রাজধানীর দৃক গ্যালারিতে ৩ দিনব্যাপী ‘উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী’ শুরু

প্রদর্শনীতে চিত্র দেখছেন এক দর্শনার্থী

ঢাকা : বুধবার (২৬ এপ্রিল) বিকেলে রাজধানীর ঢাকার দৃক গ্যালারিতে শুরু হল ৩ দিনব্যাপী ‘উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী’। আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠান শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ক্রিশ্চিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ - সিসিডিবি’র প্রধান নির্বাহী জয়ন্ত অধিকারী আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন।

প্রদর্শনীর উদ্বোধন করতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠাকাল থেকে সিসিডিবি মানবিক সহায়তা নিয়ে বিপন্ন মানুষের পাশে আছে। আমরা জানি, উপকূলের মানুষেরা বহু সংগ্রামে বেঁচে আছে। জলবায়ু পরিবর্তন তাদের জীবনকেই সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করছে। সে কারণে তাদের দিকে নজর দিতে হবে। বিপন্ন উপকূলের চিত্র নীতিনির্ধারণী মহলে তুলে ধরে সংকট উত্তরণের পথ খুঁজতেই এ প্রদর্শনীর আয়োজন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ব্র্যাক-ইন্টারন্যাশনালের ইমারজেন্সি রেসপন্স প্রোগ্রামের (ডিআরআর)  প্রধান শশাঙ্ক সাদী, আলোকচিত্রী দীন মোহাম্মদ শিবলী ও উপকূল-সন্ধানী সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী রফিকুল ইসলাম মন্টু। শুরুতে সূচনা বক্তব্য দেন সিসিডিবি’র ক্লাইমেট চেইঞ্জ প্রোগ্রামের প্রধান তানজির হোসেন। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন সিসিডিবি’র অ্যাডভোকেসি অফিসার মোহাম্মদ আতিকুল হক।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি, গবেষক, শিক্ষক, গণমাধ্যমের প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, আলোকচিত্রী, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। বিকেল ৫টায় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলেও বিকেল ৩টা থেকেই প্রদর্শনীর দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়াহয়।

প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন সিসিডিবি’র নির্বাহী পরিচালক জয়ন্ত অধিকারী

শশাঙ্ক সাদী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে একরকম যুদ্ধ করেই বেঁচে আছে উপকূলের মানুষেরা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় গভারনেন্স ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ন। কার্যক্রম বাস্তবায়নে অারও বেশি মনযোগ দিতে হবে। বিপন্নতার পাশাপাশি মানুষের খাপখাওয়ানোর গল্পগুলোও সামনে আনতে হবে।

তানজির হোসেন বলেন, প্রতিটি ছবি যেন হাজার কথা বলছে। এক একটি ছবির পেছনে লুকিয়ে আছে বিরাট সংগ্রামের গল্প। প্রদর্শনীর ছবিগুলো দেখেই আমরা উপকূলকে অনুধাবন করতে পারি। বুঝতে পারি সেখানকার মানুষেরা কীভাবে বেঁচে আছে। এই দৃশ্য আমরা দেখতে চাই না। সংকট উত্তরণের পথ খুঁজতেই এ ধরণের উদ্যোগ। আশাকরি নীতিনির্ধারণী মহল এ দিকে নজর দেবেন। আমরা একটি সুন্দর উপকূলের প্রত্যাশা করি।

উপকূল অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিষয়ে এই আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে চারজন আলোকচিত্রীর ছবি স্থান পেয়েছে। এরা হলেন, দীন মোহাম্মদ শিবলী, রফিকুল ইসলাম মন্টু, হাবিব তরিকুল ও নাইমুল ইসলাম।

উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ইস্যুগুলোকে উন্নয়নধারায় সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য সামনে রেখে এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। বিশেষ করে উপকূলের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অনেক ইস্যু সবার অগোচরে থেকে যাচ্ছে। সেগুলোকে সামনে এনে উন্নয়নধারায় সম্পৃক্ত করতে সহায়তা করবে এই প্রদর্শনী। উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, এভাবেই উপকূলে ফিরে আসবে একটি সুন্দর আগামী।

