‘সিডিএসপি আমাগো ভাগ্য বদলাইয়া দিছে’

বনজঙ্গল পরিস্কার করে অবশেষে নিজের বাড়িতে শান্তিতে বসবাসসুবর্ণচর (নোয়াখালী) : ‘সিডিএসপি আমাগো ভাগ্য বদলাইয়া দিছে। আগে ঠিক মতো বাড়িতে থাকতে পারতাম না। নানা রকম ভয় ছিল। জমি আবাদ করতে পারতাম না। রাস্তাঘাট ছিল না বলে চলাফেরা করতে পারমাত না। ঝড়-বন্যায় ভাসাইয়া লইয়া যাইতো। এখন কোন সমস্যা নাই।’এক সময়ের দুর্গম চরাঞ্চল হাতিয়া বাজারে আলাপকালে এই কথাগুলো বলছিলেন বয়ার চরের বাসিন্দা মফিজ উদ্দিন। তিনি এখন কাজকর্ম করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন। অথচ এক সময় তার হাতে কোন কাজই ছিল না। ফলে কাজে সন্ধানে ছুটতে হতো শহরে। কাজের পাশাপাশি জমিও বন্দোবস্ত পেয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ড সরকারের যৌথ উদ্যোগে দস্যুদের নিয়ন্ত্রনে থাকা এই চরের উন্নয়নে কাজ শুরু হয় ১৯৯৪ সালে। নেয়া হয় দীর্ঘ মেয়াদী প্রকল্প, নাম ‘চর ডেভেলপমেন্ট এন্ড সেটেলমেন্ট প্রজেক্ট’, যা সংক্ষেপে সিডিএসপি নামে পরিচিত। যুগ যুগ ধরে পিছিয়ে থাকা চরে এ প্রকল্প ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

আলাপ হয় মফিজ উদ্দিনসহ আরও অনেক জনের সঙ্গে। নারী-পুরুষ সকলেই সিডিএসপির কথা জানে। সকলেই এক বাক্যে বললেন, সিডিএসপি এসেই চরের মানুষের ভাগ্য বদলাইয়া দিচ্ছে। দুর্যোগের সময় আমরা কোথাও আশ্রয় নিতে পারতাম না। আশ্রয়ের অভাবে অনেক সময় মানুষজন মারা যেত। এখন সে সমস্যা নেই। কারণ সিডিএসপি সাইক্লোন শেলটার নির্মাণ করে চরের মানুষের আশ্রয়ের জায়গা করে দিয়েছে।

পড়ন্ত বিকালে হাতিয়া বাজারে কথা হচ্ছিল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বললেন, বাড়িতে যা কিছু উৎপন্ন হতো, আমরা বিক্রির সুযোগ পেতাম না। সিডিএসপি বাজারের উন্নয়ন করে দিয়েছে। রাস্তা পাকা করে দিয়েছে। এখন আমরা বাড়িতে উৎপন্ন সব পণ্য বাজারে বিক্রি করতে পারছি। ভালো দামের জন্য বাইরেও পাঠাতে পারছি।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেলো, দস্যুপ্রবণ এই এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে অন্ধকারে ঢাকা ছিল। বলতে গেলে মানুষজন ঘর থেকেই বের হতে পারতো না। নারীরা ঘরের বাইরের কাজে যাওয়ার সুযোগ পেতেন না। ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। গোটা চর জুড়ে উন্নয়নের আলো প্রতিফলিত হওয়ায় মানুষের জীবনধারাই বদলে গেছে।

চরের এক বাসিন্দা বলছিলেন, মাত্র ১০০ টাকার বিনিময়ে একজন ভূমিহীন দেড় একর জমির মালিক হচ্ছেন। পাচ্ছেন জমির বৈধ কাগজপত্র। অথচ স্বাভাবিক অবস্থায় এই পরিমাণ জমি নিতে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হতো।

সূত্র বলছে, এই চরাঞ্চল হাতিয়ার হরণী ও চানন্দী ইউনিয়নভূক্ত। কিন্তু সুবর্ণচর ও রামগতির সঙ্গে চরের সীমানা নিয়ে বিরোধ থাকায় পরিষদের নির্বাচন হচ্ছে না দীর্ঘদিন ধরে। আর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন না হওয়ায় পরিষদ থেকে এলাকার তেমন উন্নয়ন করাও সম্ভব হয়নি।

সিডিএসপি সূত্র জানায়, ভূমিহীনদের জমি বন্দোবস্ত থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, সাইক্লোন শেলটারসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মিত হচ্ছে প্রকল্পের অধীনে। সরকারের পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ, কৃষি, বন ও ভূমি মন্ত্রণালয় এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত।

