উপকূল বাংলাদেশ, এক অদম্য স্বপ্নের গল্প

২০১৪ এর রমজানের ঈদে আমরা যখন কোলাকুলির আনন্দে মত্ত তখন তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন ভোলা মনপুরার প্রত্যন্ত এলাকার হতদরিদ্র পল্লীতে। ব্যস্ত ছিলেন সেইসব মানুষদের বাস্তব জীবনযুদ্ধের খবর সংগ্রহে যাদের অধিকাংশের ঈদের সকাল শুরু হয়েছিলো পঁচে যাওয়া পান্তা খেয়ে, আবার অনেকেই থেকেছেন অভুক্ত সারাদিন।

উপকূল বাংলাদেশ, এক অদম্য স্বপ্নের গল্পএটা ছিলো ২০০৮ এর দিনক্ষণ ভুলে যাওয়া এক বিকেল । ভদ্রলোক অফিসে এসে বললেন “একটি ওয়েবসাইট তৈরী করবেন, যেখানে থাকবে শুধুই উপকূল বিষয়ক সংবাদ”। সিদ্ধান্ত- হলো ওয়েবসাইটের ঠিকানা হবে এমআইসিবি ডটকম। “মিডিয়া ইনিশিয়েটিভ কোষ্টাল বাংলাদেশ” এর আদ্যক্ষরগুলো নিয়ে তৈরী নাম। তিন হাজার পাঁচশত টাকা মূল্যের একটি নান্দনিক ওয়েবসাইট নিয়ে যাত্রা করলো এমআইসিবি। শুরু হলো উপকূল বিষয়ক সংবাদ সংকলণের পদযাত্রা। মাঝে পেরিয়ে গেলো দুটি বছর। যতটা আশা ছিলো বাস্তবে এমআইসিবি তেমন কোন সাফল্য দেখাতে পারলোনা উপকূল সংবাদ সংকলণে ।ভদ্রলোক আবার আসলেন আমাদের ফার্মগেট অফিসে। বললেন “ওয়েবসাইটের নামটি পরিবর্তন করবেন। নতুন নাম হবে “কোষ্টাল বাংলাদেশ ডটকম”। জাতীয় প্রেসক্লাবে যথেষ্ট ঘটা করে অনুষ্ঠিত হলো ওয়েবসাইট উদ্বোধন। একই সাথে যাত্রা শুরু করলো একটি লিমিটেড কোম্পানী “উপকূল বাংলাদেশ লিমিটেড” এবং একটি এনজিও “বাতিঘর”। এতো আয়োজন আর উদ্যম সত্ত্বেও কোথায় যেন ঘাটতি থেকে গেলো। ভদ্রলোক ঘুরে বেড়াচ্ছেন রাজধানীর পথে পথে। সংগ্রহ করছেন রাজধানী আর রাজনীতির খবর। অক্লান্ত লিখে চলছেন সমকালীন তুখোর সব প্রতিবেদন। নিয়মিত তা ছাপাও হচ্ছে নামীদামী ঢাকার দৈনিকে। কিন্তু কোষ্টাল বাংলাদেশ ডটকমে উপকূল সংবাদের খরা লেগেই থাকলো।

বছর দুয়েক বাদে ভদ্রলোক আবার অফিসে হাজির। চেহারায় উদ্যম আর উৎসাহের বদলে শেষ বিকেলের ক্লান্তি। ম্রিয়মান আহত স্বরে জানালেন “কোষ্টাল বাংলাদেশ ডটকম নবায়ন করবেন না। বন্ধ করে দেবেন ওয়েবসাইটটি”। ব্যাটে-বলে মিলছে না ঠিকমতো। উপকূলে ঘুরে ঘুরে পিছিয়ে পড়া জনপদের খবর সংগ্রহে তার স্বতষ্ফূর্ত আগ্রহে সাড়া দিচ্ছেনা কেউই।

একটি ব্যতিক্রমী, উদ্যমী আর জনকল্যাণমূখী স্বেচ্ছাসেবী প্রয়াস অঙ্কুরেই হারিয়ে যাচ্ছে দেখে ক্ষুব্ধ হলাম। উষ্ণ কফির মগে চুমুক দিতে দিতে তৎসম উষ্ণতা নিয়ে বললাম হাল না ছাড়তে। আবার চেষ্টা করতে শুরু করলেন তিনি। খুঁজতে লাগলেন এমন একটি মিডিয়া হাউজ যারা তাকে সুযোগ দেবে শুধুমাত্র উপকূল নিয়ে কাজ করার।

