উপকূল জুড়ে শুরু হলো সবুজ উপকূল ২০১৬ কর্মসূচি, পরিবেশ সুরক্ষার আহবান

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আলহাজ্জ আবদুল মমিন টুলু বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করছেন

ভোলা, ৯ আগস্ট ২০১৬।। উপকূলের পড়ুয়াদের মাঝে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি আর সৃজনশীল মেধা বিকাশের লক্ষ্য সামনে রেখে মঙ্গলবার (৯ আগস্ট ২০১৬) শুরু হয়েছে ‘ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক সবুজ উপকূল ২০১৬’ কর্মসূচি। মধ্য উপকূলের দ্বীপ জেলা ভোলা সদরের মেঘনা তীরের প্রান্তিক স্কুল টবগী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এ কর্মসূচির সূচনা ঘটে।

সবুজের আহবানে বর্ণাঢ্য এ আয়োজনে চার স্কুলের সহস্রাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেয়। পড়ুয়ারা রচনা লিখন, ছড়া/কবিতা লিখন, পত্র লিখন, সংবাদ লিখন ও ছবি আঁকা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। প্রত্যেক প্রতিযোগিতা তিন করে বিজয়ী পুরস্কার পায়। এছাড়াও কর্মসূচির আওতায় ছিল আলোচনা সভা, গাছের চারা রোপণ, মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

‘নতুন প্রজন্মের জন্য চাই সবুজ উপকূল’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ভোলা জেলা পরিষদের প্রশাসক আলহাজ্জ আবদুল মমিন টুলু। সভাপতিত্ব করেন টবগী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও স্থানীয় সবুজ উপকূল ২০১৬ কর্মসূচি বাস্তবায়বন কমিটির আহবায়ক মো. ইসমাইল।

প্রধান অতিথি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, শুধু পাঠ্য বইয়ের পড়া মুখস্ত করে পরিক্ষায় ভালো ফলাফল করলেই চলবে না। এর পাশাপাশি চারপাশের জগত সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। উপকূলের প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। ভালো ফলাফলের সঙ্গে সাধারণ জ্ঞানের সংমিশ্রনই পারে মানুষের মত মানুুষ করে তুলতে। তোমাদেরকে ভালো মানুষ হয়ে প্রদীপের মত আলো জ¦ালাতে হবে, যাতে তোমার আলোতে আরও অনেকজন আলোকিত হতে পারে।

আলোচনা সভায় বক্তারা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, উপকূল সুরক্ষায় আগামী প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। উপকূল অঞ্চল বিভিন্ন ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস এ অঞ্চলে প্রতি বছর হানা দেয়। এইসব কারণে আজকের পড়ুয়ারা ঝুঁকির মুখে আছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে তাদের রয়েছে নানান সমস্যা। এইসব সমস্যা মোকাবেলায় আগামী প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু গাছ লাগানো নয়, এর পাশাপাশি চারপাশের পরিবেশ রক্ষায় সজাগ হতে হবে। পরিবেশ ও ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। লেখালেখির মধ্যদিয়ে শিক্ষার্থীরা অনেক তথ্য আহরণের পাশাপাশি সচেতন হয়ে উঠতে পারে।

অনুষ্ঠানের ভলান্টিয়ার দল

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন জেলা শিক্ষা অফিসার প্রাণ গোপাল দে, জেলা শিক্ষা কার্যালয়ের গবেষণা কর্মকর্তা মুহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ভোলা শাখার ব্যবস্থাপক মো. মনজুরুল আহসান, ভোলা জেলা টেলিভিশন জার্নালিস্ট ফোরামের সভাপতি আহাদ চৌধুরী তুহিন, পরানগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হাবিবুর রহমান, কাছিয়া সাহামাদার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মীর আমীর হোসেন, নিজাম উদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. এইচ এম মইনুল হক শিপু।

অনুষ্ঠান সূচনা ও উপস্থাপনায় ছিলেন টবগী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক ও স্থানীয় সবুজ উপকূল ২০১৬ কর্মসূচি বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব অসীম আচার্য্য। কর্মসূচির প্রেক্ষাপট ও উপকূলের সার্বিক অবস্থা নিয়ে কথা বলেন, সবুজ উপকূল ২০১৬ কর্মসূচির কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী ও উপকূল বিষয়ক ওয়েব জার্নাল উপকূল বাংলাদেশ-এর সম্পাদক রফিকুল ইসলাম মন্টু। অনুষ্ঠানের শুরুতে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য তুলে ধরে টবগী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র মো. রিয়াজ।