রাজধানীর ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় দৃক গ্যালারিতে (বাড়ি-৫৮, রোড-১৫/এ (নতুন)) এ প্রদর্শনী বৃহস্পতিবার (২৭ এপ্রিল) ও শুক্রবার (২৮ এপ্রিল) বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য খোলা থাকবে। ২৮ এপ্রিল শুক্রবার রাত ৮টায় প্রদর্শনীর সমাপ্তি ঘটবে।

প্রদর্শনীর ছবি দেখছেন এক দর্শনার্থী

প্রদর্শনীতে যাদের ছবি যাচ্ছে, পেশাগতভাবে তারা প্রত্যেকেই অনেক মূল্যবাণ কাজ করেছেন। পেয়েছেন কাজের স্বীকৃতি। এরা হলেন :

দীন মোহাম্মদ শিবলী তিনি মূলত ঢাকাবেইজড পেশাদার আলোকচিত্রী। ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফিতেও বিশেষ আগ্রহ রয়েছে তার। কাজের ক্ষেত্রে সামাজিক ভিন্ন ইস্যুর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে তিনি নিবিড়ভাবে কাজ করছেন। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে জীবনব্যাপী কাজের অংশ হিসাবে ২০০৩ সাল থেকে তিনি ডকুমেন্টেশন সংরক্ষণ করছেন। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে অসংখ্য দুর্লভ ছবি তুলেছেন তিনি। তৈরি করেছেন ডকুমেন্টারি। একটি ফটোগ্রাফি স্কুলের অধ্যক্ষ তিনি।

রফিকুল ইসলাম মন্টু উপকূল-সন্ধানী সাংবাদিক হিসাবে পরিচিতি রয়েছে তার। ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত। সমগ্র উপকূল ঘুরে অসংখ্য প্রতিবেদন লিখছেন, ছবি তুলছেন। কাজ করেছেন প্রথম আলো, সমকাল, কালের কণ্ঠ, সংবাদ, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, বাংলানিউজসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে। জীবনব্যাপী কাজের ক্ষেত্র হিসাবে বেছে নিয়েছেন উপকূলকে। সাংবাদিকতায় তিনিই বাংলাদেশে প্রথম উপকূল নিয়ে এতটা নিবিড়ভাবে কাজ শুরু করেছেন।

তিনি সাংবাদিকতায় অর্জন করেছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার। ২০১৫ সালে পিআইবি-এটুআই গণমাধ্যম অ্যাওয়ার্ড, ইউনিসেফ-মীনা অ্যাওয়ার্ড, ২০১৪ সালে ডিআরইউ-গ্রামীণফোন অ্যাওয়ার্ড, ১৯৯৮ সালে পটুয়াখালীর চরাঞ্চলের সরেজমিন সিরিজ প্রতিবেদনের জন্য ‘মোনাজাতউদ্দিন স্মৃতি পুরস্কার’, ২০০০ সালে বরগুনার প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক সিরিজ প্রতিবেদনের জন্য ‘এফপিএবি পুরস্কার’, ২০০১ সালে ভোলার শিশুদের নিয়ে ফিচারের জন্য ‘পিআইবি-ইউনিসেফ ফিচার পুরস্কার’, ২০০৬ সালে দুবলার চরের শিশুদের ওপর অনুসন্ধানী রিপোর্টের জন্য ‘ইউনিসেফ-মীনা অ্যাওয়ার্ড’, একই বছর দক্ষিণাঞ্চলের নদী ভাঙনের ওপর সিরিজ প্রতিবেদনের জন্য ‘ইউএনডিপি-বাংলাদেশ সরকার পুরস্কার’, ২০১০ সালে জলবায়ু পরিবর্তনে বিপন্ন উপকূল বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য ‘কানাডিয়ান অ্যাওয়ার্ড’। এছাড়াও ১৯৮৮ সালে বরগুনা জেলা পর্যায়ে ‘একুশে সাহিত্য পুরস্কার’ ও ‘জাতীয় তরুণ সংঘ পুরস্কার’ অর্জন করেন তিনি।