বেশ অনেকদিন পরের কথা। দিনটি রৌদ্রজ্জল নাকি বিষন্ন মেঘলা ছিলো ঠিক মনে নেই। তবে ভদ্রলোক এসেছিলেন যথেষ্ট আনন্দ আর উৎফুল্লতা নিয়ে। জানালেন “বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর রাজি হয়েছে উপকূলে ঘুরে ঘুরে সংবাদ সংগ্রহে তাকে সহযোগিতা করতে”। তারা সাদরে গ্রহণ করেছে তার প্রস্তাবনাকে। সেদিন ভীষন ভালো লেগেছিলো প্রায় অস্তমিত একটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ লাভ করতে দেখে। একটি মহৎ স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহযোগিতার জন্যে বাংলানিউজের দূরদর্শিতাকে সাধুবাদ জানাই।

ভদ্রলোক এখন মাসের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেন উপকূলের প্রত্যন্ত দূর্গম সব অঞ্চলে। ছুঁটে বেড়ান উপকূলের প্রান্তে প্রান্তে। যেখানে আজও পৌঁছেনি নূন্যতম নাগরিক সুবিধার ছিঁটেফোঁটা। যেখানের এক উল্ল্যেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ জীবনে কখনো চোখে দেখেনি নিয়ন সাইনের বর্ণিল ছটা কিংবা আকাশচুম্বী বহুতল ভবন। এটা আমাদের কল্পনার বাইরের কিন্তু প্রচন্ড বাস্তব এক জগত।

তার কল্যাণে আমরা আজ জানতে পারছি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বংশ পরম্পরায় বঞ্চিত হয়ে আসা, যুগ যুগ ধরে ঠকতে থাকা এক অসহায় জনগোষ্ঠীর অবিশ্বাস্য সব উপাখ্যান। সংবাদ সংগ্রহের প্রয়োজনে কখনো তিনি ঘুমান জেলেদের সাথে, কখনো সময় কাটান বেঁদেদের সাথে, কখনো বা সাপের ভয়ে কাটিয়ে দেন নির্ঘূম রাত। কখনো লুঙ্গি পড়ে মালকোচা দিয়ে পারি দিতে হয় হাঁটুজল খাল, কখনো বা বিরান প্রান্তরে কাটফাটা চৌচির রোদে অভূক্ত কাটিয়ে দিতে হয় পুরোটাদিন। কখনো আবার রাতের খাবার শেষে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে ঘুমাতে যেতে হয় নির্জন কোন ডাক বাংলো কিংবা সস্তা কোন হোটেলে। এমন হাজারো কষ্ট তিনি হাসিমুখে বরন করে নেন শুধু উপকূলের কষ্টমাখা মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে। দিনের পর দিন রাতের পর রাত কঠোর পরিশ্রম সত্ত্বেও তার চেহারায় ক্লান্তির কোন ছাপ নেই। উপকূলের মানুষের জন্যে এমন নিখাঁদ ভালোবাসার উদাহরণ দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

২০১৪ এর রমজানের ঈদে আমরা যখন কোলাকুলির আনন্দে মত্ত তখন তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন ভোলা মনপুরার প্রত্যন্ত এলাকার হতদরিদ্র পল্লীতে। ব্যস্ত ছিলেন সেইসব মানুষদের বাস্তব জীবনযুদ্ধের খবর সংগ্রহে যাদের অধিকাংশের ঈদের সকাল শুরু হয়েছিলো পঁচে যাওয়া পান্তা খেয়ে, আবার অনেকেই থেকেছেন অভুক্ত সারাদিন।

রাজধানীর পাঁচতারকা হোটেলে সমৃদ্ধ ডিনার খেতে খেতে উন্নয়নের মুখস্ত পংক্তি আবৃত্তি করে উপকূলের অনাহারী অর্ধভূক্ত মানুষের যন্ত্রনা আর কষ্ট উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এদেশে এমন অজস্র ব্যক্তি রয়েছেন যাদের এক রাতের আনন্দ ভোগের টাকা উপকূলের একাধিক পরিবারের এক মাসের সংসার খরচের থেকেও বেশী। আমাদের মানসিকতার পরির্তন বদলে দিতে পারে এইসব দরিদ্র জনপদের মানুষের ভাগ্য, যা বদলে দেবে দেশের উন্নয়নের গতিপথ। একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ঘটানো সরকার কিংবা ব্যক্তির পক্ষে এককভাবে সম্ভব নয়। প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এক্ষেত্রে বিত্তশালীদের অগ্রগামী হওয়ার কোন বিকল্প নেই।

