উপকূলের মেঘনাতীরে ঈদ আনন্দ পৌঁছাবে কী?

মেঘনাপাড়ের জেলেপল্লীমতিরহাট, কমলনগর, লক্ষ্মীপুর : বিশ্বের বুকে সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি ঘেরা আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। যেখানে নদী সকল প্রাণের অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে।এই নদী মাতৃক ভূখন্ডে যেখানে জোয়ার-ভাটার প্রভাব, লবণাক্ততার প্রভাব এবং বাতাসের ধরণ অন্যসব অঞ্চল থেকে অধিক ভিন্নতর সেসব এলাকাকে আমরা উপকূল হিসবে চিহ্নিত করে থাকি। যেখানে বসাবস করছে রাষ্ট্রের বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠী।বাংলাদেশের উপকূলে উন্নত এলাকার চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সবচেয়ে। এসব এলাকার কিছু এলাকা পরিচিত বিপন্ন জনপদ, কিছু পরিচিত অনগ্রসর,কিছু বিচ্ছিন্ন আবার বেশি এলাকা পরিচিত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে। এসব সমস্যার প্রধান কারণ হিসেবে দেখলেই আমরা নদীভাঙ্গাকে দেখতে পারি। নদীভাঙ্গা শুধু মানুষের ভিটে-মাটিকে চিনিয়ে নেয় না নদীভাঙ্গা মানুষের পুরো জীবনটাকেই প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের পূর্ব উপকূল এবং মধ্য উপকূলে বর্তমানে নদীভাঙ্গার তীব্রতা অত্যধিক। উপকূলের প্রধান নদী পদ্মা এবং মেঘনার ভাঙ্গন তীব্রতায় অসহায় পড়ছে লক্ষ লক্ষ জীবিকার সন্ধানী মানুষ। নদীভাঙ্গার ফলে বেকারত্ব জীবন দৈনন্দিন বেড়েই চলছে। নদীভাঙ্গা সমস্যা কবলিত এলাকার মধ্যে পূর্ব উপকূল লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী এবং মধ্য উপকূল ভোলা অন্যতম। বিভিন্ন সময়ের প্রাকৃতিক দূর্যোগে অধিক প্রাণহানি ঘটেছে এসব এলাকায়।

সম্প্রতি ঘুর্নিঝড় রোয়ানুর তান্ডবে প্রাণহানি ঘটেছে পূর্ব এবং মধ্য এই দুই উপকূলে। এসব ঘুর্নিঝড় মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনীয় আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব লক্ষ্যণীয়। উপকূলে ঘুর্নিঝড়ে প্রাণহানি ঘটার আরেকটি কারণ হচ্ছে আবহাওয়ার
পূর্বাভাস দানে। প্রতিটি ঘুর্নিঝড়ে উপকূলে বসাবসরত মানুষগুলো অসর্তকতা বেড়া জালে আটকে থাকে। যার কারণ হচ্ছে ঘুর্নিঝড়ের সতর্কতার সংকেত সাধারণ মানুষগুলোর নিকট পৌঁছায় না। প্রশাসন থেকে ঘুর্নিঝড়ের সতর্কতার সংকেতের জন্য প্রচারকৃত মাইকগুলো শুধু ফাঁকা রাস্তা অতিক্রম করে চলে যায়। অবশিষ্ট এলাকায় কোনভাবে সতর্কতার প্রচার কার্য্য অব্যাহত থাকেনা। জনসচেতনতার জন্য আমরা উপকূলবর্তী মসজিদের মাইকগুলো ব্যবহার করতে পারি।

উপকূলের নদীভাঙ্গা পরিবারগুলো এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা না করতেই তাদের ভাগ্যে আরেকটি প্রাকৃতিক দূর্যোগের শিকার হতে হয়। উপকূলীয় এলাকার নদীতীরবর্তী নিম্মাঞ্চলের পরিবারগুলো দরিদ্রতার কারণে প্রতিটি ঈদে কষ্টে জীবনকে অতিবাহিত করতে হয়।গত ২৮ জুন রোজ মঙ্গলবার সকালে লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের কালকিনি মেঘনা পাড়ে ছুটে গেলে দেখা মিলে কয়েকজন পথ শিশু, জেলে শিশু ও জেলের সাথে।নজরে পড়ে ছেঁড়া পোশাকে শিশুগুলো ঘুরছে।

জিজ্ঞাসা করলে ওদের মলিনমুখে মিলে অভাব আর অনটনের কথা।ওদের ছবি তুললে ওরা অনেক খুশি। একজন বললো আমাদেরকে ফেসবুকে দিবেন।আশ্বাস দিয়ে তোলা ছবি দেখাতে গেলে তাদের ছবির দিকে তারা অনেক্ষণ তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছুক।কথা হয় জেলে মো.আবদুল কাদেরের (২৫)সঙ্গে। জানান ইলিশ সংকটে মেঘনার বুকে ফিরা হচ্ছেনা তাদের। ইলিশ ধরতে গিয়ে ছিলেন গতকাল আজ আর যাবেনা। কথা আরেকজন জেলে মো. ছিড়ু মাঝির
(৩০) সাথে।

জানান, দৈনিক দুইবার ইলিশ ধরতে গেলে ফিরতে হয় শুন্য হাতে। দৈনিক ৫ হাজার টাকা ব্যায় করে ইলিশ সংকটে ফিরে আসলে আর মাছ ধরতে ইচ্ছেই জাগে না।আরো কয়েকজন জেলে জানায় ইলিশ সংকটের কারণে ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ছে তারা। সংসারের অভাব-অনটন প্রতিক্ষণ যেন বেড়েই চলছে। ফলে, কিভাবে সম্পন্ন হবে পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ। এসব পরিবারগুলোতে সাধারণভাবে ঈদের প্রয়োজনীয় বাজার করতে গেলে ৫-৬ হাজার টাকার প্রয়োজন।

তাহলে এই টাকাগুলোর প্রয়োজনটা মেটাতে কেউ কি পারবে? মা ইলিশ ধরতে নিষেধাজ্ঞার সময় জেলের প্রতি বৈষম্যের কারণে পাকস্থলির ক্ষুদা নিবারণের জন্য তাদেরকে মা ইলিশ ধরতে হয় বলে জানান মেঘনাতীরবর্তী মতিরহাটের আরেকজন জেলে।ফলে,সব সময় নদীতে ইলিশ সংকট হচ্ছে।এজন্য এবারের ঈদকে সামনে রেখে ইলিশ সংকটে জেলে পরিবারগুলোতে চলছে হাহাকার।

আসছে পবিত্র এই মাহে রমজানের ঈদুল ফিতরে ওদের এই হাহাকার মুখে হাসি ফোঁটাবে কে? জেলে পরিবারগুলোর সমস্যাগুলো আমলে নিবে কি প্রশাসন ? সর্বশেষ কথা হচ্ছে ঈদের দিন এসব জেলে পল্লীগুলোতে সবাই হাত বাড়িয়ে এমনটাই প্রত্যাশা করেন উপকূলবাসী।

//প্রতিবেদন/উপকূল বাংলাদেশ/০৪০৭২০১৬//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য