শিক্ষার আলো থেকে পিছিয়ে ওরা

মেঘনা পাড়ের শিশু

কমলনগর, লক্ষ্মীপুর : ওরা সবাই লক্ষ্মীপুরের মেঘনা পাড়ের ছিন্নমূল শিশু। ওরা থাকেই মেঘনা তীরে, কেউ কেউ মেঘনার কূলের নৌকার পিছনে ছুটে একটা-দুইটা ইলিশ মাছ পাওয়ার আশায়, আর অনেকেই দিনটা পার করে দুষ্টমিতে। ওদের কেউ কেউ মেঘনার ভাঙ্গন কবলিত পরিবারের শিশু, আবার কেউ কেউ জেলে পরিবারের শিশু। মেঘনার ভাঙ্গনে ওদের স্বপ্নগুলো নিঃশেষ হয়ে পড়ে। ওদের নতুন করে সেই পরিবেশ গড়ে উঠেনা, স্বাভাবিক জীবন থেকে ওরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শুরু হয় তাদের এক অস্বাভাবিক জীবনের নতুন অধ্যায়। মানবিক দিক নিয়ে ওদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ভালো থাকেনা।

ওরা অসহায়, অযত্মে আর সমাজের অবহেলায় বড় হয়। কোনভাবে যদি তাদের জ্ঞানের আলোর ছোঁয়ার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়, তবে তাদের সামনে কঠিন সময় এসে বাঁধা সৃষ্টি করে। তখন, নিজকে মানিয়ে নিতে না পেরে জ্ঞানের আলো শিখতে গিয়ে ছিটকে পড়ে তারা। সুসময়ে তারা ভালোস্বপ্ন দেখে কিন্তু কঠিন বাস্তবতার আঘাতে পিছিয়ে যায় ওরা।

অপরদিকে, জেলে পরিবারের শিশুদের স্বপ্ন সবার চেয়ে অন্যরকম। নিজকে একজন ভালো দক্ষ নৌকার মাঝি হিসিবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই তাদের জীবনটা যেন স্বার্থক। ওরা নদীর মাঝখানে বাবার সাথে ইলিশ শিকারের জন্য যায় শিশুকাল থেকে। ঘূর্নিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয় তারা। এ কারণেই তারা নিজকে অনেক সাহসী মনে করে। জেলে পরিবারের সকল শিশুরা যে দক্ষ মাঝি হতে চায়, তা কিন্তু না। কিছু শিশু যদি পড়ালেখা করার জন্য বিদ্যালয়ে যেতে ইচ্ছা পোষণ করে। তবে, তাদের সামনে প্রধান বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় পিতা-মাতার অজ্ঞতা ও অসচেতনতা। ওদের খাতা-কলম কিংবা পড়ালেখার খরচ থাকলেও তারা শিশুদের পড়ালেখার খরচ চালাতে অপারগতা প্রকাশ করে।

লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের মেঘনার পাড়ের ছিন্নমূল শিশুদের সঙ্গে দেখা মিলে প্রায় সময়ে। কথা হয় শিশু রিয়াদ ও শরিফের সাথে। রিয়াদের বয়স ৯ বছর। বাবাকে হারিয়ে মায়ের সাথে থাকে মেঘনাতীরের ছোট্ট একটি কুঁড়েঘরে। দিনমজুর পিতা আবদুল হক ৫ বছর বয়সে তাদের ছেড়ে চলে যান না ফেরার দেশে। মেঘনার পথে পথে ঘুরাফেরার সময় তার সাথে কথা হলে সে বলে, “নৌকার লোকদের কাছে মাছ চাই। মাছ পেলে সেগুলো বিক্রি করে সংসার চলে আমাদের”।

তুমি কিপড়ালেখা করতে চাও? জানতে চাইলে উত্তরে সে বলে, “কিভাবে পড়বো একদিকে যেমন টাকা নাই আরেক দিকে স্কুল অনেক দূরে। আমার মনে চায় পড়ালেখা করতে”।

আরো কিছু দূর হাঁটলে দেখা হয় শরিফ নামের ৮ বয়সি আরেকটি ছেলের সাথে। শরিফের বাবা নৌকার মাঝি। সে বললো, পড়ালেখা করতে পারি নাই। তাই বড় হয়ে একজন দক্ষ মাঝি হবো। সে আরো বলে, “পড়ালেখা করলে নাকি চাকরি পাওয়া যায়না? এজন্য, কিছুদিন স্কুলে যাওয়ার পর আমাকে স্কুলে আর দেয় নাই। তাছাড়া নৌকার কাজ করার জন্য আমাদের পাঠানো হয়”।

তাকে সাথে নিয়ে কিছুদূর গেলে দেখা মিলে একঝাঁক পথশিশু ও জেলে শিশুদের সাথে। ছেড়া কাপড় কিংবা বহু পুরানো কাপড়ে খেলছিলো তারা। সবাইকে একসাথে দাঁড় করিয়ে ক্যামেরায় ক্লিক করে ছবি তোলা হলে যেন হাঁসি ফুটলো ওদের মুখে। সবাই ভিড় জমালো তাদের নিজের ছবি দেখার জন্য। দাবি করলো তাদের ছবি যেন ইন্টারনেটে দেওয়া হয়। আশ্বাসে খুশি হলো সবাই।

বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় উৎসবগুলোতে এই সব ছিন্নমূল শিশুদের মুখে যেমন হাসি ফুটেনা, তেমনি ওরা পিছিয়ে থাকে আধুনিক যুগের শিক্ষার আলো থেকে। ওদের মতো অসংখ্য পথশিশুদের জন্য প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে আলো ফুটবে ওদের মুখে, এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

//প্রতিবেদন/০৭০৩২০১৭//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য