মেঘনাপাড়ে ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তা জেলেদের!

দৌলতখানে জেলেপল্লীভবানীপুর, দৌলতখান, ভোলা : রাতে ঘুম হয়না, আতংকের মধ্যে থাকি’ এই বুঝি ঘর ভেঙ্গে গেলো, নদীর দমা (স্রোতের) শব্দে রাতে ঘুম হয়না। কি করবো, কোথায় যাবো, নদী তো সবই লইয়্যা গেলো, তাই বাধের উপর ঝুঁপড়ি ঘরে আছি। হের মইদ্যে আবার ঋন পরিশোদের দুশ্চিন্তা।

ক্ষোভের সাথে এই কথাগুলোই বলছিলো দৌলতখানের মেঘনা তীরের বাসিন্দা লাইজু বেগম। তিনি জানান, এক সময় ঘর-ভীটা ছিলো এখন কিছুই নেই, নদীতে ৪ ভাঙ্গা দিছে। স্বামী জামাল হোসেন পেশায় জেলে। ২ ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বসবাস। এনজিও ঋন থেকে ২০ হাজার টাকা নিয়ে দুশ্চিস্তায় রয়েছি, আমাদের আবার কপালে ভালো খাবার জুটেনা। ঋন পরিশোধ করতে গিয়ে সব শেষ হয়ে যায়’।

এনজিও থেকে ঋন নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন গৃহবধু নাহারও। তিনি বলেন, স্বামী সিরাজ নদীতে মাছ ধরে, এনজিও থেকে ২০ হাজার টাকা ঋন নিয়ে ঘর মেরামত করেছি, ওই ঋন এখনও পরিশোধ করতে পারছিনা, ৫ ছেলে-মেয়ে ভাত খাওয়ার পয়সা জোটে না। চেয়ারম্যান-মেম্বার আমাদেও খোজ নেয়না, যদি কোন সাহায্য মেলে তাও আমাদেও ভাগ্যে জুটেনা। ওদিতে আবার দমার শদ্ধ, রাতে ঠিকমত ঘুমাতে পারিনা’।

এনজিও থেকে ঋন নিয়ে চরম সংকটে শুধু নাহার ও লাইজু নয়, জেলে পল্লীর এমন নারীদের সংখ্যা অনেক। যারা সহায়-সম্বল হারিয়ে বাধের উপর আশ্রয় নিয়ে মানবেতন দিন কাটাচ্ছেন।

বাঁধের উপর আশ্রিত হাসনুর, তাসলিমা, রোকেয়া, ইউনুস, ইব্রাহিমসহ অনেকেই একই অবস্থা। যারা চরম সংকটে থেকে অভাব-অনাটন আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনের পর দিন আর বছরের পর বছর প্রজম্মেও পর প্রজন্ম কাটিয়ে দেয়। তবুও কাটেনা তাদেও সংকট।

চারদিকে নদীবেষ্টিত দ্বীপজেলা চারপাশে নদী থাকায় বাধ উপকূলবাসীকে রক্ষার জন্য বাধ নির্মান করা হয়। সেখানে ভুমিহীন, অসহায়, দুস্থ ও ছিন্নমূল মানুষের বাস। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও স্যানিটেশনসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত এসব পরিবার। এমনই এক জনপদ ভোলা জেলার দৌলতখান উপজেলার ভবানীপুর। সেখানে ৫ শতাধিক মানুষের বসতি।

শহর জীবন থেকে আলাদা এদের জীবন জীবিকা। তবুও হাজারো সমস্যা নিয়ে দিন কাটান তারা। সেখানে আবার রয়েছে এনজিও’র কার্যক্রম। দরিদ্র এসব পরিবারগুলো ঋন নিয়ে সাময়িকের জন্য উপকৃত হলেও  ঋন পরিশোধ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাতে হয় তাদের। ঋন পরিশোধ করতে গিয়ে অনেক সময় ঘরের আসবাপ পত্র বিক্রি করতে হয়।

গৃহবধু সামসুন বলেন, ২৪ ঘন্টাই দমার শদ্ধ, বাতাস বেশী হলে ঘর কেপে উঠে। আমাদেও দু:খ দুর্দশা দেখা কেউ কেউ। এনজিও ঋন ছাড়া কোন উপায় নেই, তাই এনজিও আমাদেও উপহাওে আসে।

গৃহবধু মরিয়ম বলেন, আমরা গরীব মানুষ, ছেলে-মেয়েদেও পড়ালেখা করাতে পারিনা, তাই ঋন নেই, কিন্তু সেই ঋনের দায় নিয়ে কাটাতে হয়, কখনই ঋন পরিশোধ হয়না।

সরেজমিন ঘিরে দেখা গেছে,  মেঘনার কোল ঘেষে এক বিপন্ন জনপদ ভবানীপুর। বাধের দুই পাশে ঝুপড়ি ঘওে বসতি সেখানকার বাসিন্দাদের। তীওে ঘেষেই ঘড়ে উঠেছে এসব ছোট ছোট ঘর। মেঘনার ছোবলে কিছু দিন পর পরই তাদেও ঠিকানা পাল্টাতে হলেও নদীর তীরে গড়ে উঠে বসতি। সেখানে নদীর শদ্ধের সাথেই কাটে দিন।

এ ব্যাপারে দৌলতখান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,আমারা উপকূলের দরিদ্র মানুষদের জন্য জিজিএফ, ভিজিডি দিয়ে থাকি। এছাড়াও ঈদ মৌসুমে তাদেও মাঝে চাল বিতরন করা হয়। রোয়ানুতে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারেকেও সহযোগীতা করা হয়েছে। সরকারের সকল বরাদ্দ বিতরন হচ্ছে।

//প্রতিবেদন/উপকূল বাংলাদেশ/০৪০৭২০১৬//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য