কমলনগরে পড়ুয়াদের সবুজ জগত, অনুপ্রেরণায় ‘সবুজ উপকূল’

সবুজ উপকূল পরিবর্তনের গল্প: কমলনগর-লক্ষ্মীপুর

কমলনগর, লক্ষ্মীপুর: সবুজময় জীবন গঠনের প্রত্যয়ে সবুজ আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে উপকূলের ঝাঁকে ঝাঁকে পড়ুয়া। তাদের সাথে তাল মিলিয়ে এর সংস্পর্শে লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের কিছু পড়ুয়া। ভাবনা-চিন্তা, স্বপ্নময় জগতে ওরা এখন সবুজ। সবুজের রঙেই তারা রঙিন। সমাজের জন্য কিছু করার মন মানসিকতা। সবুজময় বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ার স্বপ্নে ওদের চেতনার বিকাশ ঘটেছে। বদল হয়েছে সমাজ কাঠামোর।

এমনটা পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে “সবুজ উপকূল” কর্মসূচির ফসলে; যার পৃষ্ঠপোষক ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে সৃজনশীল প্রতিষ্ঠান উপকূল বাংলাদেশ।

সবুজ উপকূল অনুষ্ঠানের বক্তা নুসরাত জেবিন জেসিয়া। কমলনগর উপজেলা সদরের প্রানকেন্দ্র হাজীরহাটের তোয়াহা স্মৃতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন এ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হয় সে। এখন সে কি করছে? এন প্রশ্নের জবাবে জেসিয়া বললো, ‘সবুজ উপকূল অনুষ্ঠানকে ঘিরে দেয়ালপত্রিকা বের করি, ওই অনুষ্ঠানেই বক্তব্যে সবুজ সচেতনতার জন্য নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরি। এর মাধ্যমে মেঘনাপাড়ের বিপন্ন মানুষের খবর সংগ্রহের পদ্ধতি শিখেছি। যা ওই অনুষ্ঠানে সবার সামনে উপস্থাপন করেছি। এখন আমি সবুজের ভাবনায় ভাবি। সবুজের আলোকিত হওয়ার স্বপ্ন দেখি।’

জেসিয়ার মতোই ওর সহপাঠী শানু আক্তার, তোরাবগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের তানভী বিন লিয়াকত, নুসরাত জাহান মীম, ফজুমিয়ারহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের মাহমুদুল হাসান লাতু ও জহিরুল ইসলাম প্রমূখ এখন নিজেদের সামাজিক কার্যক্রমে বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত রাখছে। সবুজ উপক‚ল কর্মসূচি থেকে তাদের ভাবনায় এসেছে সবুজ সুরক্ষার তাগিদ।

প্রান্তিক, বিপন্ন, নদীভাঙা, পিছিয়ে পড়া, সবুজ সংকটপূর্ণ এলাকা হিসেবে এ কর্মসূচি শুরুর বছর ২০১৫ সাল থেকে টানা তিন বছর কমলনগরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘সবুজ উপকূল’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। উপজেলার তোরাবগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়, ফজুমিয়ারহাট উচ্চ বিদ্যালয়, হাজিরহাট তোয়াহা স্মৃতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং ফলকন উচ্চ বিদ্যালয়ে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে স্থানীয় প্রশাসন, গণ্যমান্য, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ, সচেতন ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন।

সবুজ উপকূল অনুষ্ঠানে সবুজ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে পড়ুয়ারা দেয়ালপত্রিকা বেলাভূমি বের করেছে এবং পুরস্কৃত হয়েছে, সবুজ বিষয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছে। এবং কী ওরা নিজেরাই অনুষ্ঠান উপস্থাপন করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মুখ থেকে ওরা সবুজ সচেতনতার দিকনির্দেশনা পেয়েছে।

