বঙ্গোপসাগরের জেগে উঠছে আরেক বাংলাদেশ

4157996057_c9c1025a10_z.jpgসাঈদুর রহমান রিমন।। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের তাজা রক্ত ঝরিয়ে, অসম ত্যাগের বিনিময়ে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এক স্বাধীন সার্বভৌম রাস্ট্র পাওয়া গেছে। অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের পৃথক মানচিত্র। ৪০ বছর পর আরেকটি যুদ্ধ ঘটে চলছে নিরবে, নিভৃতে- সে যুদ্ধ বিপ্লবে আরও ২০ হাজার বর্গমাইল ভূখন্ড মানচিত্রে সংযুক্ত করার প্রাণপন লড়াই শুরু হয়েছে। এ যুদ্ধে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে কাউকে শহীদ হওয়ার সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে না, সেখানে শুধু পরিকল্পনা মাফিক কাধে কাধ মিলিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের নোনাজল হটিয়ে তার বুকে গড়ে তোলা হচ্ছে একেকটি দ্বীপখন্ড-সৃজন হচ্ছে বনভূমি, গড়ে উঠছে বসতি। এরইমধ্যে বঙ্গোপসাগরের বুক জুড়ে প্রায় ২২০০ বর্গমাইল আয়তনের ভূখন্ড গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে, তৈরি হয়েছে নিঝুম দ্বীপের মতো দৃষ্টিনন্দন বনাঞ্চল। এ কাজ থেমে নেই, তবে চলছে বড়ই ঢিমেতালে। আছে অর্থ সমস্যা, জনবল সংকট-সর্বোপরি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিক গুরুত্বও পাচ্ছে না।
বঙ্গোপসাগরের বুকে দেখা দিয়েছে আরেক বাংলাদেশের হাতছানি। সেখানে সমুদ্রের অথৈ জলে প্রাকৃতিকভাবেই বিশাল বিশাল চর জেগেছে, গড়ে উঠেছে মাইলের পর মাইল ভূখন্ড। দীর্ঘদিন যাবত শুধুই ‘ডোবা চর’ হিসেবে পরিচিত বেশ কয়েকটি চরভূমি ইতমধ্যেই স্থায়ী ভূখন্ডে পরিনত হয়েছে। সেসব স্থানে জনবসতিও গড়ে উঠেছে। একই ধরনের আরো প্রায় ২০টি ‘নতুন ভূখন্ড’ এখন স্থায়ীত্ব পেতে চলেছে। বঙ্গোপসাগরে দুই-তিন বছর ধরে জেগে থাকা এসব দ্বীপখন্ড ভরা জোয়ারেও আর তলিয়ে যাচ্ছে না, বরং দিন দিনই বেড়ে চলছে এর আয়তন।
উপকুলীয় এলাকায় গবেষণা ভিত্তিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আই.ডব্লিউ.এম), এ্যাকচুয়ারি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইডিপি) ও সেন্টার ফর ইনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিস (সিইজিআইএস) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ শেষে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন, শিগগিরই ২২০০ বর্গ কিলোমিটার ভূখন্ড বাংলাদেশের মানচিত্রে যুক্ত হওয়ার নিশ্চিত সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ মুহূর্তে পানি ও পলির ক্ষেত্রে কিছু প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার পরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া খুব জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, সাগর বুকের ভূমি উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনার জন্য যেসব প্রযুক্তির প্রয়োজন, সেগুলো বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা ইতমধ্যে উদ্ভাবনও করেছেন। যে মুহূর্তে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরুপ প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের সিংহভাগ ভূখন্ড সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার আশংকায় বিশ্বজুড়ে তোলপাড় চলছে, ঠিক সে মুহূর্তেই বাংলাদেশে অভাবনীয় সম্ভাবনা জনমনে সীমাহীন আশা জাগিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, সমুদ্র বুকে জেগে ওঠা ৪০ হাজার হেক্টর ভূমিকে এখনই স্থায়ীত্ব দেয়া সম্ভব। পর্যায়ক্রমে এর পরিমান দুই লক্ষাধিক হেক্টরে বিস্তৃত হতে পারে। সেখানে বসবাস, চাষাবাদ ও বনায়নের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হবে বলেও আশা প্রকাশ করছেন তারা। নিঝুম দ্বীপের কাছাকাছি এলাকাতেও কয়েকশ’ বর্গকিলোমিটারের নতুন চর জেগে উঠেছে। সেখানে এখনই বসবাস উপযোগী ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাও সম্ভব। নেদারল্যান্ডস সরকারের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত এ্যাকচুয়ারি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (ইডিপি) এক