আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বিপন্ন ডেরায় ফেরা!

- সম্পাদকীয়

সংগৃহিত ছবিঝড়ের ভয়াবহতা শেষ। বিপদ সংকেত উঠে গেছে। আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে উপকূলের প্রান্তিক জনপদের মানুষেরা আবার ফিরে গেছেন নিজেদের বিপন্ন ডেরায়। ওটাই তাদের ঘর-বসতি। পরিবারের সবাইকে নিয়ে সারাটি মৌসুম কাটিয়ে দেন সেখানেই। হয়তো ঘরখানা নদী কিনারে ভাঙণের মুখে। অথবা কোথাও স্থান না পেয়ে বসতি বানাতে হয়েছে সেই বাঁধের ঢালে, সামান্য জোয়ারেও যেখানে পানি ওঠে। নাগরিক সেবার সামান্যতমটুকুও যেখানে মেলে না, সেখানেই ফিরতে হয়েছে বিপন্ন মানুষদের। বড় কোন ঝড়ের সংকেত না এলে তাদেরকে কেউ আর নিরাপদে যেতে বলবে না।

বাংলাদেশের দক্ষিণে সমুদ্র তীরবর্তী এলাকার মানুষেরা সারা মৌসুম থাকেন বিপন্নতায়। দেশের অন্যান্য যে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়, উপকূলেআসে তার ছিটেফোটা। ফলে প্রান্তিক জনপদের মানুষেরা হাজারো কষ্টে দিন যাপন করেন। অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ না থাকায় এখানেই প্রকৃতিক সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয় তাদের। দারিদ্র্যে পিষ্ট বহু মানুষ তাদের দৈনন্দিন চাহিদাটুকু পূরণে হিমশিম খায়। কিন্তু কেন্দ্রে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা কথায় উপকূলের চিত্র একেবারেই উঠে আসে না। সারাদেশের প্রেক্ষিত বিবেচনা করলে দেখা যাবে, উপকূলের বাসিন্দারা চরম বৈষম্যের শিকার।

অনেক কষ্টে থাকা উপকূলের মানুষের প্রকৃত চেহারাটা শহরের চশমা আঁটা চোখের সামনে খুব একটা আসে না। অনেকে আবার জেনেও না জানার ভান করেন। কিন্তু কোনভাবে ঝড়ের সিগন্যাল বাড়তে থাকলে সবাই যেন হুমড়ি খেয়ে পড়েন উপকূলের দিকে। এই যে কোমেনের ঝাপটার তাড়া খেয়ে উপকূলের মানুষেরা ছুটাছুটি করলো, তাদের ক্ষতিপূরণ কে দেবে? ফসলি মাঠ ডুবে যাওয়া, ঘেরের মাছ ভেসে যাওয়া, বসত ঘরটা বিধ্বস্ত হওয়ার ক্ষতিপূরণ পাবে কী উপকূলের মানুষ ঠিকঠাক মত? ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ তো ঠিকই তৈরি হবে! দরকার হলে পরিমাণটা একটু বাড়িয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু কী লাভ হবে উপকূলবাসীর?

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চল জুড়ে নতুন নতুন সংকট দেখা দিচ্ছে। যে দ্বীপ-চরে আগে অল্প পানি উঠতো, সেগুলো এখন প্রায় ডুবেই যায়। বড় ঝড় তো দূরের কথা, জোয়ারের পানি বাড়লেও বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ে। তখন বহু মানুষকে খোলা আকাশের নিচে ঠাঁই নিতে হয়। ভাঙণ যখন বাড়ির কিনারে ধেয়ে আসে, তখন বাড়িঘর ভেঙে অন্যত্র চলে যেতে হয়। ৫০-৬০ বছরের এক একটা পুরানো বাড়ি বিলীন হয়ে যায়। পারিবারিক বন্ধন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। যুগের পর যুগ একসঙ্গে থাকা দুই ভাইকে আলাদা হয়ে যেতে হয়। ভাঙণ মানুষগুলোকে বাড়িয়ে দেয় সংকট। কাউকে আবার ছুটতে হয় শহরে, কাজের খোঁজে।