প্রকল্পের অধীনে পানি উন্নয়ন বোর্ড বেড়িবাঁধ ও স্লুইজ নির্মাণ ও খাল খনন-পূনখননের কাজ করছে। এলজিইডি নিয়েছে রাস্তাঘাট, ব্রীজ-কালভার্ট, সাইক্লোন শেলটার নির্মাণের দায়িত্ব। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ গভীর নলকূপ ও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা নির্মাণ নিশ্চিত করছে। কৃষি বিভাগ এখানকার চাষিদের আবাদে সহায়তা করছে। বন বিভাগ বনায়নের কাজ এবং ভূমি বিভাগ ভূমিহীনদের মাঝে খাসজমি বন্দোবস্ত দিচ্ছে।

এককালের ভয়ের চরে শিশুরা নির্ভয়ে নিয়মিত স্কুলে যায়অন্যদিকে এই প্রকল্পের কাজ আরও টেকসই করতে এখানকার সামাজিক ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের কাজে সম্পৃক্ত করা হয়েছে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক, সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা, দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থা ও সোসাইটি ফর ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ। এসব প্রতিষ্ঠান চরে ভূমিহীনদের সংগঠিত করে বহুমূখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চরবাসীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সহায়তা করছে।

চরের ভূমিহীনদের মাঝে জমি বন্দোবস্তসহ অন্যান্য কাজ পর্যায়ক্রমে শুরু করে সিডিএসপি। জমির কাগজপত্র পাওয়ার পর থেকেই চরের অবস্থা বদলাতে শুরু করে। পর্যায়ক্রমে রাস্তাঘাটসহ অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকান্ড এগিয়ে যায়। আগে যেখানে হাঁটার পথ ছিল না, সেখানে এখন রাস্তা হয়েছে। যে জমিতে চাষাবাদের ব্যবস্থা ছিলনা, তাতে এখন অনেক ফসল হচ্ছে। হাটবাজারের উন্নয়ন ঘটায় এখানকার লোকজন নিজের বাড়িতে উৎপাদিত পণ্য বাজারে বিক্রি করতে পারছে।

চর এলাকায় বাস্তায়নাধীন সিডিএসপি-৪ এর এনজিও সেক্টর স্পেশালিষ্ট মো. জুলফিকার আলী বলেন, প্রকল্পটি দু’ধাপে বাস্তবায়িত হচ্ছে। একদিকে দুর্গম এই চরের অব কাঠামোর উন্নয়ন হচ্ছে, অন্যদিকে সামাজিক ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কার্যক্রম চলছে। একটি চর উন্নয়নে পর অরেক চরের উন্নয়নে কাজ শুরু হচ্ছে। এরফলে এখানকার বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হচ্ছে।

বয়ারচরের পূর্ব নবীপুর গ্রামে সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা পরিচালিত রূপালী মহিলা উন্নয়ন সমিতিতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে চরের ভূমিহীন পরিবারের নারীরা সংগঠিত হয়েছে। সাপ্তাহিক বৈঠকে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা ছাড়াও তারা বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও ঋণ পেয়ে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলছেন। আগে যেসব নারীরা ঘরের বাইরে যেতেন না, বাইরের লোকদের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন না, তারা এখন নিজেরাই বাইরের অনেক কাজ করেন।

এককালের দুর্গম চরে এখন মাছের চাষ হয়সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থার সহকারী পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, সিডিএসপি’র মাধ্যমে চরাঞ্চলে এই কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে এলাকার অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। এক সময় চরে ছিল ভয়ের পরিবেশ। বাইরের লোক সেখানে যেতে ভয় পেতো। এখন সে ভয় অনেকটাই কেটে গেছে।

দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থার প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর তামজিদ উদ্দিন বলেন, চরের পিছিয়ে পড়া মানুষরা সংগঠিত হয়ে তাদের অবস্থা বদলে নিচ্ছেন। সংগঠিত হতে পেরে নানা ধরণের কাজেও সম্পৃক্ত হতে পারছেন তারা। ফলে অন্ধকারে ঢাকা জীবনে পড়েছে আলোকরশ্মি। এরই সূত্র ধরে তারা এগিয়ে যাবে অনেক দূরে।

প্রসঙ্গত, বর্তমানে সিডিএসপি-৪ এর কাজ চলছে। এর অধীনে পাঁচটি চরে কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে: চর নঙ্গলিয়া, নলের চর, কেয়ারিং চর, চর জিয়াউদ্দিন ও উড়ির চর।

//রফিকুল ইসলাম মন্টু/উপকূল বাংলাদেশ/২৪১২২০১৫//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য