জরিপ সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সাল পর্যন্ত শুধু নোয়াখালী উপকূলেই সাড়ে ৯শ’ বর্গকিলোমিটার ভূমি জেগে ওঠে। আবার ভাঙ্গনসহ নানা দুর্যোগে একই সময়ে ২ শতাধিক বর্গকিলোমিটার ভূমি নদীগর্ভে বিলীনও হয়ে যায়। যোগ-বিয়োগ করে প্রায় সাড়ে ৭শ’ বর্গকিলোমিটার ভূখন্ড টিকে আছে। উপকুলীয় জেলে-মাঝিরা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের জানিয়েছেন, সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে প্রায়ই তাদের নৌকাগুলো নতুন নতুন চরে আটকে যাচ্ছে। নিঝুম দ্বীপ থেকে ৩৫/৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে ভাটার সময় বড় বড় চরভূমির অস্তিত্ব থাকার তথ্যও জানতে পেয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু নতুন জেগে ওঠা চরগুলোকে পরিকল্পিতভাবে স্থায়ীত্ব দিতে সরকারি উদ্যোগ-আয়োজন চলছে ঢিমেতালে। বিষয়টি শীর্ষ পর্যায়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিক গুরুত্বও পাচ্ছে না। সমুদ্র বুকে সম্ভাবনার বিশাল আশীর্বাদ এসব নতুন ভূখন্ড পরিকল্পিত ব্যবহার, বনায়ন ও সংরক্ষণে সমন্বিত কার্যক্রম নেয়া হয়নি এখনও। ফলে প্রাকৃতিকভাবে ভূখন্ড জেগে ওঠার পাশাপাশি আবার ভাঙ্গনের সূত্রপাত ঘটছে, তলিয়েও যাচ্ছে কিছু কিছু অংশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের ২৯ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে সফরের সময় মুহুরি প্রজেক্টে জেগে ওঠা চরভূমির বিস্তারিত জেনে রীতিমত আপ্লুত হন। সাগরবুকে জেগে ওঠা ১৭ হাজার একর ভূমিতে তিনি শিল্প পার্ক নির্মাণেরও ইচ্ছা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রীর এ ইচ্ছা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়ার সভাপতিত্বে এরইমধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে বলেও জানা গেছে।
বড় বড় আয়তনের চরভূমি: ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আই.ডব্লিউ.এম) এর উপকুলীয় ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক জহিরুল হক খান সরেজমিন পরিদর্শন শেষে বলেন, ‘নঙ্গলিয়া এলাকায় নতুন জেগে ওঠা চরে গিয়ে মেঘনার মোহনা জুড়ে বড় বড় আয়তনের নতুন ভুখন্ড দেখা গেছে। সেসব চরের পরিণত জমিতে উড়ি ঘাস গজাতেও শুরু করেছে।’ তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, উড়িরচর থেকে জাহাজের চর পর্যন্ত ক্রসবাঁধ নির্মান করে এ মুহূর্তেই ৫৫ হাজার হেক্টর ভূমি উদ্ধার করা সম্ভব। এ জন্য ভাঙ্গন, জলাবদ্ধতা বা অন্য কোনো বিরুপ প্রতিক্রিয়ারও আশংকা নেই। আইডব্লিউএম পরিচালক আরো জানান, হাতিয়া-নিঝুমদ্বীপ-ধামারচর এবং ধূলা-চরমোন্তাজ-চরকুকরি মুকরি ক্রসবাঁধের মাধ্যমে মূল স্থলভূমির সঙ্গে সংযুক্ত করার খুবই চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এতে মাত্র ৫ বছরের মধ্যেই অন্তত ২০ হাজার বর্গমাইল আয়তনের ‘অবিচ্ছিন্ন ভূখন্ড’ লাভ করা যাবে।
কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন পয়েন্টে অন্তত ২০ বর্গ কিলোমিটার নতুন চর জেগে উঠে। তবে নদী-চ্যানেলের গতিপথ পরিবর্তন ও সমুদ্র উপকুলিয় ভাঙ্গনের কবলে পড়ে ৭/৮ বর্গ কিলোমিটার ভূখন্ড হারিয়ে যায়। এমন ভাঙ্গাগড়ার মধ্যেই প্রতি বছর গড়ে ১২/১৩ বর্গ কিলোমিটার ভূমি টিকে থাকে এবং তা দেশের মানচিত্রে মূল ভূখন্ড হিসেবে যুক্ত হয়। আশির দশকের শেষ ভাগ থেকে জেগে ওঠা চরভূমির পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বেড়ে উঠতে দেখা যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মেঘনা মোহনা সমীক্ষায়ও এ তথ্যের সত্যতা স্বীকার করা হয়। পাউবো সমীক্ষায় বলা হয়, নদীর ভাঙ্গা-গড়ার খেলায় ভূমি প্রাপ্তির হারই বেশি। আশির দশক পর্যন্ত ভূমি হারানোর মাত্রা বেশি থাকলেও। ১৯৯০-৯৬ এবং ২০০৬ সালের পরবর্তী সময়ে আবার ভূমি প্রাপ্তির হার অনেক বেশি ছিল বলেও অপর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ওই সময়ে প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর নতুন ভূমি দেশের মূল ভুখন্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য