স্বরূপকাঠির রুমা, নার্সারিতে সফল নারী উদ্যোক্তা

বৃক্ষ রোপণে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার হাতে রুমাস্বরূপকাঠি (পিরোজপুর) : বৃক্ষ রোপনে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার ২০১৪ ব্যক্তিগত নার্সারী বিভাগে দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়েছেন পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির  রুমা বেগম। গত ৩০ জুলাই ঢাকায় বিশ্ব বাঘ দিবস ও জাতীয় বৃক্ষ মেলা সমাপনী অনুষ্ঠানে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর উপস্থিতিতে তার হাতে পুরস্কারের ক্রেষ্ট, সনদ ও ২০ হাজার টাকার চেক তুলে দেন পরিবেশ ও বন উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব।

উপজেলার জলাবাড়ী ইউনিয়নের আরামকাঠি গ্রামের মৃত আব্দুল জব্বারের মেয়ে রুমা। পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। অভাব অনটনের মধ্যে চলতো তার বাবার সংসার। অর্থাভাবে অষ্টম শ্রেনীতেই শেষ  হয় তার লেখাপড়া। ছোটবেলা থেকেই নার্সারীতে বাবার সাথে কাজ করতেন তিনি।

২০০৪ সালে একই গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. মানিকের সাথে  বিয়ে হয় রুমার। কিন্তু স্বামীর সংসারে এসেও অভাব যেন তার পিছু ছাড়েনি। স্বামীর সামান্য আয়ে ভাল চলছিলনা তাদের সংসার। এর মধ্যে ২০০৭ সালে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটে মানিকের দোকান পুড়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। স্বামীর সংসারে সচ্ছলতা আনয়নে  ঘরের পাশের জমিতে চারা উৎপাদনের কাজ শুরু করেন রুমা। শ্রমিক দিয়ে কাজ করানোর মত টাকা পয়সা না থাকায় স্বামী স্ত্রী মিলে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতো নার্সারীতে। কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে ওই বছরই চারা বিক্রি করে লাভের মুখ দেখেন তারা।

পরবর্তীতে নার্সারী ব্যবসায় স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন লালন করে স্বামীর দোকান ও নিজের গয়না বিক্রি করে ৭৫ হাজার টাকা নিয়ে স্বরূপকাঠি বাসষ্ট্যান্ড সংলগ্ন স্থানে ৪ একর জমি লীজ নিয়ে শুরু করেন চারা ও কলম উৎপাদন। পরে কর্মসংস্থান ব্যাংক ও বেসরকারী এনজিও ব্রাক থেকে ঋন নিয়ে নার্সারীর পরিধি আরো বৃদ্ধি করেন। দিন দিন প্রসারিত হয়ে বর্তমানে ৮ একর জমিতে রয়েছে তাদের নার্সারী।

তাদের নার্সারীতে কর্মসংস্থান হয়েছে ৮ শ্রমিকের। ‘নেছারাবাদ নার্সারী’ নামে ঐ নার্সারীতে ৬০ প্রজাতির ফলদ, ১৫ প্রজাতির বনজ, এবং শতাধিক প্রজাতির ভেষজ ও শোভাবর্ধক প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে। শীত মৌসুমে  নার্সারীতে ডালিয়া, কসমস, সালবিয়া, ষ্টার, জিনিয়া, সূর্যমুখী, ক্যাপসিক্যাপ, ক্যাবিষ্ট, গ্যাজোনিয়া, ক্যারোনডোনা, স্যালোসিয়া, রজনীগন্ধ্যা, গ্যালোডিয়া, নয়নতারা, গোলাপ, চন্দ্রমলি¬কা, ইনকাগাঁদাসহ বিভিন্ন ফুলে ফুলে থাকে ভরা।

স্বামী ও সন্তানদের সঙ্গে নিজের নার্সারিতে রুমা

প্রতিবছর এ নার্সারীতে ৩ লক্ষাধিক চারা ও কলম তৈরী হয়। এ সকল চারা ও কলম ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চালান দেয়া হয়। রুমার স্বামী  মানিক জানান, আমার স্ত্রীর কর্মদক্ষতা, সাহস ও অদম্য ইচ্ছার  ফলেই আজ আমাদের পরিবারে সচ্ছলতা এসেছে, আজ আমরা সাবলম্বী। বৃক্ষ রোপনে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার  প্রাপ্ত রুমা বেগম  জানান পুরস্কার পেয়ে অত্যন্ত খুশি, আনন্দিত ও গর্বিত।

অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, জন্ম থেকেই অভাবের মধ্যে বড় হয়েছি। ইচ্ছা থাকা সত্বেও অর্থাভাবে লেখাপড়া করতে পারিনি। আমার সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। নিরলস পরিশ্রম করে  সফল নারী উদ্দ্যোক্তা হিসেবে রুমা বেগম আজ প্রতিষ্ঠিত এবং পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার।

//মো.হালিমুর রহমান শাহিন/উপকূল বাংলাদেশ/স্বরূপকাঠি-পিরোজপুর/০৭০৮২০১৫//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য