বরগুনায় বাণিজ্যিক সূর্যমুখী চাষে লাভবান কৃষক

সূর্যমুখী ক্ষেতে কৃষক

বরগুনা: কৃষি অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল উপকূলীয় জেলা বরগুনায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করে কৃষকরা লাভবান হচ্ছে। কয়েক বছর আগেও এই অঞ্চলের বেশিরভাগ কৃ্ষকের জমি ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় চার পাচ মাস পতিত অবস্থায় পরে থাকত। বর্তমানে সুর্যমুখী ফুলের চাষ করে কৃষি অর্থনীতিতে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেক কম পরিশ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করে কৃষক পরিবারগুলো অন্যান্য ফসলের চেয়েও সূর্যমুখী চাষে বেশি লাভবান হয়েছে। তাই কৃষকেরা এগিয়ে এসেছে সূর্যমুখী চাষে। এভাবে দিনে দিনে সূর্যমুখী হয়ে উঠছে কৃষকের জন্য দারুণ এক অর্থকরী ফসল।

উপকূলীয় এই অঞ্চলে এ পর্যন্ত যে কয়টি ঘূর্ণিঝড় হয়েছে তার বেশিরভাগই এপ্রিলের শেষ ও নভেম্বর মাসে আঘাত হেনেছে। নভেম্বর এর শেষ দিকে সূর্যমুখীর বীজ বপন শুরু হয় এবং মধ্য এপ্রিল থেকে ফসল কাটা হয়। তাই এই ফসল আবাদে ঝুঁকির সম্ভাবনা কম থাকে।

সিডর ও আইলা পরবর্তী সময়ে উপকূলীয় এই অঞ্চলে যখন লবণাক্ততার প্রভাব বেড়ে যায়। তখন সরকারী কৃষি অধিদপ্তরের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বেসরকারী সংস্থা অক্সফ্যাম এবং ব্রাক বিভিন্ন কর্মসূচির অধীনে সূর্যমুখী চাষে উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে চাষের আবাদ বাড়াতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় ভাবে ‘কোস্টাল এগ্রো বিজনেস লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান বানিজ্যিকভাবে সুর্যমুখী ফুলের কৃষকদের সাথে চুক্তিভিত্তিক উতপাদনের জন্য তাদের প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য সহযোগিতা প্রদানের কাজ শুরু করে। পাশাপাশি তাদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার সৃষ্টি করতে সূর্যমুখী ফুলের বীজ ক্রয় করে স্থানীয় ভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তেল উৎপাদন করে “সান অয়েল” নামে বাজারজাত করছে। এরই ফলে বরগুনায় সূর্যমুখীর আবাদ ধীরে ধীরে বাড়ছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ১ হাজার ৫৩২ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ হয়।

খুব অল্প দিনে অর্থাৎ ৮৫ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে বীজ থেকে বীজ উৎপাদন সম্ভব। এবং প্রতি একর জমিতে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রকারভেদে লাভ হয় ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা, যা অন্য কোন ফসলে সম্ভব নয়। বীজে তেল যেমন পাওয়া যায় ভালো, তেমন ভালো তেলের মান। সবচেয়ে বড় কথা তেলের বাজার ভালো। উপূকুলীয় এই অঞ্চলের জমিও সূর্যমুখী চাষের জন্য বেশ উপযুক্ত। তবে সূর্যমুখী চাষের সাফল্য আনতে প্রয়োজন বীজ থেকে তেল আহরণের সহজলভ্য প্রযুক্তি।

বাংলাদেশে ২১ লাখ টন তেল আমদানি করতে বছরে খরচ হয় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। সূর্যমুখী তেল এই আমদানী নির্ভরতা কমিয়ে এনে জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ সূর্যমুখী বীজে তেল থাকে শতকরা ৪০ ভাগ, যেখানে সয়াবিন তেলে থাকে মাত্র ১৬ ভাগ।

সূর্যমুখী ক্ষেতে কৃষক

কূ্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাজারজাতকরণে এখনো নানামুখী সমস্যা রয়ে গেছে। অন্যদিকে, কূ্ষকদের সূর্যমুখী চাষের উন্নত প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা নেই। প্রযুক্তিগত সহযোগিতা পেলে এগিয়ে যেতে পারে সূর্যমুখী চাষ, এমনটাই বলছেন কৃষক। সূর্যমুখী থেকে তেলের পাশাপাশি মৌচাষেরও সম্ভাবনা রয়েছে। সূর্যমুখীর ফুল বড় বলে প্রচুর মধু আহরণ সম্ভব। আবার মৌচাষে প্রাকৃতিক পরাগায়নের জন্য সূর্যমুখীর ফলনও হয় বেশি।

বরগুনা সদর উপজেলার ১০নং নলটোনা ইউনিয়নের কৃষক গাজি মাহমুদও আ: ছত্তার জানান, বছরের শুরুতে বৃষ্টি থাকায় অনেক কৃষকই এবার সূর্যমুখীর চাষ করতে পারেনি। তবে গতবারের চেয়েও এবারের ফলন ভাল দেখা যাচ্ছে। যদি কোন ঝড়-বাদল বা দুর্যোগ না হয় তবে আশা করছি অধিক আয় হবে। সূর্যমুখী চাষ আরও লাভজনক হত যদি বরগুনায় আধুনিক প্রযুক্তির একটি তেল শোধনাগার থাকতো।