ভিনদেশের মাটিতে অট্টালিকা বানিয়ে গর্বিত সুখ অনুভব করার পূর্বে আমাদের ভেবে দেখা উচিত কোন দেশই একদিনে সমৃদ্ধ হয়নি। প্রতিটি উন্নত দেশের সমৃদ্ধির পেছনে তাদের বিত্তবান নাগরিকদের সিংহভাগ অবদান রয়েছে। আমাদের বিত্তবানরা যদি অবকাশ যাপনের লক্ষ্যে প্রত্যন্ত উপকূলে একটি করে বাড়ী তৈরী করেন সেক্ষেত্রে অনেকটাই বদলে যেতে পারে উপকূলের চিত্র, যা উপকূলবাসীর ভাগ্য বদলাতে শক্তিশালী নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে।

নাম তার রফিকুল ইসলাম মন্টু। বিলাসী নগর জীবনের লোভ সংবরণ করে ৭১০ কিলোমিটার দুর্গম উপকূল তটরেখা চষে বেড়ানো একজন স্বপ্নাতুর মানুষ। উন্নয়নের স্পর্শহীন অনিশ্চয়তার আঁধারে ঢাকা উপকূলবাসীর জীবনে আলোর ছোঁয়া লাগুক এটাই তাঁর আজীবন লালিত স্বপ্ন। তাকে বলা চলে লাইভ কোষ্টাল এনসাইক্লোপিডিয়া বা চলন্ত উপকূল তথ্যকোষ। উপকূলের প্রতিটি ইঞ্চি তার নখদর্পনে।

উপকূলে জন্ম নেয়া অফুরন্ত প্রানশক্তিতে ভরপুর এই মানুষটির উপকূল নিয়ে কাজ করার অদম্য অপ্রতিরোধ্য স্পৃহা দেখে বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর তার জন্যে চালু করেছে স্বতন্ত্র একটি বিভাগ “উপকূল থেকে উপকূলে“। উপকূল উন্নয়নে রফিকুল ইসলামের অদম্য প্রচেষ্টা আর বাংলানিউজের সক্রিয় পদক্ষেপ অন্যদের জন্যে অনুপ্রেরণার দিপশিখা হোক।

কোষ্টাল বাংলাদেশ ডটকম তথা উপকূল বাংলাদেশ এর ৫ম বছরের শুরুতে উপকূলের জন্যে আত্নোৎসর্গকৃত সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম মন্টু’র জন্যে রইল অনেক অনেক শুভকামনা।

রাশিদুল হাসান
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডটসিলিকন লিমিটেড।
www.dotsilicon.com


এ বিভাগের আরো খবর...
তৃতীয়বারের মত ডিআরইউ অ্যাওয়ার্ড পেলেন রফিকুল ইসলাম মন্টু তৃতীয়বারের মত ডিআরইউ অ্যাওয়ার্ড পেলেন রফিকুল ইসলাম মন্টু
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় ‘সবুজ উপকূল’ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় ‘সবুজ উপকূল’
সবুজ উপকূল, সাগরপাড়ে আলোর হাতছানি সবুজ উপকূল, সাগরপাড়ে আলোর হাতছানি
‘সবুজ উপকূল’ পড়ুয়াদের সৃজনশীল মেধার বিকাশ ঘটাচ্ছে ‘সবুজ উপকূল’ পড়ুয়াদের সৃজনশীল মেধার বিকাশ ঘটাচ্ছে
‘সবুজ উপকূল’-এর পথে হাঁটছে অসংখ্য সবুজযোদ্ধা ‘সবুজ উপকূল’-এর পথে হাঁটছে অসংখ্য সবুজযোদ্ধা
উপকূল বাঁচিয়ে রাখতে ‘সবুজ উপকূল’ মাইলফলক উপকূল বাঁচিয়ে রাখতে ‘সবুজ উপকূল’ মাইলফলক
উপকূলের তরুণদের প্রকাশের আলোয় আনছে ‘সবুজ উপকূল’ উপকূলের তরুণদের প্রকাশের আলোয় আনছে ‘সবুজ উপকূল’
সবুজ উপকূল, জেগে উঠছে আগামী প্রজন্ম সবুজ উপকূল, জেগে উঠছে আগামী প্রজন্ম
লক্ষ্মীপুরে সকল শিক্ষাঙ্গনে লাইব্রেরি গড়ে তোলার দাবি লক্ষ্মীপুরে সকল শিক্ষাঙ্গনে লাইব্রেরি গড়ে তোলার দাবি
আসুন, ১২ নভেম্বর ‘উপকূল দিবস’ পালন করি আসুন, ১২ নভেম্বর ‘উপকূল দিবস’ পালন করি

উপকূল বাংলাদেশ, এক অদম্য স্বপ্নের গল্প
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)