মেঘনার ভাঙ্গনে কমলনগরে শত বছরের দুই বাজার বিলীন

মেঘনার ভাঙণের ভয়াবহ রূপ

লক্ষ্মীপুর : উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরে প্রতিনিয়তই মেঘনার ভাঙন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নদীর ভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানসহ মানুষের পৈত্রিক ভিটে-মাটি ও পূর্ব পুরুষের কবর। ভাঙনের পাশাপাশি সম্প্রতি মেঘনার জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী তীরবর্তী মানুষকে পানিবন্দির শিকার হতে হয়েছে। এখনও মাঝে মাঝে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে দেখা যায়। এদিকে মেঘনার পানি কমলেও তীব্র হয়ে উঠেছে নদী ভাঙন। এতে হারিয়ে যাচ্ছে নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের সর্বস্ব।

জেলার কমলনগর উপজেলায় মেঘনা নদীর ভাঙ্গন ভয়াবহ রুপ নিয়েছে। গত ১৫ দিনে উপজেলার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কাদিরপন্ডিতের হাট ও লুধূয়া বাজারের ছোট-বড় সহস্রাধিক ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান নদীর পেটে বিলীন হয়েছে। এ অবস্থায় ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ও ঘর-বাড়িসহ মাথা গোজার ঠাঁই হারিয়ে পথে বসেছে হাজারো মানুষ। যেন কান্না থামছে না সবহারাদের। প্রকৃতির এই দুর্ধর্ষ খেলা যেন তাঁদের পিছু ছাড়ছে না।

মেঘনার এ ভয়াবহ ভাঙনে কাদিরপন্ডিতের হাট ও লুধূয়া বাজারে ব্যবসায়ীরা তাদের সর্বস্ব হারিয়ে এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এসব এলাকার মানুষ তাদের ভিটে-মাটি, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান হারিয়ে আর্থিকভাবে চরম ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে। এ ক্ষতি পূরন করা কখনই সম্ভব নয়। নদীর ভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষ আজ দু’বেলা দু’মুঠো খাবার পেতে বেগ পেতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে না খেয়েই দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের। নদীর ভাঙনে হারিয়ে গেছে এসব এলাকার শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান গুলো। এতে এসব এলাকায় শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। নদীর পাড়ের স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা বন্ধ করে নৌকাতে কাজ করতে দেখা যায়।

এদিকে, নদী ভাঙন প্রতিরোধে একাধিকবার স্থানীয় লোকজন বিক্ষোভ, মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ ও প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন। তারা বছরের পর বছর ভাঙন রোধের দাবি জানিয়ে আসলেও এখনও কাজের কাজ কিছু হয়নি। বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে মতিরহাট, মাতাব্বরহাট, হাজীগঞ্জ, নবীগঞ্জ, ইসলামগঞ্জ ও নাছিরগঞ্জ বাজার।

জানা গেছে, কাদিরপন্ডিতের হাট ও লুধূয়া বাজার কমলনগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাজার। এ বাজারগুলো সাথে শত বছরের ইতিহাস জড়িত। নদীর ভয়াবহ ভাঙনে হাট-বাজার দু’টি এখন নদী গর্ভে চলে গেছে। শত বছর আগে-পাটারিরহাট, ফলকন ও সাহেবেরহাট ইউনিয়নের মিলনস্থলে লুধূয়া বাজার গড়ে উঠে। তিন ইউনিয়নের হাজার-হাজার মানুষের ভরসা ছিল বাজারটি। বিশেষ করে জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের প্রাণ কেন্দ্র ছিল লুধূয়া বাজার। এ বাজারে পাঁচশতাধিক দোকান-পাট ছিল।

ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ীরা জানিয়েছে, গত ১৫ দিনে কাদিরপন্ডিতের হাট ও লুধূয়া বাজারের ছোট-বড় সহস্রাধিক ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান নদীর পেটে বিলীন হয়ে গেছে। এনিয়ে তারা পুঁজি হারিয়ে পথে বসেছে। বাজারের কিছু দোকান অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে; কিন্তু বহু ব্যবসায়ী টাকার অভাবে ফের ব্যবসা করা সম্ভব হচ্ছে না।

গত তিন যুগ ধরে কমলনগরে নদীর ভাঙ্গনের খেলা চলছে। গত কয়েক বছর ধরে ভয়াবহ রুপ নেয়। এতে রাস্তা-ঘাট, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, আশ্রয় কেন্দ্র, ফসলি জমি ও ঘর-বাড়িসহ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা তলিয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ গাজী ইয়ার আলী বলেন, পাউবোর প্রধান প্রকৌশলীসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সম্প্রতি কমলনগরের ভাঙ্গন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এখানের একটি প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। বরাদ্ধ পেলে ভাঙ্গন রোধে কাজ শুরু করা হবে।

জরুরী ভিত্তিতে নদীর ভাঙ্গন রোধে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন, এমনটাই প্রত্যাশা কমলনগরে দু লক্ষাধিক মানুষের।

//প্রতিবেদন/উপকূল বাংলাদেশ/১১০৮২০১৬//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য