প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সবমেত অতিথিবর্গ

তরিকুল হাবিব মাল্টিমিডিয়া ভিজ্যুয়াল আর্টষ্ট হিসাবে পরিচিত। ২০০৭ সালে ফিল্যান্স ফটোগ্রাফির মাধ্যমে তিনি পেশায় প্রবেশ করেন। তার তোলা অসংখ্য ছবি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র, ম্যাগাজিনসহ বিভিন্ন প্রকাশনায় স্থান পেয়েছে। পত্রিকাগুলোর মধ্যে ঢাকা ট্রিবিউন, ডেইলি ইনডিপেনডেন্ট, নিউএজ, ডেইলি ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস উল্লেখযোগ্য। তার তোলা ছবি বাংলাদেশ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে। তিনি সিসিডিবি’র কমিউনিকেশন বিভাগে কর্মরত।

নাইমুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে ফটোগ্রাফি পেশায় যুক্ত। ছবি তোলা তার নেশা। বর্তমানে ক্রিশ্চিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ - সিসিডিবি’র রিসার্চ এসোসিয়েট হিসেবে কর্মরতআছেন।

সিসিডিবি আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠান ক্রিশ্চিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ (সিসিডিবি) প্রতিষ্ঠাকাল থেকে মানবিক উন্নয়ন কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান হিসাবে এর আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৭৩ সালে। তবে ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী সাইক্লোন এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তীকালে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে সহায়তা নিয়ে। দেশের অধিকাংশ স্থানে কাজ করছে সিসিডিবি। এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকান্ডের কেন্দ্রে রয়েছে গ্রামামাঞ্চলে কমিউনিটি ও মানবিক উন্নয়ন।

চিত্র প্রদর্শনী প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম মন্টু বলেন, ‘‘আমার তোলা ছবি প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে, এটা তো নি:সন্দেহে আমার জন্য আনন্দের খবর। তবে আমি মনে করি, শুধু আমার জন্য নয়, গোটা উপকূলবাসীর জন্য এটি সুসংবাদ। কারণ এর মধ্যদিয়ে উপকূলের সমস্যা সমাধানের পথ সুগম হবে।”

উপকূল-সন্ধানী সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী রফিকুল ইসলাম মন্টু ও তার ছবি

তিনি বলেন, ‘‘উপকূলের হাজারো সংকটের খবর সবার অন্তরালেই থেকে যায়। প্রান্তিকে কী ঘটছে, তা কেন্দ্রে পৌঁছাচ্ছে না যথাযথভাবে। ফলে সমস্যা সমাধানে ধীরগতি। প্রদর্শনীর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিপন্ন উপকূলের চিত্র এবার রাজধানীর চশমা অাঁটা মানুষগুলোর চোখের সামনে উঠে আসবে। এর মাধ্যমে উপকূলের বহুমূখী সংকটের চিত্র একসঙ্গে সবাইকে দেখানো সম্ভব হবে। উপকূলের এই বিপন্নতার দৃশ্য আমরা কেউই দেখতে চাই না। আমাদের কাম্য সংকটবিহিন বসবাসযোগ্য উপকূল। এই প্রদর্শনীর মধ্যদিয়ে হয়তো সেদিকেই এগোবে উপকূল।”

অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আলোকচিত্রী দীন মোহাম্মদ শিবলী বলেন, ‘‘জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে উপকূলের মানুষের জীবনযাত্রা নিবিড়ভাবে যুক্ত। এক একটি গ্রাম নি:শেষ হয়ে যায়, আর বহু মানুষ অভিবাসী হয়। পরিবার পরিজন নিয়ে তারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটে চলে। প্রদর্শনীর মাধ্যমে আমরা সেরকম কিছু গল্প সবার সামনে তুলে ধরার সযোগ পেলাম। এরফলে উপকূলের দিকে আরও বেশি নজর পড়বে বলে আমাদের প্রত্যাশা। ফলে উপকূলের মানুষেরা ফিরে পাবে নিরাপদে বাঁচার নিশ্চয়তা।’’

//প্রতিবেদন/২৬০৪২০১৭//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য