রাক্ষুসে মেঘনার তাণ্ডবে হুমকিতে কমলনগরের বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা !

ফলকন উচ্চ বিদ্যালয় মেঘনার ভাঙণের মুখে

কমলনগর, লক্ষ্মীপুর : মেঘনা নামটি শুনতে কেমন পাঠক তোমার কাছে? মেঘনার নাকি রাক্ষুসে ক্ষিদে সারা দিনে-রাতে ? কেন, কি কারণে তার এত ক্ষুদা ? তার পাকস্থলির ক্ষুদা নিবারণের জন্য কেউ কি নেই ? কি অপরাধ ছিল এই বিপন্ন জনপদ অনগ্রসর উপজেলা কমলনগরের অসহায় হতদরিদ্র মানুষগুলোর ? তাদের ভাগ্যে মেঘনার রাক্ষুসে ভয়াবহ তান্ডব মিলবে কেউ কি কখনো ভেবেছে ? এই পূর্ব উপকূল কমলনগরে মেঘনার ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞ হাজারো পরিবারকে ভিটে-মাটি হারা করবে তাও কি কেউ ভেবেছে ? এখনোও কি থেমে আছে মেঘনার ভাঙ্গন ? কতটুকু নিরাপদ মোদের সকল সরকারি-বেসরকারিসহ বহু ব্যাক্তিগত স্থাপনা ? কমলনগর মেঘনার ভাঙ্গনে হারিয়ে গেলে লক্ষ্মীপুর শহরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা মেঘনার ভাঙ্গন থেকে রক্ষা পাবে তারও কি কোনো শতভাগ নিশ্চয়তা আছে ? কি অপরাধে এই বাস্তুহারা মানুষের জন্য প্রশাসনের কঠোর নিরবতা ?

মেঘনার ভয়াবহ ভাঙ্গনে হুমিতে কমলনগরের ঐতিহ্যবাহী ফলকন উচ্চ বিদ্যালয় ! কিছু দিনের মধ্যেই অতিদ্রুত ব্যবস্থা না নিলে অতিসমুধুর এই মেঘনা নামটি তার রাক্ষুসে পেটে গিলে খাবে ঐ অঞ্চলের হাজারো শিক্ষার্থীর জ্ঞানাজর্নের অন্যতম প্রধান মাধ্যম কিংবা অনেক শিক্ষকের জীবিকার অন্যতম মাধ্যম বিদ্যালয়টিকে। ঐ অঞ্চলের মানবসভ্যতার অন্যতম স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলো বর্তমানে বিলীন ।

স্থানীয় পাটোয়ারীরহাট বাসিন্দা, লুধুয়া বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সৌদি প্রবাসী ফরিদ স্টোরের মো.ফরিদ উদ্দিন বলেন, এই অঞ্চলে বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ফলকন উচ্চ বিদ্যালয়,ফয়জুন্নাহার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাতাব্বরহাট বাজার, মাতাব্বরনগর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বহু স্থাপনা।বিলীন হয়ে গেছে লুধুয়া বাজার,মাতাব্বরনগর দারুছসুন্নাহ আলীম মাদ্রাসা, লুধুয়া বাজারের দুইটি মোবাইল টাওয়ার, দুইটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসা, দুইটি গাছ কারখানা, দুইটি রাইস কারখানা।

তিনি বলেন, গত বছর এই দিনে আমার দোকানটি মেঘনায় গিলে খেয়েছে। আমি যে পুকুরে গোসল করতাম, যেখানে বসে জীবনের অনেক সময় কাটাতাম সেই স্থানগুলোর কথা মনে পড়লে বর্তমানে আমার মনে অনেক কষ্ট লাগে। আমার জীবন থেকে এই স্থাপনাগুলো হারিয়ে যাওয়ায় আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিনা। এভাবেই কি হারিয়ে যাবে আমার প্রাণের জন্মস্থানের উপজেলাটি ?
ভাঙ্গন কবলিত এলাকা সরেজমিন ঘুরে চোখে পড়ে, কালকিনি মতিরহাট বাজার, বাজারের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মতিরহাট উচ্চ বিদ্যালয়, জনতা বাজার, নাছিরগঞ্জ বাজার, বাজার, নবীগঞ্জ বাজার বর্তমানে মেঘনার ভাঙ্গনে হুমকিতে রয়েছে,আতংক বিরাজ করছে এসব এলাকায়।