কর্মসূচিতে অংশগ্রহনকারী পড়ুয়ারা

অনুষ্ঠানে বক্তাদের আলোচনা শেষে প্রতিযোগিতার পাঁচটি বিষয়ে বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া লেখাপড়ায় অনুপ্রেরণা যোগাতে দরিদ্র পরিবারের পাঁচজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে স্কুল ব্যাগ, লেখার কাগজ ও কলম দেওয়া হয়। কর্মসূচি উপলক্ষে বিদ্যালয়ে ‘বেলাভূমি’ দেয়াল পত্রিকার ১২তম সংখ্যা প্রকাশিত হয়।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় এই কর্মসূচির আয়োজন করেছে উপকূল বাংলাদেশ। এতে মিডিয়া পার্টনার হিসাবে ছিল একুশে টেলিভিশন, দৈনিক ইত্তেফাক, ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, রেডিও ভূমি ও বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম। আইটি পার্টনার ছিল আইটি প্রতিষ্ঠান ডটসিলিকন। আয়োজনে সহযোগিতা করেছে স্কুল পড়ুয়াদের লেখালেখির সংগঠণ আলোকযাত্রা।

প্রধানত ৬ কারণে এই উপকূলের শিক্ষার্থীদের সামনে এ ধরণের একটি কর্মসূচি হাজির করা হয়েছে। কারণগুলো হচ্ছে, ১) উপকূল অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে আছে; ২) পরিবেশ সম্পর্কে তাদের সচেতনতা অনেক কম; ৩) জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা নেই; ৪) চাপাশের সাধারণ জ্ঞানের অভাব রয়েছে; ৫) সচেতনতামূলক তথ্য প্রাপ্তির সুযোগ কম; এবং ৬) পরিবর্তন সম্পর্কে উদ্যোগ গ্রহনের অভাব। প্রত্যক্ষভাবে উপকূলের স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা এই কর্মসূচির লক্ষ্য জনগোষ্ঠী হলেও পরোক্ষাভাবে এর সুফল পৌঁছাবে অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয় নাগরিকদের মাঝে।

বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী পড়ুয়ারা

কর্মসূচিতে স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের পরিবেশ সচেতনতার পাশাপাশি সৃজনশীল মেধা বিকাশের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ইভেন্টে পড়ুয়ারা লেখালেখির মাধ্যমে নিজেদের ভাবনা প্রকাশ করে।

গত বছর সবুজ উপকূল ২০১৫ কর্মসূচির সফল সমাপ্তির ধারাবাহিকতায় এবার সবুজ উপকূল ২০১৬ কর্মসূচির যাত্রা শুরু হয়। এবার কর্মসূচির আওতায় এসেছে উপকূলের ১৪ জেলার ২৫টি উপজেলা। ২৬টি স্থানের ১১৬টি স্কুলের প্রায় ৮০ হাজার শিক্ষার্থী এই কর্মসূচিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশ নিচ্ছে।

এবার স্কুল-ভিত্তিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে ভোলার সদর, তজুমদ্দিন, মনপুরা, বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ, পটুয়াখালীর গলাচিপা ও কলাপাড়া, বরগুনার বেতাগী, ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া, বাগেরহাটের সদর, শরণখোলা, মোড়েলগঞ্জ, সাতক্ষীরার তালা, শ্যামনগর, খুলনার কয়রা, পাইকগাছা, ল²ীপুরের কমলনগরের তোরাবগঞ্জ, হাজীরহাট, নোয়াখালীর হাতিয়া, সুবর্ণচর, ফেনীর সোনাগাজী, চট্টগ্রামের সন্দ্বপ, বাঁশখালী, এবং কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও টেকনাফ।

২৬টি মাঠ কর্মসূচি শেষে ডিসেম্বরে ঢাকায় সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে সবুজ উপকূল ২০১৬ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে।

//প্রতিবেদন/উপকূল বাংলাদেশ/০৯০৮২০১৬//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য