মেঘনার ভাঙন থেকে বাঁচার আকুতি কমলনগরবাসীর

কমলনগরের ভাঙণ

লক্ষ্মীপুর : লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলায় মেঘনার ভাঙন ভয়াবহ রুপ নিয়েছে। প্রতিনিয়ত মেঘনার বুকে হারিয়ে যাচ্ছে বহু স্থাপনা। এর সাথে হারিয়ে যাচ্ছে হাজারো অসহায় মানুষের স্বপ্ন। নদীর অব্যাহত ভাঙনে উপজেলার বেশ কয়েকটি বাজারের আজ কোন চিহ্ন নেই। ওইসব বাজারের কথা কেবল মানুষের মুখেই রয়ে গেছে।

প্রতিনিয়ত নদীতে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, রাস্তা-ঘাট, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ বিস্তীর্ণ জনপদ। ঝুঁকিতে রয়েছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ভবনসহ উপজেলার প্রাণকেন্দ্রের কয়েক কোটি টাকার স্থাপনা।

সম্প্রতি উপজেলার কাদিরপন্ডিতের হাট জামে মসজিদটি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে রয়েছে পার্শ¦বর্তী চর জগবন্ধু ইসলামিয়া সিনিয়র কামিল মাদ্রাসা। মেঘনার ভয়াবহ ভাঙনে যেকোন সময় নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে এ মাদ্রাসাটি।

এদিকে কমলনগর উপজেলাকে মেঘনার ভাঙন থেকে রক্ষায় দু’বছর আগের একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পটি এখনও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নজুড়ে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এনিয়ে মেঘনাপাড়ের বাসিন্দারা চরম আতঙ্কগ্রস্থ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে উপজেলার ১৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন খেলা চলছে। অব্যাহত ভাঙনে ইতিমধ্যে উপজেলার ১২ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নদী গিলে নিয়েছে। এতে কয়েক হাজার একর ফসলি জমি, হাট-বাজার, পুল-কালভার্ট, পাকা-আঁধাপাকা রাস্তা, সাইক্লোন শেল্টার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মসজিদ-মন্দিরসহ বহু বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে।

এরই মধ্যে ২০১৪ সালের আগস্টে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ল²ীপুর জেলার রামগতি ও কমলনগর উপজেলার তৎসংলগ্ন এলাকাকে ভাঙন থেকে রক্ষাকল্পে একটি প্রকল্পটি অনুমোদন হয়। অনুমোদিত ওই প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে কমলনগর উপজেলার এক কিলোমিটার ও রামগতি উপজেলার সাড়ে চার কিলোমিটার এলাকা রক্ষায় ১৯৮ দশমিক ২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। রামগতির মানুষ এখন প্রকল্পটির সুফল পাচ্ছে।

অন্যদিকে, গত তিন বছরের ভাঙনে উপজেলার পশ্চিমাংশের প্রায় চার কিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স থেকে নদীর দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। এতে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে সদ্য নির্মিত উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন, কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়, অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কমলনগর থানা ভবন, অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন চরফলকন ইউনিয়ন ভূমি অফিসসহ কয়েক কোটি টাকার স্থাপনা ঝুঁকিতে রয়েছে।

কমলনগরের কাদির পন্ডিতের হাট ও চরজগবন্ধু গ্রামের বাসিন্দারা জানায়, এ প্রকল্প অনুমোদনের পর বাপ-দাদার ভিটে-মাটিতে নতুনভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেন তারা। কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে ওই প্রকল্পে সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে রামগতির চরআলেকজান্ডারে বাঁধ নির্মাণকাজ চলতে থাকলেও এখন পর্যন্ত কমলনগর অংশে কাজ শুরু হয়নি।

সাহেবেরহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু বকর ছিদ্দিক মাতাব্বর জানান, দু’ দু’বার মেঘনার ভাঙনের শিকার হয়ে মাতাব্বরহাট বাজারের একটি দোকানঘরে পরিবার নিয়ে তিনি বসবাস করছেন। এভাবে মেঘনার ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে ওই ইউনিয়নের শত শত পরিবার এখন বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন স্থানে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে।

কমলনগরের ভাঙণচরজগবন্ধু সিনিয়র ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল মাওলানা মো. নুরুন্নবী সাঈদি বলেন, নদীর অব্যাহত ভাঙনে পাশের ঐতিহ্যবাহী মসজিদ নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। মাদ্রাসাটিও যেকোন সময় নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

তিনি আরো জানান, নদীর ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে এলাকাবাসী অন্যত্র চলে যাওয়ায় মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর হার দিনদিন কমে যাচ্ছে। যার কারণে এখানে ১৮’শ শিক্ষার্থী থেকে কমে ৮’শ তে এসে দাড়িয়েছে। এদের মধ্যেও সবাই নিয়মিত ক্লাসে আসে না। এ মাদ্রাসার সকল অর্জন ধরে রাখতে হলে খুব তাড়াতাড়ি অন্যত্র স্থানান্তর অত্যনন্ত জরুরী। তাই মাদ্র্রাসাটি অন্যত্র স্থানান্তর করার জন্য সংশ্লিষ্টদের সহযোগীতা কামনা করছেন তিনি।

পাটওয়ারীহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একেএম নুরুল আমিন রাজু জানান, চলতি বর্ষা মৌসুমে মেঘনার ভাঙনে তার ইউনিয়নের শত বছরের পুরনো লুধুয়া বাজার, ফলকন উচ্চবিদ্যালয়, ফলকন ছিদ্দিকিয়া দাখিল মাদ্রাসা ও লুধুয়া ফলকন ফয়জুন্নাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। বসতবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে হাজারো পরিবার।
তিনি আরো জানান, রামগতির মতো সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে অতিদ্রুত কাজ শুরু হলে উপজেলার প্রাণকেন্দ্র হাজিরহাট এলাকাটি ভাঙনের হাত থেকে বাঁচবে।

এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী গাজী ইয়ার আলী বলেন, কমলনগরের ১ কিলোমিটার বাধ নির্মাণের জন্য ঠিকাদারের ৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের চুক্তি হয়েছে।  ভাঙনরোধে কমলনগরে বাঁধ নির্মাণকাজ শুরুর সকল প্রস্তুতি সম্পন্নের পথে। আশা করছি, শীঘ্রই এ প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারবো।

// প্রতিবেদন/উপকূল বাংলাদেশ/১৭১১২০১৬//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য