ইটভাটায় বনের মাটি ও গাছ সাবাড়

এভাবেই সাবাড় হচ্ছে বনের মাটি ও গাছপরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করে এবং নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কয়লা পুড়িয়ে ইটভাটায় ইট তৈরি করতে হয়। কিন্তু পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ‘গঙ্গামতি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড’ (জিইসিএল) নামে একটি ইটভাটায় ইট তৈরি হচ্ছে ভিন্নভাবে। আন্দারমানিক নদীর চরে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বনাঞ্চলের মাটি কেটে সেখানে তৈরি করা হয় কাঁচা ইট এবং তা পাকা করা হয় ওই বনেরই গাছ পুড়িয়ে। এ অবস্থা চলতে থাকলে শ্বাসমূলীয় (ম্যানগ্রোভ) বনাঞ্চলটি অল্প সময়েই উজাড় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ রকম অনিয়ম সত্ত্বেও ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই ইটভাটায় যান না। ইটভাটাটির মালিক স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহাবুবুর রহমানের স্ত্রী প্রীতি রহমান ও মন্ত্রীর নিকট আত্মীয়রা।
কলাপাড়া উপজেলা সদরের পূর্ব দিক দিয়ে কুয়াকাটা যাওয়ার প্রায় ২৬ কিলোমিটার বিকল্প সড়ক। ওই পথে শহর থেকে দুই কিলোমিটার এগোলেই নজরে আসে আন্দারমানিক নদীর উত্তর পারে প্রাকৃতিক নিয়মে গড়ে ওঠা ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। ওই সবুজের বুকে আছড়ে পড়ছে ইটভাটার কালো ধোঁয়া। বনাঞ্চল লাগোয়া টিয়াখালী ইউনিয়নের ইটবাড়িয়া গ্রামে গত বছর স্থাপন করা হয়েছে ইটভাটাটি।
স্থানীয় লোকজন জানায়, ২০১০ সালের ২১ জানুয়ারি ২৫ লাখ টাকায় অন্যের কাছে বায়না করা ওই ইটভাটার জমি দখলে নিয়ে ক্রয় করেন বর্তমান মালিকরা। এর পূর্ব পাশে ম্যানগ্রোভ বন, উত্তর পাশে কৃষিজমি ও বসতবাড়ি থাকা সত্ত্বেও সেখানে পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়ে দিব্যি গঙ্গামতি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের ইটভাটা গড়া হয়েছে। গত বছর শুরুর মৌসুমে এ ইটভাটার সব কাঁচামাল সংগ্রহ করা হয় বন থেকে। চলতি মৌসুমে ৫০ লাখ ইট তৈরির টার্গেটে অত্যাচার বেড়েছে ম্যানগ্রোভে। কাঁচা ইট তৈরির মাটি আনা হচ্ছে বনাঞ্চল থেকে। প্রতিদিন ট্রলি বোঝাই করে মাটির স্তূপ দেওয়া হচ্ছে ভাটায়। মাটি কেটে নেওয়ার ফলে বনাঞ্চলের বড় একটি অংশ পরিণত হয়েছে বিশাল পুকুরে। ইট পোড়ানোর জন্য দেদার গাছ কাটা চলছে। এর ফলে ইটভাটা লাগোয়া ম্যানগ্রোভসহ উজাড় হচ্ছে আশপাশের বনাঞ্চল। বিপর্যস্ত হচ্ছে পরিবেশ।
বন বিভাগের স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রতিদিন ওই ইটভাটার জন্য বনের মাটি ও গাছ কেটে নেওয়া হলেও তারা এ ব্যাপারে কিছুই বলতে পারছে না। এ ম্যানগ্রোভ দেখভালের দায়িত্বে তারা থাকলেও ইটভাটাটি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রীর হওয়ায় বন কর্তৃপক্ষ অসহায়। সূত্রটি বলছে, গত এক বছরে ওই বনাঞ্চলের প্রায় তিন একর জমির মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। কলাপাড়ার অন্য ইটভাটাগুলোতে অনিয়মের অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেও গঙ্গামতির ধারেকাছে যাচ্ছেন না।