ইতিমধ্যে উপজেলার তালতলি বাজার ও কাদির পন্ডিতের হাট মেঘনার ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে। তালতলি বাজার ও কাদির পন্ডিতের হাট ভেঙ্গে বর্তমানে সাহেবের হাট এবং কালকিনি ইউনিয়নকে দুইটি ভাগে বিভক্ত করতে শুরু করেছে। কিছু দিনের মধ্যে ভাঙ্গন অব্যাহত থাকলে উপজেলার অন্যতম দুইটি ইউনিয়ন চরমার্টিন ও চরলরেন্স ইউনিয়নে প্রবেশ করবে সেই নামধারী মেঘনা নদী।

অত্র অঞ্চল থেকে ক্রমান্বয়ে হারিয়ে গেছে উপজেলার বিখ্যাত বাজার সাহেবেরহাট, তালতলি বাজার, হাজিগঞ্জ বাজার, গোয়াল মার্কেট,লুধুয়া বাজারসহ বহু সরকারী-বেসরকারী স্থাপনা। তাহলে কি এভাবেই হারিয়ে যাবে উপকূলের মানচিত্র থেকে পূর্ব উপকূলের কমলনগর উপজেলাটি ? এভাবে ভাঙ্গন অব্যাহত থাকলে কমলনগর উপজেলা পরিষদটিও ভাঙ্গন বিলীন হয়ে এলাকাটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে ।

বর্তমানে মেঘনার ভাঙ্গন তীব্রতা পর্যবেক্ষণ করলে অনুভব করা যায়, এভাবে ভাঙ্গতে থাকলে অতিদ্রুতই লক্ষ্মীপুরের মানচিত্র থেকে কমলনগর হারিয়ে যেতে পারে প্রায় ৮০%। বিষয়টি সর্ম্পকে জেলার অন্যতম শিক্ষাবিদ ও কমলনগরের রাজনীতিবিদ মো.জিয়া উদ্দিন ফারুক বলেন, মেঘনার ভয়াবহ ভাঙ্গন দেখে আমরা খুব উদ্বিগ্ন ।বর্তমানে এলাকার মানুষ মেঘনার ভাঙ্গনে খুব বেশি আতংকিত। এতে, বর্তমানে উপজেলার শিক্ষা ব্যবস্থা কঠিন সমস্যার মধ্যে পড়ে আছে ।

উপজেলার অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মেঘনায় বিলীন হওয়ায় মেঘনাপাড়ে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হুমকিতে পাঠদান হচ্ছে । রামগতি-কমলনগরের মেঘনার ভাঙ্গন রোধে ১শ ৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও এখনো কমলনগরে ভাঙ্গন রোধে কোনো উদ্যেগ না নেওয়াই এখনো মেঘনার ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে।

এই বাস্তুহারা মানুষগুলো যেখানে আশ্রয় নিচ্ছে কিছু দিন পর পর আবার মেঘনা নদী তাদের সেই আশ্রয়াস্থলে হানা দেয়। ফলে, এলাকায় বাড়ছে ঘনবসতি, বেকার সমস্যাসহ নানান জটিলতা। মেঘনার ভাঙ্গন অব্যাহত থাকায় বর্তমানে এই এলাকার উন্নয়নে নানা সমস্যা প্রতিনিয়ত ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। প্রশাসনের কাছে কমলনগরবাসীর একটাই দাবি, ’’বাঁচাও আমাদের, বাঁচাও কমলনগরকে’’।

//প্রতিবেদন/উপকূল বাংলাদেশ/১৫০৭২০১৬//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য