সবুজ উপকূল ভেন্যু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আঙিনায় অতিথিদের সাথে শিক্ষার্থীরা নিজের প্রিয় ক্যাম্পাসে যে সবুজের চারা রোপণ করেছিল, তা আজ আকাশের দিকে উঁকি দিচ্ছে। সবুজে ভরে স্কুল প্রাঙ্গণ। যেখানে ছিল প্রখর রোদ, সেখানে এখন শীতল ছায়া। যার উদহারণ তোরাবগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় ও ফজুমিয়ারহাট উচ্চ বিদ্যালয়। ২০১৫ সালের ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর এ দু’টি বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে “সবুজ উপকূল” কর্মসূচি কর্তৃক সবুজের চারা রোপণ করা হয়। এগুলো মাত্র কয়েক বছরের ব্যাবধানে সবুজ করে তুলেছে ক্যাম্পাস।

অন্যদিকে এসব পড়ুয়ারা সামাজিক বিভিন্ন কাজে সম্পৃক্ত। এ কর্মসূচির অনুপ্রেরণায় তারা লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজে দেয়াল পত্রিকা বেলাভূমি বের করেছে, কলেজ সংলগ্ন এলাকার পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে তা দিয়ে সবাই প্রতিবেদন লিখেছে, কমলনগরের হাজিরহাট তোয়াহা স্মৃতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে গত বছর মা দিবস পালন করেছে, মায়ের কাছে তারা চিঠি লিখেছে এবং পুরস্কারও পেয়েছে। যা তাদের উদ্যোগই।

আরো একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হচ্ছে, এদের উদ্যোগেই গত বছর মেঘনাপাড়ের শিশুদের মাঝে ঈদ সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বাস্তব জগতে ওদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ মানুষ। এবারও তারা এ ধরণের উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে। এইসব কার্যক্রমের মূলে সবুজ উপকূল কর্মসূচি। এ কর্মসূচিতে অংশ না নিলে হয়তো এই পড়ুয়ারা অন্যকিছু ভাবতো; কেউ হতো বিপথগামী।

‘সবুজ উপকূল’ কর্মসূচির অর্থ কেবল উপকূলে সবুজ গাছপালা লাগানো, কিংবা তার সঠিক পরিচর্যা করা নয়। শিক্ষার্থীদের মেধা-মননে সবুজ চিন্তা, নিজেকে সবুজময়ভাবে গড়ে তোলা, সমাজ পরিবর্তনে নিজকে যুক্ত রাখা, আর্ত-মানবতার সেবায় নিজকে সম্পৃক্ত করাসহ নানান ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সংমিশ্রন ঘটেছে এখানে। এ কর্মসূচির জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীরা সামাজিক সমস্যা অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া শিখেছে। নিজেরাই এখন সংগঠন তৈরি করেছে। যার মাধ্যমে তারা বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে দেয়াল পত্রিকা বের করছে, অন্য শিক্ষার্থীদেরও তারা সবুজ সচেতনতায় উদ্বুদ্ধ করছে।

কমলনগরের তোরাবগঞ্জে সবুজ উপকূল কর্মসূচির স্থানীয় সংগঠক শিক্ষক ও সাংবাদিক সানাউল্লাহ সানু বলেন, এটা ব্যতিক্রমী এক কর্মসূচি। গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে ভিন্ন ধরণের এক কর্মসূচি পরিকল্পনা করে সবুজ উপকূল; যা শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সচেতনতা ও মেধা বিকাশে বিশেষভাবে সহায়ক।

কমলনগরে সবুজ উপকূল কর্মসূচির আরেকজন সংগঠক বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম-এর স্টাফ করেসপন্ডেন্ট সাজ্জাদুর রহমান বলেন, এক কথায় এ এক ব্যতিক্রমী কর্মসূচি। এ কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের পরিবেশ মনস্ক হতে সহায়তা করছে। পরিবেশ সুরক্ষায় দায়িত্বশীল করে তুলছে। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল মেধা বিকাশে বিশেষ সহায়ক এ কর্মসূচি। গত তিন বছরে সবুজ উপকূল কর্মসূচি কমলনগরের অসংখ্য সৃজনশীল ছেলেমেয়েদের খুঁজে বের করেছে।

//প্রতিবেদন/২৩০৪২০১৮//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য