কোন বাঁধাই দমাতে পারেনি তাকে

  • নারী ও শিশু
  • ১৮৬

x4-2-14-fatema-begum-1thumbnailpagespeediczglrwcxdke.jpgউপকূল বাংলাদেশ ডেস্ক :: ঝালকাঠী জেলার কাঠালিয়া উপজেলার শৌলজালিয়া ইউনিয়নের শৌলজালিয়া গ্রামের ফাতেমা খানম ।ঝালকাঠী জেলার কাঠালিয়া উপজেলার শৌলজালিয়া ইউনিয়নের শৌলজালিয়া গ্রামের অদম্য এক নারী ফাতেমা খানম।
৫২ টি সাঁকো আর দু’টি খেয়া যাকে স্কুল বিমুখ করতে পারেনি শিক্ষা আর চাকুরী ক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্য অর্জনকারী ‘জয়িতা’ মুকুটটি তো তারই পাবার কথা। বিচারকরা তাই ভুল করেণনি। নিজের জেলা থেকে সেরা জয়িতা হবার পর বরিশাল বিভাগেও সেই সাফল্য অর্জণ করেছেন ৬০ বছরের ফাতেমা খানম।

আন্তর্জাতিক নারী প্রতিরোধ পক্ষ বেগম রোকেয়া দিবস ২০১৩ উপলক্ষে দেশব্যাপী সেরা নারীদের খুঁজে পেতে ‘জয়িতা অন্মেষনে নারী’ শিরোনামে সরকারের মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর উদ্যোগ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ইউনিয়ন পর্যায় থেকে বাছাই করা হয় অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জণকারী, নির্যাতনের বিভিষীকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু,সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান, সফল জননী, শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্র সাফল্য অর্জণকারী পাঁচ নারীকে ।
চার ফেব্রুয়ারি বরিশাল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিভাগীয় পর্যায়ের ওই অনুষ্ঠানে ৬০ বছরের ফাতেমা খানমের মুখে তার সংগ্রামী জীবন কাহিনী শুনে শিক্ষা ক্ষেত্রে অসামান্য সফলতা অর্জণকারী শহুরে অনেক নারীরাও বিস্মিত হন।

ফাতেমা খানম ১৯৫৩ সালের ১৪ এপ্রিল ঝালকাঠী জেলার কাঠালিয়া উপজেলার শৌলজালিয়া ইউনিয়নের শৌলজালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

তার পিতা মরহুম মোঃ সাখাওয়াত আলী হাওলাদার, মাতা কবুতরনে নেছা, সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম ও চার বোনের মধ্যে সবার ছোট। নিজ এলাকায় কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় তিনি বাড়ির কাছে নদীর অপর প্রান্ত পশ্চিম শৌলজালিয়া গ্রামের একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। নদীতে খেয়া পারের ব্যবস্থা ভালো না থাকায় নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসার সুযোগও ছিল না। এছাড়াও ছিল ধর্মীয় বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা, সামাজিক কুসংস্কার । এসবকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের অদম্য ইচ্ছা শক্তির জোড়ে প্রতিটি ক্লাসে সফলতার সাথে প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শেষ করেন ফাতেমা।

এরপর মাধ্যমিক পর্ব। অথচ এলাকায় কোন মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। বড় হয়ে উঠা মেয়েকে নিয়ে চিন্তার কমতি ছিলনা পরিবারের। স্কুল বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে। দূরের সেই শৌলজালিয়া নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভর্তি হন ফাতেমা। বিদ্যালয়ে যাওয়া আসার পথে ৫২ টি সাকো ও দু’টি খেয়া ! ওই দুর্গম পথ পারি দিয়ে ৭ম শ্রেনী পর্যন্ত পড়াশুনা করেণ সেখানে। এরপর যাতায়াতের অসুবিধার জন্য ৮ম শ্রেনীতে ভর্তি হন পাশের আওরাবুনিয়া ইউনিয়নের সবুরুন্নেচ্ছা নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। ৮ম শ্রেনীতেও তিনি ভাল ফলাফল করেন।

