সবুজ উপকূল ২০১৬, সাতক্ষীরার শ্যামনগরে উপকূলের সবুজ সুরক্ষার আহবান

মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগে স্কুলের সামনের রাস্তায় বর্ণাঢ্য সবুজ শোভাযাত্রা

মুন্সীগঞ্জ, শ্যামনগর, সাতক্ষীরা, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬ : স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের সবুজ সুরক্ষার আহবানের মধ্যদিয়ে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জে সুন্দরবন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হল ‘ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক সবুজ উপকূল ২০১৬’ কর্মসূচি। ৬ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার এ উপলক্ষে বিদ্যালয় অঙ্গণে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় লিখে-এঁকে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা পুরস্কার পায়।

অনুষ্ঠানমালার আওতায় ছিল আলোচনা সভা, গাছের চারা রোপণ, পুরস্কার বিতরণ, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ও দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ। কর্মসূচি উপলক্ষে প্রকাশিত দেয়াল পত্রিকা ‘বেলাভূমি’তে চারপাশের পরিবেশ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের লেখা প্রকাশিত হয়। উপকূলের পড়ুয়াদের মাঝে পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানো, সৃজনশীল মেধার বিকাশ, লেখালেখির মাধ্যমে তথ্যে প্রবেশাধিকারসহ জীবন দক্ষতা বাড়ানোর এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন শ্যামনগর ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আহসান উল্লাহ শরীফী। বিশেষ অতিথি ছিলেন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক শ্যামনগর শাখার ব্যবস্থাপক মো. রাশিদুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা মো. নজরুল ইসলাম, সুন্দরবন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি সুপদ কুমার বৈদ্য, বনশ্রী শিক্ষা নিকেতনের প্রধান শিক্ষক সুনির্মল কুমার মন্ডল, তপোবন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের রাম রঞ্জন বিশ্বাস, কলবাড়ী নেকজানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিবাশিষ কুমার মন্ডল।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির বক্তব্য দিচ্ছেন  মো. আহসান উল্লাহ শরীফী

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সুন্দরবন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সবুজ উপকূল ২০১৬ স্থানীয় বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক প্রশান্ত কুমার বৈদ্য। অনুষ্ঠানের শুরুতে তিনি স্বাগত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। কর্মসূচির প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন উপকূল সাংবাদিক ও সবুজ উপকূল কর্মসূচির উদ্যোক্তা রফিকুল ইসলাম মন্টু। শিক্ষার্থীদের পক্ষে বক্তব্য তুলে ধরে সুন্দরবন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্রী শম্পা রানী গায়েন। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন সুন্দরবন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাংবাদিক রনজিৎ বর্মন।
আলোচনা সভায় বক্তারা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, উপকূল সুরক্ষায় আগামী প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। উপকূল অঞ্চল বিভিন্ন ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস এ অঞ্চলে প্রতি বছর হানা দেয়। এইসব কারণে আজকের পড়ুয়ারা ঝুঁকির মুখে আছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে তাদের রয়েছে নানান সমস্যা। এইসব সমস্যা মোকাবেলায় আগামী প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু গাছ লাগানো নয়, এর পাশাপাশি চারপাশের পরিবেশ রক্ষায় সজাগ হতে হবে। পরিবেশ ও ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। লেখালেখির মধ্যদিয়ে শিক্ষার্থীরা অনেক তথ্য আহরণের পাশাপাশি সচেতন হয়ে উঠতে পারে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির হাত থেকে পুরস্কার নিচ্ছে এক বিজয়ী

পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত, গীতা পাঠ ও সমবেত জাতীয় সঙ্গীতের মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা ঘটে। আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মসূচি শুরুর আগে বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তায় অংশগ্রহনকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহনে বর্নাঢ্য র‌্যালী অনুষ্ঠিত হয়। পরে র‌্যালীটি অনুষ্ঠানস্থলে মিলিত হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথিসহ অন্যান্য অতিথিবর্গ বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করেন। এছাড়া অংশগ্রহনকারী বিদ্যালয়গুলোর প্রধানদের মাঝে গাছের চারা বিতরণ করে। মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে।

সবুজ উপকূল ২০১৬ কর্মসূচির আওতায় ৯ম-১০ম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত ‘চারপাশের পরিবেশ সমস্যা ও উত্তরণের উপায়’ বিষয়ে রচনা লিখন প্রতিযোগিতায় ১ম হয়েছে ত্রিপানি বিদ্যাপীঠের ১০ম শ্রেণীর লিমা মন্ডল, ২য় হয়েছে সুন্দরবন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণীর আমিনা খাতুন, ৩য় হয়েছে একই বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণীর সম্পা গাইন। একই শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত ‘উপকূল’ বিষয়ে কবিতা/ছড়া প্রতিযোগিতায় ১ম হয়েছে সুন্দরবন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণীর তাহিরা সুলতানা, ২য় হয়েছে কলবাড়ি নেকজানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণীর শিশির কুমার রপ্তান, ৩য় হয়েছে সুন্দরবন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেনীর পার্বতী রানী।

শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জে লিখে-এঁকে পুরস্কার জিতল যারা

