত্তরে এখনও নির্জন এলাকায় কিছু সংখ্যক লাল কাকড়া দেখা যায়। শীতকালীন ডিম পাড়তে এসে পরিবেশ বিধ্বংসী ওসব বিচ বাইক ও ঘোড়ার পায়ে পিষ্টসহ বিভিন্নভাবে মারা যাওয়া কিছু মৃত কাছিম সেখানে নজরে পড়ে প্রতিদিন। দেশের সৈকত রানী হিসাবে খ্যাত কঙ্বাজার-টেকনাফের দীর্ঘ ৮০ কিলোমিটার বিসত্মৃত সৈকতে সাগরের তলদেশের ঝাড়ুদার হিসাবে পরিচিত বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক কাছিম বালুচরে ডিম পাড়তে আসা কমিয়ে দিয়েছে। অনেকে বলছে, সমুদ্রে ওসব কাছিমের সংখ্যা কমে গেছে। এতে বাংলাদেশ সমুদ্রোপকূল ক্রমেই বিপন্ন হয়ে পড়েছে সামুদ্রিক কাছিমের অসত্মিত্ব। প্রতিবছর শীত মৌসুমের সময় কঙ্বাজার, টেকনাফ ও সেন্টমার্টিন সমুদ্র সৈকতের বালুচরসমূহ নিরাপদ স্থান মনে করে গভীর সাগরের এই কাছিমগুলো ডিম পাড়ার জন্য উঠে আসে। বিশেষ করে ডিসেম্বর থেকেই ঝাঁকে ঝাঁকে কাছিম সাগর থেকে উঠে আসে ঐ সব বালুচরে। এবারও যথারীতি গভীর সাগরের কিছু কিছু কাছিম ডিম দিতে আসছে চরে। কিন্তু এখন সৈকতে নির্জন পরিবেশ পাওয়াই যেন ভার। তাই কাছিম যত্রতত্র চরে উঠতে শুরম্ন করেছে ডিম পাড়তে। আর ডিম পাড়তে এসেই মৃতু্যর শিকার হচ্ছে সাগরের পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী এই সামুদ্রিক প্রাণীগুলো। সেন্টমার্টিনে মেরিন বায়োলজিস্ট (সামুদ্রিক জীব বিজ্ঞানী ) জানান, এক সময় সেন্টমার্টিন চরাঞ্চল সামুদ্রিক কাছিমের অভয়ারণ্য ছিল। এখন আর সেন্টমার্টিনে কাছিম ডিম দিতে উঠে আসছে না, সাগরে এই কাছিম প্রজাতি প্রাণী এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।
সচেতন মহলের মতে, সাগরে চিংড়ি আহরণে নিয়োজিত ট্রলার ও মাছ ধরার জালে আটকা পড়েই সিংহভাগ কাছিমের মৃতু্য ঘটেছে। অনেক জেলে আবার মাছ ধরার জালে কাছিম ধরা পড়াকে অশুভ মনে করে থাকে। ওই ধারণা কুসংস্কার হলেও জালে ধরা পড়া কাছিমকে তারা আছড়ে মারে। আদিবাসী এবং হিন্দু সমপ্রদায়ের কিছু কিছু লোক সামুদ্রিক কাছিমের ডিম খায়। স্থানীয় পরিবেশবাদীরা জানায়, সমুদ্র সৈকতে লাল কাকড়া ও কাছিম রক্ষায় বিচ বাইক ও ঘোড়াসহ ঝুঁকিপূর্ণ সকল প্রকার যান চলাচলে আইন চালু করার পাশাপাশি ওসব জীব প্রাণীদের চারণভূমি চিহ্নিত করতে হবে। এতেই অতীতের ন্যায় সৈকতজুড়ে লাল কাকড়া ও কাছিমসহ বিভিন্ন প্রজাতির উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব। জেলার বিশিষ্ট পরিবেশবাদী কলামিস্ট ফজলুল কাদের চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, সৈকতে ব্যাপক অব্যবস্থাপনার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়ের নজর কাড়া কাছিম ও লাল কাকড়া। বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকত কঙ্বাজারে বিলুপ্তপ্রায় জীব বৈচিত্র্যের মধ্যে আকষণর্ীয় ওসব প্রাণী। তাদের রক্ষা ও অতীতের ন্যায় সর্বত্র বিচরণ নিশ্চিত করতে সংশিষ্ট প্রশাসনসহ পবিবেশপ্রেমীদের পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে জনসাধারণ ও যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল বন্ধ, জীব প্রাণীদের চারণভূমি সংরক্ষণে সাইনবোর্ডসহ বিভিন্ন প্রকার প্রচার-প্রচারণা চালু করা দরকার। প্রাপ্ত তথ্য মতে, ইউএনডিপির সহায়তায় পরিবেশ অধিদফতরের বায়োডাইভার্সিটি প্রকল্পের আওতায় কঙ্বাজার উপকূলে কাছিম রক্ষায় কাজ করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় সোনাদিয়া দ্বীপে ২টি, সেন্টমার্টিন দ্বীপে ১টি ও টেকনাফে ৩টি হ্যাচারি স্থাপন করা হয়েছে। -সূত্র জনকণ্ঠ

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য