বাড়ির কাছে কোন মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় এক আত্মীয়ের মাধ্যমে রাজাপুর উপজেলার নিজামিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৯শ শ্রেনীতে ভর্তি হন। সেখান থেকেই পাস করেণ এস,এস,সি । কিন্তু পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই ১৯৬৮ সালে তার পিতা মারা যান । উচ্চশিক্ষার জন্য কাছাকাছি কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় বাধ্য হয়ে তিনি বরিশাল লেডিহেলথ ভিজিটর ট্রেনিং সেন্টারে ভর্তি হন।

১৯৬৯ সালের গণ আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহন করেন। ১৯৭২ সালে সেভ দ্যা চিলড্রেন নামে একটি বিদেশী সংস্থায় চাকরী নিয়ে বাগেরহাট জেলায় চলে যান । পরবর্তীতে বদলী হয়ে খুলনায় যান এবং চাকরির পাশাপাশি তিনি লেখাপড়া অব্যাহত রাখেন। ১৯৭৬ সালে বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলার নবপ্রতিষ্ঠিত বেতাগী কলেজ থেকে এইচ,এস,সি পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উর্ত্তীণ হন। খুলনায় কর্মরত অবস্থায় যশোরে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর মেডিকেল কোরে কাউন্সিলর পদে ভাল একটি চাকুরির সুযোগ তৈরী হলে তিনি সেখানে চলে যান এবং চাকুরির পাশাপাশি লেখাপড়াও চালিয়ে যান। সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে বি এ এবং এল এল বি পাশ করেন। যশোরে চাকরির পাশাপাশি আইন ব্যবসার ভাল সুযোগ থাকায় এ পেশায় ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি কেয়ার বাংলাদেশ এবং ডানিডায় ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলে কর্মরত থাকেন।

১৯৯০ সালে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (আরডিআরএস) উপদেষ্টা হিসেবে চাকুরি পেয়ে রংপুর চলে যান, পরবর্তী পর্যায়ে অক্সফাম এর প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে চাকরি নিয়ে ঢাকায় চলে যান। ১৯৯৮ সালে বরিশালে এসে সেখানকার ছাত্রীদের বাস্তব ভিত্তিক শিক্ষার উদ্দেশ্যে একটি ছাত্রী হোষ্টেল প্রতিষ্ঠা করেন। যখন বরিশালে মেয়েরা দোকানে বসে বেচাকেনা করবে এটাই ভাবা যেত না, ঠিক সে সময়ে তিনি বরিশালে ছাত্রীদের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সে বছরই তিনি অসকা ফেলোশীপ লাভ করেন এবং বরিশাল শহরে তিনিই প্রথম মহিলা যিনি গাড়ি (প্রাইভেটকার) চালাতেন। ফাতেমা খানম ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্থার কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন।

১৯৭২ সাল থেকে চাকুরির সুবাদে ভারত, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, ডেনমার্ক, জার্মান, অস্ট্রিয়া এবং যুক্তরাজ্য প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও পলিসি সভায় অংশগ্রহন করেন।

গ্রামের নারীদের শিক্ষা গ্রহনের জন্য সারাজীবনের অর্জিত সম্পদের বিনিময়ে অনেক কষ্ট করে এলাকার মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে তাদেরকে বুঝিয়ে শুনিয়ে নিজ এলাকায় ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন উপজেলার একমাত্র মহিলা মহাবিদ্যালয় ‘মনস্বিতা মহাবিদ্যালয়’।

অল্প সংখ্যক ছাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষার পাশাপাশি চালু করা হয়েছে। ফাতেমা খানম নিজ এলাকা তথা উপজেলার বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষের কাছে হয়ে উঠেন গরিবের বন্ধু, নারী মুক্তির ধারক ও বাহক । সাধারন মানুষের গণদাবিতে ২০০৮

সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটের ব্যবধানে কাঠালিয়া উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তার সারা জীবনের সংগ্রহ প্রায় ৭৫০০ খানা

বই দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন একটি লাইব্রেরী। তিন শতাংশ জমি রেজিস্ট্রি করে দিয়ে এবং নিজের সংগৃহীত বই দিয়ে ২০০০ সালে কলেজের পাশাপাশি তিনি গড়ে তোলেন বেগম সুফিয়া কামাল গণগ্রন্থাগার। সংগ্রহে আছে প্রচুর পাঠ্য বই যা গরিব শিক্ষার্থীরা পড়ার সুযোগ পাচ্ছে।

সৌজন্যে : বরিশাল নিউজ

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য