কর্মসূচির আওতায় ৬ষ্ঠ-৮ম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত ‘সবুজ উপকূল সুরক্ষায় আমিও অংশীদার’ বিষয়ে পত্র লিখন প্রতিযোগিতায় ১ম হয়েছে বনশ্রী শিক্ষা নিকেতনের অষ্টম শ্রেণীর নবেন্দু মন্ডল, ২য় হয়েছে ত্রিপানি বিদ্যাপীঠের সপ্তম শ্রেণীর যুবরাজ কুমার মন্ডল, ৩য় হয়েছে বুড়িগোয়ালিনী ফরেষ্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর মোছা. নূরনাহার খাতুন। একই শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত ‘আমার স্বপ্নের উপকূল’ বিষয়ে ছবি আঁকা প্রতিযোগিতায় ১ম হয়েছে সুন্দরবন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর কৃতিদীপা মন্ডল, ২য় হয়েছে একই বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর সায়ন্তনী মন্ডল, ৩য় হয়েছে একই বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীর সাদিয়া তাসনিন।

৬ষ্ঠ-১০ম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত ‘চারপাশের যেকোন বিষয়’ নিয়ে সংবাদ লিখন প্রতিযোগিতায় ১ম হয়েছে সুন্দরবন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণীর তাহিরা সুলতানা, ২য় হয়েছে ত্রিপানি বিদ্যাপীঠের ৯ম শ্রেণীর রাজর্ষি রায়, ৩য় হয়েছে সুন্দরবন মাধ্যমিমক বালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর মারুফা আক্তার।

মেধার ভিত্তিতে ১২জন শিক্ষার্থীকে স্কুল ব্যাগ, জ্যামিতি বক্স, কাগজ ও কলম দেয়া হয়। এরা হচ্ছে : বুড়িগোয়ালিনী ফরেষ্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর রুমা আক্তার, সপ্তম শ্রেণীর মো. ইব্রাহিম খলিল, তপোবন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর বিপাশা রানী, ষষ্ঠ শ্রেণীর সুপ্রিয়া রানী, কলবাড়ি নেকজানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর মো. তরিকুল ইসলাম, ১০ম শ্রেণীর সুমাইয়া বিলকিস, ত্রিপানি বিদ্যাপীঠ ষষ্ঠ শ্রেণীর তৌফিক হাসান, সপ্তম শ্রেণীর যুবরাজ কুমার মন্ডল, বনশ্রী শিক্ষা নিকেতনের নবম শ্রেণীর মো. নাজমুল ইসলাম, রাখি কর্মকার এবং সুন্দরবন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীর ফাতেমা খাতুন সপ্তম শ্রেণীর আসমা-উল হুসনা।

শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জে শিক্ষা উপকরণ পেলো যারা

কর্মসূচিস্থলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বারসিক ও লিডার্স-এর উদ্যোগে দু’টি পৃথক স্টলে পড়ুয়াদের উপযোগী বিভিন্ন ধরণের তথ্য উপস্থাপন করা হয়। বারসিক দেশি জাতের ধান ও উদ্ভিদ শিক্ষার্থীদের দেখায়। লিডার্স জলবায়ু ও পরিবেশ বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য জানায় পড়ুয়াদের।

কর্মসূচিতে ৬টি বিদ্যালয় অংশ নেয়। এগুলো হচ্ছে : বুড়িগোয়ালিনী ফরেষ্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়, তপোবন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, কলবাড়ি নেকজানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ত্রিপানি বিদ্যাপীঠ, বনশ্রী শিক্ষা নিকেতন এবং সুন্দরবন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় এই কর্মসূচির আয়োজন করেছে উপকূল বাংলাদেশ। এতে মিডিয়া পার্টনার হিসাবে ছিল একুশে টেলিভিশন, দৈনিক ইত্তেফাক, ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, রেডিও ভূমি ও বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম। আইটি পার্টনার ছিল আইটি প্রতিষ্ঠান ডটসিলিকন। আয়োজনে সহযোগিতা করেছে স্কুল পড়ুয়াদের লেখালেখির সংগঠণ আলোকযাত্রা।

কর্মসূচিতে স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের পরিবেশ সচেতনতার পাশাপাশি সৃজনশীল মেধা বিকাশের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ইভেন্টে পড়ুয়ারা লেখালেখির মাধ্যমে নিজেদের ভাবনা প্রকাশ করে।

শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জে বর্নাঢ্য সবুজ শোভাযাত্রা

গত বছর সবুজ উপকূল ২০১৫ কর্মসূচির সফল সমাপ্তির ধারাবাহিকতায় এবার সবুজ উপকূল ২০১৬ কর্মসূচির যাত্রা শুরু হয়। এবার কর্মসূচির আওতায় এসেছে উপকূলের ১৪ জেলার ২৫টি উপজেলা। ২৬টি স্থানের ১১৬টি স্কুলের প্রায় ৮০ হাজার শিক্ষার্থী এই কর্মসূচিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশ নিচ্ছে।

এবার স্কুল-ভিত্তিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে ভোলার সদর, তজুমদ্দিন, মনপুরা, বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ, পটুয়াখালীর গলাচিপা ও কলাপাড়া, বরগুনার বেতাগী, ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া, বাগেরহাটের সদর, শরণখোলা, মোড়েলগঞ্জ, সাতক্ষীরার তালা, শ্যামনগর, খুলনার কয়রা, পাইকগাছা, লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের তোরাবগঞ্জ, হাজীরহাট, নোয়াখালীর হাতিয়া, সুবর্ণচর, ফেনীর সোনাগাজী, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ, বাঁশখালী, এবং কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও টেকনাফ।

//প্রতিবেদন/উপকূল বাংলাদেশ/০৬০৯২০১৬//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য