এমন অনেক নিরব সংকট মোকাবেলা করেন উপকূলবাসী। তাদের সঙ্গে কাছে গেলে, তাদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, এই সংকট কতটা ভয়াবহ। ধারদেনা করে চলা, মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা নেওয়া, বাড়ির পাশের দোকান থেকে বাকিতে সদায়পাতি নিয়ে দৈনন্দিন রান্নার ব্যবস্থা করে জীবনকে চালিয়ে নেওয়া যে কতটা কঠিন, তা কেবল সংকটে পড়া মানুষেরাই ভালো জানেন। উন্নয়ন হওয়ার কথা, কিন্তু উন্নয়ন হবেনা। অধিকার পাওয়ার কথা, কিন্তু শত চিৎকার করলেও অধিকার মিলবে না। এভাবেই উপকূলের বৃহৎ জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত না পাওয়ার মধ্যেই বেঁচে আছেন। অথচ সব ক্ষেত্রে আইন রয়েছে, সব নাগরিকদের সমান অধিকার পাওয়ার বিধানও আছে। উপকূল যেন এ সবকিছুর বাইরে।

কোমেন সতর্কতা প্রত্যাহারের পর চোখে পড়ল বহু মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে নিজেদের বিপন্ন ডেরায় ফিরছেন। ছবিগুলো দেখে এই প্রশ্নটিই বার বার জেগে উঠছে, আসলে এরা কোথায় ফিরছে? বড় ঝাপটায় তার সামনে ছিল আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার তাগিদ। কিন্তু সারা বছরের বিপন্নতায় তার পাশে কেউ থাকবে না!

//সম্পাদকীয়/০১০৮২০১৫/


এ বিভাগের আরো খবর...
তৃতীয়বারের মত ডিআরইউ অ্যাওয়ার্ড পেলেন রফিকুল ইসলাম মন্টু তৃতীয়বারের মত ডিআরইউ অ্যাওয়ার্ড পেলেন রফিকুল ইসলাম মন্টু
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় ‘সবুজ উপকূল’ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় ‘সবুজ উপকূল’
সবুজ উপকূল, সাগরপাড়ে আলোর হাতছানি সবুজ উপকূল, সাগরপাড়ে আলোর হাতছানি
‘সবুজ উপকূল’ পড়ুয়াদের সৃজনশীল মেধার বিকাশ ঘটাচ্ছে ‘সবুজ উপকূল’ পড়ুয়াদের সৃজনশীল মেধার বিকাশ ঘটাচ্ছে
‘সবুজ উপকূল’-এর পথে হাঁটছে অসংখ্য সবুজযোদ্ধা ‘সবুজ উপকূল’-এর পথে হাঁটছে অসংখ্য সবুজযোদ্ধা
উপকূল বাঁচিয়ে রাখতে ‘সবুজ উপকূল’ মাইলফলক উপকূল বাঁচিয়ে রাখতে ‘সবুজ উপকূল’ মাইলফলক
উপকূলের তরুণদের প্রকাশের আলোয় আনছে ‘সবুজ উপকূল’ উপকূলের তরুণদের প্রকাশের আলোয় আনছে ‘সবুজ উপকূল’
সবুজ উপকূল, জেগে উঠছে আগামী প্রজন্ম সবুজ উপকূল, জেগে উঠছে আগামী প্রজন্ম
লক্ষ্মীপুরে সকল শিক্ষাঙ্গনে লাইব্রেরি গড়ে তোলার দাবি লক্ষ্মীপুরে সকল শিক্ষাঙ্গনে লাইব্রেরি গড়ে তোলার দাবি
আসুন, ১২ নভেম্বর ‘উপকূল দিবস’ পালন করি আসুন, ১২ নভেম্বর ‘উপকূল দিবস’ পালন করি

আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বিপন্ন ডেরায় ফেরা!
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)