কৃষকের চোখে নতুন এই স্বপ্ন জাগানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করছেন ‘কোস্টাল অ্যাগ্রো বিজনেস লিমিটেড’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ মসুদ আলম। তিনি বলেন, ‘আমরা সিডর ও আইলা পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা অক্সফ্যামের সহযোগিতায় সুর্যমুখী ফুলের আবাদ নিয়ে কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণের কাজ করি। পরবর্তীতে আমরা দেখি সূর্যমুখী চাষ এই অঞ্চলের জন্য খুবই উপযোগী এবং লাভজনক। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় বীজ বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে আর এই সমস্যার কথা মাথায় রেখে এবং নতুন এক ব্যবসার উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে প্রতিষ্ঠা করি বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কোস্টাল অ্যাগ্রো বিজনেস লিমিটেড। আর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শুরু করি কৃষকদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক সূর্যমুখী ফুলের উৎপাদন এবং উৎপাদিত পণ্য স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তেল উৎপাদন করে ‘সান অয়েল’ নামে বাজারজাতকরণ।

তিনি বলেন, ‘আমাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারনে কৃষকদের সহযোগীতার ক্ষেত্রে অপূর্নতা রয়ে গেছে। তাছাড়া আধুনিক প্রযুক্তিতিতে প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্ভব হচ্ছেনা। এক্ষেত্রে যথাযথ সহযোগীতা পেলে সূর্যমুখী ফুলের আবাদের মাধ্যমে এই অঞ্চলের কৃ্ষি অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে; যা জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে।’

সূর্যমুখীর বীজ সংগ্রহ করা হচ্ছে

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বরগুনার উপ-পরিচালক সাইনুর আজম খান বলেন, ‘মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি এবং বীজের দাম বেশি থাকায় এ বছর সূর্যমূখী চাষীদের বেশ খানিকটা ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। একটা সময় বিভিন্ন উন্নয়ন সংগঠন থেকে সূর্যমুখী চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে বিনামূল্যে বীজ, সার এবং নানাবিধ কৃষি সহায়তা দেয়া হত। এখন কৃষকরা নিজেরাই তা চাষ করছে। তবে বর্তমানে এ বীজের দাম প্রতি কেজি ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা হওয়ায় তুলনামুলকভাবে অনেক কৃষকের পক্ষে তা কিনে চাষ করা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সূর্যমুখীর বীজের সহজলভ্যতা এবং স্থানীয়ভাবে একটি আধুনিক তেল পরিশোধনাগারের ব্যবস্থা করা গেলে সূর্যমুখী চাষে চাষীরা আরও আগ্রহী হয়ে উঠতো।’

//প্রতিবেদন/০৯০৫২০১৮//


এ বিভাগের আরো খবর...
উপকূল দিবসের দাবি উপকূল দিবসের দাবি
‘কুকরির জনারণ্যে সম্প্রীতির সুবাতাস’ -আবুল হাসেম মহাজন ‘কুকরির জনারণ্যে সম্প্রীতির সুবাতাস’ -আবুল হাসেম মহাজন
পাইকগাছার পড়ুয়ারাদের প্রকৃতিপাঠ, সবুজে গড়ছে জীবন পাইকগাছার পড়ুয়ারাদের প্রকৃতিপাঠ, সবুজে গড়ছে জীবন
উপকূলের উদীয়মান সংবাদকর্মী ছোটন সাহা’র ছুটে চলার গল্প উপকূলের উদীয়মান সংবাদকর্মী ছোটন সাহা’র ছুটে চলার গল্প
কমলনগরে পড়ুয়াদের সবুজ জগত, অনুপ্রেরণায় ‘সবুজ উপকূল’ কমলনগরে পড়ুয়াদের সবুজ জগত, অনুপ্রেরণায় ‘সবুজ উপকূল’
শ্যামনগরে পড়ুয়ারা গড়ে তুলেছে পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন শ্যামনগরে পড়ুয়ারা গড়ে তুলেছে পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন
জনতার প্রিয় মানুষ এমপি মুকুল জনতার প্রিয় মানুষ এমপি মুকুল
একুশে বইমেলায় সাংবাদিক ছোটন সাহার ‘মেঘের আঁধারে’ একুশে বইমেলায় সাংবাদিক ছোটন সাহার ‘মেঘের আঁধারে’
‘সমৃদ্ধশালী মডেল ঢালচর গড়তে চাই’ : আবদুস সালাম হাওলাদার ‘সমৃদ্ধশালী মডেল ঢালচর গড়তে চাই’ : আবদুস সালাম হাওলাদার

বরগুনায় বাণিজ্যিক সূর্যমুখী চাষে লাভবান কৃষক
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet