লক্ষ্মীপুরে তীব্র লোডশেডিং, পরিক্ষার্থীদের ভোগান্তি চরমে

লোডশেডিং

লক্ষ্মীপুর : লক্ষ্মীপুরে প্রতিনিয়ত অস্বাভাবিকহারে বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়ে চলছে। এতে অস্বস্তিতে পড়তে হচ্ছে স্কুল-মাদ্রাসা ও কলেজ পড়ুয়াদের। তাদের এ অস্বস্তি প্রকাশ পায় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেইসবুকে। ৩০ আগষ্ট রাতে এক ফেইসবুক ব্যবহারকারীর প্রোফাইলে দেখা যায় ‘কাল পরীক্ষা এখন পড়তে বসার আগেই বিদ্যুৎ চলে গেল’- এমন স্ট্যাটাস। প্রতিনিয়ত অস্বাভাবিক হারে বিদ্যুতের লোডশেডিং হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভ আর অসন্তোষ।

বছরের এসময়টিতে বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসহ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি (পাস) ও অনার্সসহ বিভিন্ন কোর্সের পরীক্ষা চলছে। এতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করছে। আলোর অভাবে শিক্ষার্থীরা ঠিকভাবে পড়াশোনা করতে পারছে না। সাধারণত শিক্ষার্থীরা রাতেই পড়াশুনা করা বেশি সুযোগ পায়। তাই প্রতিনিয়ত অস্বাভাবিকহারে লোডশেডিংয়ে স্কুল-মাদ্রাসা ও কলেজ পড়ুয়াদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ।

জেলার সদর, রামগঞ্জ, রায়পুর, কমলনগর ও রামগতিতে এক মাস ধরে অস্বাভাবিকহারে বিদ্যুতের লোডশেডিং চলছে। বিদ্যুৎ গেলে যেন আসার খবর থাকে না। এতে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে লোকসানের পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। দিন-রাত সমানতালে লোডশেডিং বাড়ায় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সর্বস্তরের জনগণের মাঝে বাড়ছে চরম ক্ষোভ আর অসন্তোষ ।

এদিকে অস্বাভাবিক লোডশেডিংয়ে রাতের বেলা লক্ষ্মীপুর শহরবাসীকে অধিকাংশ সময়ই অন্ধকারে কাটাতে হয়। রাতে শহরের বাড়িগুলোতে ২০ মিনিট আলো জ্বললে দুই ঘন্টা অন্ধকার হয়ে থাকে। দিন দিন যেন এর মাত্রা বেড়েইে চলছে।

অন্যদিকে, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবিতে বিভিন্ন সময় রায়পুর, চন্দ্রগঞ্জ, রামগতি, রামগঞ্জ ও কমলনগরসহ জেলার বিভিন্নস্থানে গ্রাহকরা মানব বন্ধন ও সড়ক অবরোধসহ নানা আন্দোলন করে সুফল আসেনি। ২০১৪ সালের ৯ অক্টোবর বিদ্যুতের দাবিতে বিক্ষুব্ধ লোকজন রায়পুরে পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ের সামনে সাতটি গাড়িতে আগুন দিয়েছিলেন। এতে কয়েক লাখ টাকার বৈদ্যুতিক মালামালও পুড়ে যায়। এসময় লক্ষ্মীপুর-রায়পুর আঞ্চলিক মহাসড়কের মেইন রোড, বাসাবাড়ি ও রাখালিয়া এলাকায় গাছের গুঁড়ি, ইট ফেলে এবং টায়ার জ্বালিয়ে কয়েক ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন বিক্ষুদ্ধরা।

লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলায় পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক রয়েছে দুই লাখ ১০ হাজার। পিক আওয়ারে প্রায় ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে ২৩ থেকে ২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এরমধ্যে শুধু রায়পুর উপজেলায় প্রায় ৩৬ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। তাদের চাহিদা ১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। কিন্তু পানপাড়া ও রায়পুরের বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে (সাব স্টেশন) বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৬ মেগাওয়াট। এ দুই উপকেন্দ্র থেকে সাতটি ফিডারে গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এতে কল-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক-বীমা ও অফিসপাড়াসহ সর্বত্র স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

গ্রাহকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যুৎ সরবরাহে কর্তৃপক্ষ সুষম বন্টন না করে বৈষম্য করছেন। এজন্য জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশী লোডশেডিং হচ্ছে রামগঞ্জ, রায়পুর, চন্দ্রগঞ্জ, রামগতি ও কমলনগর। এক ঘণ্টা পর পর দুই ঘণ্টা লোডশেডিং। সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত এটা এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনেও  লোডশেডিং  থেকে রেহাই পাওয়া যায় না।

লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের ডিগ্রি ১ম বর্ষের ছাত্র আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, গ্রামে বিদ্যুতের লোডশেডিং ভয়াবহ। একবার বিদ্যুৎ গেলে আসার খবর থাকে না। এতে পড়ালেখার পাশাপাশি মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

একটু স্বস্তির আশায় গ্রাম থেকে আসা শহরের ভাড়াটে কামরুল ইসলাম হতাশ হয়ে বলেন, পৌরসভাতেই মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিংয়ে ভুগতে হচ্ছে। পৌরসভায় যেখানে এ অবস্থা সেখানে গ্রামে থাকলে যে কি অবস্থায় পড়তে হত তা অনুমান করা যাচ্ছে।

রামগঞ্জের সংবাদকর্মী আবু তাহের বলেন, আধা ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলেও আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লোডশেডিং দেয়া হয়। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নেমে আসছে। এ অবস্থার উত্তরণ না হলে গ্রাহকরা বাধ্য হয়েই আন্দোলনে নামবে।

সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এম সালাহ উদ্দিন টিপু সাংবাদিকদের বলেন, বিদ্যুতের অস্বাভাবিক আসা-যাওয়ার কারণে মানুষের ঘুমও হারাম হয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে জেলা মাসিক সমন্বয় কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে। কোন সুফল মিলছে না।

রায়পুর পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) শামছুল হক সাংবাদিকদের বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় সন্ধ্যার পর থেকে একটি ফিডার বন্ধ করে অন্যটি চালু করা ছাড়া উপায় থাকে না। ঘুরে ঘুরে বন্ধ ফিডারে আবার সংযোগ দিতে দুই ঘণ্টার মতো সময় লেগে যায়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ব্যবস্থাপক শাহজাহান কবির সাংবাদিকদের জানান, চাঁদপুর কেন্দ্রে গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ থাকায় এ সংকট হয়। এছাড়াও নোয়াখালীর চৌমুহনী-লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক গ্রিডের ৩৩ হাজার কেবি সঞ্চালন লাইনে উন্নয়ন কাজ চলছে। শীঘ্রই সংকট কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

//প্রতিবেদন/উপকূল বাংলাদেশ/০২০৯২০১৬//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য