মেঘনার ভাঙণ, উত্তর ভোলার বহু শিক্ষার্থীর পড়ালেখা অনিশ্চয়তায়

ভোলার ইলিশায় জোয়ারের পানিতে ডুবে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভোলা : রাক্ষুসে মেঘনার করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে যাওয়ার পথে উত্তর ভোলার পূর্ব ইলিশা ও রাজাপুরের মধ্যে থাকা বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এতে শঙ্কায় রয়েছে ওই সকল প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকরা। অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে কয়েক হাজার ছাত্র-ছাত্রীর শিক্ষাজীবন।

এসব ছাত্র-ছাত্রীর পাঠদান স্বাভাবিক রাখার দাবী অভিভাবকদের। দ্রুত এ বিষয়ে বাস্তবমূখী পদক্ষেপ নেয়া দাবী জানিয়েছেন ওই এলাকার অভিজ্ঞ মহল।

ভাঙ্গন কবলিত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ও রাজাপুরের পিছু ছাড়ছেনা মেঘনা। প্রতিনিয়তই ভাঙ্গছে। এতে বিলীন হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। সব হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে সেখানে বসবাসরত পরিবারগুলো। সেই সাথে ভেঙ্গে যাচ্ছে শত বছরের পুরনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহও।

এমনই একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মৌলভীর হাট হোসাইনিয়া ডিগ্রী (ফাজিল) মাদ্রাসা। যা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৩৫ সালে। প্রতিষ্ঠা লাভের পর থেকে দীর্ঘ ৮১ বছর এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জড়িয়ে রয়েছে হাজারো স্মৃতি। এ প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী। বর্তমানে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিও ভাঙ্গনের হুমকির মুখে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে ভাঙ্গন কবলিত মেঘনার দুরুত্ব মাত্র ১শ’ মিটার। মেঘনার ভাঙ্গন যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে যে কোন মূহুর্তে বিলীন হয়ে যেতে পারে প্রাচীন ও ঐতিয্যবাহী এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

মৌলভীরহাট মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন, মেঘনার ভাঙ্গনের হুমকিতে থাকার কারণে অনেক শিক্ষার্থী এখান থেকে চলে গেছে। মাদ্রাসায় যারা পড়ালেখা করছে, তাদের অধিকাংশই ভাঙ্গন কবলিত এলাকার ছাত্র-ছাত্রী। তারা নিজেরাই বাঁচতে দায়, তার উপর পড়ালেখা। তাই ওই সমস্ত শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারছে না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ওই সকল শিক্ষার্থীরা। পুরনো এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করতে কর্তৃপক্ষের দৃস্টি কামনা করছেন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ এলাকার জনগণ।

এছাড়া রাজাপুর-ইলিশার মধ্যখানে অবস্থিত ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত গাজীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এ প্রতিষ্ঠানের একেবারে নিকটে চলে এসেছে নদী। যার দুরুত্ব মাত্র ৮০ মিটার। ভাঙ্গনের মুখে থাকায় চিন্তিত হয়ে পড়েছেন স্কুলের কর্তৃপক্ষ। এখানেও পড়া-লেখা করছে প্রায় হাজার খানেক শিক্ষার্থী। যার অধিকাংশই মেঘনায় ভাঙ্গন কবলিত এলাকার। মেঘনার ভাঙ্গন অব্যহত থাকার কারণে পূর্নিমা আর অমাবশ্যার জোয়ারের কারণে ওই সমস্ত এলাকায় পানি উঠে। যার কারণে প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি কমে গেছে।

ওই প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ৮ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী শাহনাজ আক্তার ও রুবেল জানান, মেঘনায় গিলে খাচ্ছে ইলিশা আর রাজপুরকে। ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানের অনেকটা কাছে চলে এসেছে নদী। এ প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষার জন্য তারা কর্তৃপক্ষের নিকট দাবী জানিয়েছেন।

গাজীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম জানান, জোয়ারের কারণে রাস্তা একে বারেই নস্ট হয়ে গেছে। যাতায়ত ব্যবস্থা দুরুহ। আর এ সমস্ত বাধা পেরিয়ে যারা প্রতিষ্ঠানে আসছে, তাদের মন থাকে বাড়ীতে। এতে করে তাদের পড়ালেখায় মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।

অন্যদিকে দেখা গেছে নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে রাজাপুর আদর্শ নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ১শ’ ৫০ জন শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তারা খন্ডকালীন ক্লাস করছে গাজীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ইলিশা বাঁচাও কমিটির আহবায়ক আনোয়ার হোসেন জানান, ইলিশাকে রক্ষার জন্য যে বরাদ্দ হয়েছে তার দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক। তা না হলে ভাদ্র-আশ্বিন মাসের উত্তরাঞ্চলের চাঁপে নদীর ভাঙ্গন আরো বেড়ে আর হবে না কোন কাজ। শেষ হয়ে যাবে স্বপ্নের ইলিশা।

এছাড়াও ভাঙ্গনের মুখে রয়েছে ইলিশা ও রাজাপুরের ৪টি মাদ্রাসা, ২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১টি ডিগ্রী কলেজ, ১টি কারিগরী কলেজ, ৫টি প্রাইমারী স্কুল, ২টি কিন্ডার গার্টেন, ১টি ক্লিনিক, ১টি এতিমখানাসহ ৩টি গুরুত্বপূর্ণ বাজার।

মেঘনার ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যাওয়া এবং হুমকির মুখে থাকা এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যত সর্ম্পকে জানতে চাইলে ভোলা সদর উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ভাঙ্গন কবলিত এ সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে এখনও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে দ্রুত এদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

//প্রতিবেদন/উপকূল বাংলাদেশ/১২০৮২০১৬//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য