বাঁধা পেরিয়েও সফলতার খোঁজে মেঘনাতীরের কিশোর শরিফ

মতিরহাটে মেঘনাতীরে কিশোর শরিফের সঙ্গে আলাপ

কমলনগর, লক্ষ্মীপুর : বাংলাদেশ উপকূলের বিচ্ছিন্ন জনপদ লক্ষ্মীপুর জেলার কমলনগর উপজেলা। যেখানে মেঘনার রাক্ষুসে হানার তান্ডবে প্রতিক্ষণ বিলীন হচ্ছে সর্বস্তরের মানুষের ভিটে-মাটিসহ বহু সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। কোন মতেই সমাধান মিলছেনা এ অনগ্রসর জনপদের প্রধান সমস্যা নদীভাঙ্গার। এতে, এই প্রান্তিকের হতদরিদ্র পরিবারের বাস্তব জীবনে বেঁড়ে ওঠা বাঁধাগ্রস্থ হয়, প্রভাবিত হয় তাদের আজীবনের পথচলা।

২৯ই জুন রোজ বুধবার মেঘনাতীরে ছুটলে দেখা মিলে ১৭ বছরের কিশোর মোঃ শরিফের সাথে। মোঃ শরিফ উপজেলার মেঘনাতীরের মোঃ দুলালের সন্তান। তার মা আশুরা বেগম এবং ৪ ভাই ও ২ জন বোনকে নিয়ে চলছিলো তাদের সুখী জীবন। ২০০৬ সালে উত্তর পশ্চিম চর মার্টিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয় পড়ালেখার সন্ধানে। কিন্তু দরিদ্রতার পিছুটানে ২০০৮ সালে তৃতীয় শ্রেণীতে থাকাবস্থায় বাবা তাকে পাঠিয়ে দেন মতিরহাট মাছ ঘাটে জীবিকার সন্ধানে। পড়ালেখা বন্ধ হওয়ায় সেখানের মাছঘাটে মাছব্যাবসায়ীদের সাথে শ্রম করে সামন্য আয় করে দিন কাটছিলো তার। এরই মাঝে বাবা আরেকটি বিয়ে করলে অভ্যুত্থান ঘটে বাবার আরেকটি সংসারের। ফলে,পারিবারিক বিরোধে পিতা ছাড়া মা ও ভাই-বোন নিয়ে লক্ষ্মীপুর সদর ১৭ নং ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নে বাড়িঘর করে সংসার তাদের।

সংসারটি বিধ্বস্তে সকলের পড়া লেখা বন্ধ হয়ে পড়ে। নিরক্ষরতার ছোবলে আটকে পড়ে পুরো সংসার। মোঃ শরিফ সংসারের মেঝো ছেলে। বড় ভাই মনির দিনমজুর। মাছব্যাবসায়ীদের সাথে শ্রম দেওয়ার পাশাপাশি বরফকলে শ্রম দিতো এই কিশোরটি।ভাগ্যের এ কি নির্মম পরিহাস ২০১৪ সালের আগষ্ট মাসে বরফকলের সাথে ছিড়ে যায় তার বাম হাতটি।যোগ হয় সংসারে নতুন হতাশা। অর্থ সংকটে সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত মোঃ শরিফ।

অনেক দিন পর বরফকলে কাটা হাত নিয়ে সুস্থ হয়ে আবার জীবিকার সন্ধানে ফিরে আসলো কিশোরটি। সে বলে,পড়ালেখার প্রতি আমার খুব আকর্ষণ ছিলো। প্রতিদিন কাজে আসলে যে ১৫০-২০০ টাকা পাচ্ছি এতে মনের তৃপ্তি মিটছেনা। পড়ালেখা না করতে পেরে আমি এখন বুঝতে পারছি পড়ালেখার প্রয়োজনটা কতটুকু।

এভাবেই বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে প্রতিক্ষণ বেড়েই চলছে নিরক্ষতা। এসব এলাকায় বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয় সংকটে শিক্ষা ব্যবস্থ দূর্বল হয়ে
পড়ছে। মেঘনার ভাঙ্গনে বহু প্রাথমিক বিদ্যালয় বিলীন হওয়ায় নদীতীরে স্থাপিত বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদানে নানা বাঁধা মোকবেলা করতে হচ্ছে।
আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন কাহিনী কি এভাবে কিশোর মোঃ শরিফের মতো হতে থাকবে? সমস্যা সমাধানে প্রশাসনসহ সর্বস্তরের মানুষগুলো সচেতন হতে হবে। এসব এলাকায় শিক্ষা সচেতনতা সংকট মোকাবেলায় সরকার নানান পদক্ষেপ গ্রহন করবেন বলে প্রত্যাশা এই পূর্ব উপকূলের বিপন্ন এলাকার মানুষগুলোর।

//প্রতিবেদন/উপকূল বাংলাদেশ/২৬০৭২০১৬//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য