মাটি কাটা একাধিক শ্রমিক জানান, মালিকের নির্দেশে ২২ থেকে ২৫ জন শ্রমিক প্রতিদিন বনের ভেতর থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় নিয়ে যান। এ জন্য ব্যবহার করা হয় দু-তিনটি ট্রলি। বনের গাছ কেটে ইটভাটায় পোড়ানোর জন্য রয়েছে আরেকটি দল।
প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রী প্রীতি রহমান ইটভাটাটির চেয়ারম্যান। মালিকানায় আরো রয়েছেন প্রতিমন্ত্রীর ফুফাতো ভাই মো. ইউসুফ মিয়া, ভাগ্নে রুহুল আমিন ও মোজাফর হোসেন পান্নু শিকদার। এ ব্যাপারে জানতে প্রীতি রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়া মাত্রই তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। তবে ইটভাটার পরিচালক ও প্রতিমন্ত্রীর ভাগ্নে রুহুল আমিন বলেন, ‘এখানে আদৌ জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করা হয় না। আর বনের মাটিও অবৈধভাবে কাটা হয় না। আমাদের ক্রয় করা জমি থেকে মাটি কাটা হয়। এগুলো যারা বলে, তারা মিথ্যা বলে। আপনারা এখানে এসে দেখে যান।’
পটুয়াখালী বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মিহির কুমার দে বলেন, ‘সরকারি গেজেটের ৪ ও ৬ ধারা অনুযায়ী নদীর জেগে ওঠা চরে প্রাকৃতিকভাবে বন গড়ে উঠলে তা দেখাশোনার দায়িত্ব বন বিভাগের।’ কলাপাড়া আন্দারমানিক নদীর ওপর জেগে ওঠা চরে প্রাকৃতিক নিয়মে গড়ে ওঠা বনের মাটি ও গাছ কেটে ইট বানানোর ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমি এ সম্পর্কে অবগত না, আমাকে কেউ জানায়নি। এখন জানলাম, খোঁজ নিয়ে দেখব।’
বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক সুকুমার বিশ্বাস বলেন, ‘জনবসতি, বনাঞ্চল এলাকায় ইটভাটা হতে পারে না, এটা অবৈধ। কয়লা ছাড়া কাঠ জ্বালিয়ে ইট তৈরি অবৈধ। আমি ছুটিতে আছি, যোগদান করে খোঁজখবর নেব।’
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যলয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আ ক ম মস্তফা জামান বলেন, ‘কোনোভাবেই ম্যানগ্রোভ, জনবসতি কিংবা আবাদি জমির পাশে ইটভাটা হওয়া ঠিক না। এটি কোনোভাবেই আইনসিদ্ধ নয়। এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। এমন পরিবেশে ইটভাটা করা হলে অবশ্যই দূরে সরিয়ে নেওয়াসহ এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। মাটি কাটা কিংবা গাছ কাটার বিষয় হলে খুবই ভয়াবহ।’
তবে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বনের গাছ কেটে ওই ভাটায় ইট পোড়ানো হয় না দাবি করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গঙ্গামতি ইটভাটায় ইট তৈরি হয় সিলেট থেকে কয়লা এনে। ওখানে আদৌ গাছ পোড়ানো হয় না। কেউ ম্যানগ্রোভের মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে কি না আমি জানি না, খোঁজ নিয়ে মাটি কেটে নিয়ে যাওয়াদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
যে ইউনিয়নের মধ্যে ওই ইটভাটা, সেই টিয়াখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. সুজন মোল্লা এ ব্যাপারে বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয়ের ব্রিকফিল্ড অনেক বড়, অনেক বড় ব্যবসা। তারা ম্যানগ্রোভের মাটি ও গাছ কেটে ওখানে ব্যবহার করে কি না আমি জানি না। ব্রিকফিল্ড এলাকায় আমার যাওয়া হয় না বহুদিন।’ -সূত্র দৈনিক কালের কণ্ঠ

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য