রাখাইনদের ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি হারিয়ে যাচ্ছে

buddist-temple.jpgমেজবাহউদ্দিন মাননু ॥ সাগরপারের জনপদ কলাপাড়া, তালতলী ও রাঙ্গাবালীর রাখাইনদের ঐতিহাসিক কীর্তিগুলো একে একে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। প্রায় সোয়া দু’শ’ বছরের প্রাচীন এসব পুরাকীর্তি বৌদ্ধবিহার ও মঠ সংস্কারের অভাবে বর্তমানে জীর্ণদশায় একেবারে নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। তার ওপর বৌদ্ধবিহারের কাঠ, খুঁটি, টিনের বেড়া খুলে খুলে পড়ছে। যাচ্ছে চুরি হয়ে। মঠের পলেস্তরা খসে পড়ছে। কোনটি ইতোমধ্যে ভেঙ্গে পড়েছে। কেবল তাই নয় এসব বিহার ও মঠ অরক্ষিত হয়ে আছে। রাখাইনদের সংখ্যা ক্রমেই কমে যাওয়ার কারণে বহু মঠ ও বিহার দেখাশোনার কেউ নেই। তার পরও পর্যটনসমৃদ্ধ কলাপাড়ায় আসা পর্যটকরা কুয়াকাটায় বেড়াতে এসে আকর্ষণীয় এসব প্রাচীন নিদর্শন দেখার জন্য ভিড় করেন।
রাখাইন জাতির এসব বৌদ্ধবিহার ও মঠগুলো রয়েছে কলাপাড়ার বিভিন্ন জনপদে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। বর্তমানে এখানে রাখাইনপাড়া রয়েছে ২৯টি। অথচ ১৯৪৭-১৯৪৮ সালের তথ্যানুসারে পটুয়াখালীর কলাপাড়া, রাঙ্গাবালী এবং বরগুনার তালতলীতে পাঁচ হাজার এক শ’ ৯০টি রাখাইনপাড়া ছিল। কমতে কমতে রাখাইনপাড়ার সংখ্যা সাতচল্লিশে এসে ঠেকেছে। এর মধ্যে সর্বাধিকসংখ্যক রাখাইনপাড়া কলাপাড়ায় ২৯টি। প্রতিটি রাখাইনপাড়ায় কমপক্ষে একটি করে বৌদ্ধবিহার ও মঠ ছিল। প্রতিটি বিহারে থাকতেন একজন করে বিহারাধ্যক্ষ (বৌদ্ধভিক্ষু)। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে রাখাইনদের প্রাণহানি যেমন ঘটেছে তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বৌদ্ধবিহার ও মঠগুলো। বর্তমানে ১৯টি বিহার আর আটটি মঠ রয়েছে। কোন কোন মঠের জীর্ণদশা এমন যে ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তির সামনে সকাল-সন্ধ্যা প্রার্থনা করাও রাখাইনদের জন্য দুরূহ হয়ে পড়েছে। ইন্দোচীনের শিল্পশৈলীর আদলে কাঠের তৈরি এসব বিহার এবং সিমেন্টের তৈরি জীর্ণদশার এই মঠগুলো এখনও পর্যটকরা দেখেন, তাদের আকৃষ্ট করে। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জীর্ণদশার বৌদ্ধবিহার ও মঠগুলো দেখার জন্য দেশের বাইরে থেকেও পর্যটকরা আসেন।
কলাপাড়া কুয়াকাটার বিভিন্ন স্থানে মঠ ও বিহারের জীর্ণদশা সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের মুখোমুখি। ইটগুলো ক্ষয়ে গেছে। পলেস্তরা বহু আগেই ধসে পড়ছে। ২০০২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম দফায় এখানকার এলজিইডি দফতর রাখাইনপাড়ার ১৯টি বৌদ্ধবিহার (রাখাইনদের ভাষায় কেয়াং) সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ চায়। এরপরে কুয়াকাটা বৌদ্ধবিহারটি আধুনিকায়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া মিস্ত্রিপাড়াসহ প্রায় আটটি বৌদ্ধবিহার কম বেশি মেরামত করা হয়েছে। বাকিগুলো রয়েছে জীর্ণদশার শেষ পর্যায়ে। এর মধ্যে খুলনার প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর খাপড়াভাঙ্গার বৌদ্ধ মঠটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি। যেসব মঠ ও বৌদ্ধবিহার সংস্কার করা হয়নি সেগুলো এখন অস্তিত্ব সঙ্কটে রয়েছে। রাখাইনদের অভিযোগ মঠ ও বৌদ্ধবিহার এলাকার জমি পর্যন্ত একশ্রেণীর প্রভাবশালী জালিয়াতি করে নকল কাগজপত্র বানিয়ে দখল করে নিয়েছে। কেউ কেউ আবার বিক্রি করে দিয়েছে। কুয়াকাটার হুইচেনপাড়া, মম্বিপাড়া, দোভাসীপাড়া, ঘাটলা ও মধুপাড়াতেও রাখাইনপল্লীর জমি দখলের এমন অভিযোগ রয়েছে। এসব পাড়ার হেডম্যান অর্থাৎ মাদবরসহ বসবাস করা রাখাইনদের সমাধিস্থল পর্যন্ত পড়ে আছে। ধুলাসার ইউনিয়নের চরধুলাসারে এমন দৃশ্যও দেখা গেছে।
গোড়া আমখোলা রাখাইন পল্লীর বিজয় রামা বৌদ্ধ বিহারাধ্যক্ষ বৌদ্ধভিক্ষু উচৈতা মহাথেরো জানালেন, সিডরে তাদের বিহার ও মঠের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়েছে। মঠটি নিজেদের এবং সরকারী অর্থায়নে যৌথভাবে সংস্কার করেছেন। কিন্তু বিহারটি এখনও জীর্ণদশায় রয়েছে। খুঁটিগুলো নড়বড়ে অবস্থায়। এই বিহারটির মধ্যে প্রায় দু’শ’ বছরের পুরনো কাঠ ও কষ্টিপাথরের গৌতম বুদ্ধের মূর্তি রয়েছে। প্রতিদিন বিহারে সকাল-সন্ধ্যা প্রার্থনা করেন এখানকার রাখাইনরা। ৪৭টি রাখাইন পরিবার অধ্যুষিত এই পাড়ায় প্রতিদিন পর্যটকের আগমন ঘটে। তাঁরা ঘুরে দেখেন বিহার ও বৌদ্ধ মঠটি।
রাখাইনসহ সকল সম্প্রদায়ের মানুষের দাবি এই বৌদ্ধ মঠ এবং বিহারগুলো আদল ঠিক রেখে সংস্কার করলে এখানে পর্যটক দর্শনার্থীর আগমন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। সেই সঙ্গে আদিবাসী সম্প্রদায় রাখাইনদের সংস্কৃতি রক্ষা হবে। রক্ষা হবে এখানকার পুরাকীর্তির নিদর্শন বৌদ্ধবিহার ও মঠ। - সূত্র দৈনিক জনকণ্ঠ

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য