কমলনগরের রহিমার বসতি ৭ বার মেঘনার ভাঙণে পড়েছে

বিপন্ন ঘরের সামনে রহিমাকমলনগর, লক্ষ্মীপুর : মেঘনার ৭ বার ভাঙ্গনে অসহায় লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার মেঘনাতীরের মতিরহাট বেড়িবাঁধ সংলগ্ন বসাবসরত বিবি রহিমা (৩৫)।

১০ ই আগষ্ট বুধবার মেঘনার পথে ঘুরলে দেখা হলে এমন তথ্য মিলে বিবি রহিমার (৩৫) থেকে। স্বামী মোঃ রুহুল আমিন (৪০) একজন ভ্যানচালক। দৈনিক ভ্যান গাড়ি চালিয়ে আয়ের যে টাকা পায় তা দিয়ে সংসারটা চালানো খুবই কষ্টসাধ্য তাদের। নদীর দিকে হাত দিয়ে দেখান ঐ যে আমাদের বাড়ি আগে ঐখানে ছিলো। এই বেড়ির উপর ১ হাজার টাকা দিয়ে আশ্রয় মিলে আমাদের। কিন্তু, মেঘনা নদীর হঠাৎ তীব্র ভাঙ্গন খুব সন্নিকটে চলে আসে।

প্রতিদিনই জোয়ারের পানির আক্রমনে খুব আতংকিত জীবন অতিবাহিত করতে হয়। এভাবে এখানে আর কোনভাবেই থাকা যাচ্ছেনা। কোন জমি ক্রয় করার সামর্থ আমার নাই। একটু দূরে বেড়িবাঁধের পাশে এক ভিটা জমি দেখলাম যার দাম দিতে হবে ৪ হাজার টাকা। কিভাবে কোথায় থেকে মিলবে টাকাগুলো? ভ্যানচালক স্বামীর পক্ষে এতটাকা যোগানো সম্ভব না। আমি খুব চিন্তিত কোথায় আমি আশ্রয় নিবো? এভাবেই হাজারো নদীভাঙ্গা পরিবারের হাহাকার প্রতিদিন বেড়েই চলছে।

মেঘনার তান্ডবে প্রতিদিনই গিলে খাচ্ছে কমলনগরের এক গ্রামের পর আরেকটি গ্রাম। ক্রমান্বয়ে লক্ষ্মীপুরের মানচিত্র থেকে ছোট হয়ে আসছে উপজেলাটি। উপজেলার দুর্দশাগ্রস্থ অসহায় মানুষের হাহাকার যেন দেখার কেউ নেই ! কেন এই অসহায় মানুষগুলো রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক অধিকার নিজের বাসস্থান থেকে বঞ্চিত?

মেঘনা অতি নিকটবর্তী হওয়ায় প্রতিদিনই মানুষের খাবার তৈরির অন্যতম মাধ্যম চুলাকে দৈনিক দুই বার ভিজিয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় অনাহারে কিংবা অর্ধাহারে দিন অতিবাহিত করতে হয় তাদের। এমনটাই তথ্য মিলে জলোচ্ছাসের সময় মেঘনাপাড়ে গিয়ে।খুব তাড়াহুড়া করে রান্না-বান্না না করতেই জোয়ারে থালা-বাসন ডুবে যায় তাদের।

অন্যদিকে মেঘনাতীরবর্তী ক্ষেতের ফসলগুলো জোয়ারের তীব্র উত্তাল স্রোতে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ক্ষতিতে পড়া কৃষকের মুখে ফুটছেনা কোন হাসি।

মেঘনার এই অব্যাহত ভয়ানক তান্ডবে উপজেলার সবুজ গাছপালাগুলো বর্তমানে ধ্বংস হচ্ছে প্রতিদিনই। এতে, প্রাকৃতিক দূর্যোগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশাংকা স্থানীয়দের। দিন যত পার হচ্ছে কমলনগরের সুনামধন্য ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান কিংবা বহু জন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। মেঘনার পথে ঘুরলে আরো তথ্য মিলে নদীভাঙ্গন যত বাড়ে খাল তত বাড়ে ।

ফলে মানুষের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম জমিগুলো বিলীন হওয়ায় বৃদ্ধি অভাব-অনটন। মেঘনার এই তান্ডবে এলাকায় গড়ে উঠা ঘনবসতি প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাওয়ায় আগের চেয়ে অস্বাভাবিক জীবন যাপন করতে হয় স্থানীয়দের।

রাষ্ট্রের ৫টি মৌলিক অধিকারের মধ্যে কোনটিই কার্যকর নয় এসব ঘনবসতিতে । অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা বাসস্থান সমস্যা মোকাবেলা করা ঘনবসতির লোকদের পক্ষে কোন ভাবেই সম্ভব নয়। এই প্রত্যন্ত উপকূলের অন্যতম প্রধান সমস্যা নদীভাঙ্গা রোধ করে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নকে আরো তরান্বিত করা হবে বলে আশা করেন এই উপজেলার দুর্দশাগ্রস্থ মানুষগুলো।

//প্রতিবেদন/উপকূল বাংলাদেশ/১২০৮২০১৬//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য