দাকোপে বাঁধের বাইরে ১০৪ পরিবার

দাকোপে বাঁধের বাইরে থাকা পরিবার

দাকোপ, খুলনা : দাকোপবাসীর দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন একটি মজবুত বেড়িবাঁধ। যে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে বিশ্বব্যাংকের হাত ধরে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে উপক‚লীয় বেড়িবাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প-১ এর আওতায় বেড়িবাঁধ নির্মানে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দাকোপের কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ৩২ নম্বর পোল্ডারে ১৭৫ কোটি টাকা ব্যায়ে হবে এই প্রকল্পের কাজ। কিন্তু সুতারখালী ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের একটা বড় অংশ থাকছে বেড়িবাঁধের বাইরে। যেখানে পরিবারের সংখ্যা ১০৪টি। এইসব পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি পুনরায় বিবেচনার জন্য আবেদন করেছেন। তাঁদের বক্তব্য হয় তাঁদের বেড়িবাঁধেও আওতায় আনা হোক অথবা বাঁধের মধ্যে তাদের থাকার যায়গা নির্ধারণ করা হোক।

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় সিডর বাংলাদেশের উপক‚লীয়বর্তী ৩০টি জেলায় প্রচন্ড পরিমানে আঘাত হানে। মারা যায় প্রায় তিন হাজার দুইশ’ মানুষ। এর ঠিক দুই বছর পর ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা পুনরায় উপক‚লীয় অঞ্চলে আঘাত আনে। সিডরের ক্ষতির পরিমান নিরূপনের নিমিত্তে বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগি সংস্থার সমন্বয়ে যৌথ মিশন একটি জরিপ পরিচালনা করে। উক্ত ক্ষয়ক্ষতি জরিপের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক এর সহায়তায় ইমারজেন্সি ২০০৭ রিকভারি ও রেস্টরেশন প্রোজেক্ট (ইসিআরআরপি) শীর্ষক প্রকল্পটি ২০০৮ সালের ২৩ অক্টোবর একনেক সভায় অনুমোদিত হয়।

ইসিআরআরপি-এর ডিপিপি-তে বাংলাদেশের উপক‚লবর্তী অঞ্চলসমূহের পোল্ডারকে জলবায়ু ক্রমবর্ধমান উষ্ণতার কারনে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ¡াস, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি ইত্যাদির কবল থেকে রক্ষাকল্পে একটি সমীক্ষা করা হয়। আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের মাধ্যমে সম্পাদিত সমীক্ষার আলোকে বিশ্বব্যাংক উপক‚লীয় অঞ্চলে ১৭টি পোল্ডারের বাঁধসমূহকে উন্নয়ন ও পূণর্বাসন করার নিমিত্তে অর্থ সহায়তা প্রদানের সম্মত হয়। এর জন্যে বিশ্বব্যাংকের সম্পূর্ন অনুদানে কোস্টাল ইমব্যাংকমেন্ট ইমপ্রæভমেন্ট প্রোজেক্ট, ফেজ-১ (সিইআইপি-১) ২০১৩ সালের পয়েলা অক্টোবর তারিখে একনেক সভায় অনুমোদন হয়। যার প্রথম ফেজের আওতায় দাকোপ উপজেলার ৩২ ও ৩৩ নম্বর পোল্ডারে উন্নয়ন কাজ হবে। এরমধ্যে ৩২ নম্বর পোল্ডারে প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা ব্যায়ে প্রায় ৫০ কিলোমিটার বাঁধ মেরামত করা হবে।

২০০৯ সালে ২৫ মে আইলার পর লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যায়ে বøক দিয়ে কয়েক দফা বাঁধ মেরামত করা হয়েছিল। কিন্তু তা টেকেনি, আর যদি ১০৪টি পরিবার বাঁধের বাইরে অবস্থান করে তাহলে তাদের বেঁচে থাকাই দায় হবে। হারাবে বাপ-দাদার ভিটে মাটি। এ নিয়ে গুনারী অঞ্চলের বাসিন্দা আমিনুর গাজী জানান, বিশ্বব্যাংক পরিকল্পনা নিয়েছে ৭০০ ফুট ভিতর দিয়ে বাঁধ নির্মানের। এতে আমাদের ঘরবাড়ী, জমিজমা বাঁধের বাইরে থেকে যাবে। ফলে আমরা আর কোন দিন বেড়িবাঁধের মধ্যে আসতে পারবো না। এতে করে আমরা হারাবো আমাদের পৈত্রিক সম্পত্তি। অবশ্য দুঃখের সুরে মধু বিশ্বাস জানান, সরকার যদি আমাদের জন্য ব্যবস্থা না করেন তাহলে হয়তবা দেশ ছাড়তে বাধ্য হব আমরা।

এমন বক্তব্য ওয়াহিদ গাজীর, সাত্তার সরদারের, রমেশ বিশ্বাসের, মদন বিশ্বাসের, নরেশ শানার ও মদন বিশ্বাসেরও। তাঁরা বলেন বিশ্বব্যাংকের দাকোপের ৩২ নম্বরের বেড়িবাঁধ উন্নয়নের আমরা যে স্বপ্ন দেখেছিলাম। তাতে করে আশায় বুক বেধেছিলাম। কিন্তু বর্তমান পরিকল্পনায় আমরা খুবই হতাশ হয়েছি। তাই আমাদের একটাই আবেদন হয় আমাদের বেড়িবাঁধের মধ্যে নেওয়া হোক অথবা বাঁেধর মধ্যে আমাদের জন্য অন্ততঃ বসবাসের জমি দেওয়া হোক।

সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি মেম্বর ভবতোষ কুমার মন্ডল বলেন, শিবসা নদীর পাশে এই অঞ্চলের অবস্থান হওয়ায় গত তিন মাসে এই এলাকা তিন বার ভেঙ্গেছে। তাই এই ১০৪টি পরিবার যদি বাঁধের আওতায় নেওয়া না হয় তাহলে এক বছর যেতে না যেতেই এই এলাকা নদী গর্ভে চলে যাবে। বিষয়টি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা পুনরায় ভেবে দেখবে বলেও তিনি মনে করেন।

এই বিষয়ে এলাকার প্রবীণ মানুষ ও সমাজসেবক এম এ মালেক বলেন, এমনিতেই নদীশাসন না করে বাঁধ তৈরী হচ্ছে। তার উপর অনেকগুলো পরিবার বাঁধের বাইরে থাকছে। এমন যদি কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয় তাহলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের বাধাগ্রস্থ হবে। তিনি আরও বলেন, আমার অনুরোধ নদী ভাঙ্গন রোধ করে তারপর বাঁধ নির্মান ও মেরামত হোক এবং এই ১০৪টি পরিবারের বিষয়ে সরকার বিশেষ নজর দিক। প্রয়োজনে প্রকল্পের ডিজাইনে পরিবর্তন আনুক সরকার।

//প্রতিবেদন/উপকূল বাংলাদেশ/১৪১১২০১৬//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য