আইলা-বিধ্বস্ত অঞ্চলে পানীয় জলের কষ্ট, ‘সরকারের সদিচ্ছার অভাব’!

ila4.jpgপ্রতিবেদন উপকূল বাংলাদেশ, ঢাকা Θ দীর্ঘ ৫ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও আইলা দুর্গত এলাকায়  তীব্র পানি সংকট বিদ্যমান থাকার পেছনে সরকারের সদিচ্ছার অভাবকে অন্যতম কারণ বলে অভিমত দিয়েছেন আলোচকরা। তারা উপকূলীয় অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করতে তাই সরকারকে অনতিবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণে আহবান জানান।

আইলার পাঁচ বছর উপলক্ষে বিপন্ন  জনগোষ্ঠীর নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর এর প্রভাব নিয়ে রোববার (২৫ মে) ঢাকায় অনুষ্ঠিত সংলাপে তারা এনব কথা বলেন। জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কনফারেন্স কক্ষে এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেল্থ  ও বাংলাদেশ সেন্টার ফর এ্যাডভ্যান্সড স্টাডিজ-এর যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে।

২০০৯ সালের ২৫ মে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে হানা দিয়েছিল ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আইলা। এতে ওই অঞ্চলের মানুষ ব্যাপক ক্ষতির মুখোমুখি হয়।

সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এবং মহাপরিচালক জনাব জুয়েনা আজিজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন  স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ-এর ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এম. ফিরোজ আহমেদ; জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর-এর প্রধান প্রকৌশলী  ইঞ্জিনিয়ার মো. নুরুজ্জামান এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়-এর ডেপুটি সেক্রেটারি জনাব সৈয়দ মো: তাজুল ইসলাম। সংলাপে আইলা দুর্গত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি উপস্থাপন করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী। সংলাপে সভাপতিত্ব করেন ড. এ. আতিক রহমান, নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর এ্যাডভান্সড স্টাডিজ।

সংলাপে বক্তারা বলেন, ঘূর্ণিঝড় আইলার রেশ দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের ক্ষতিগ্রস্ত ১১টি উপকূলীয় জেলার ৬৪টি উপজেলার প্রায় ৪০ লাখ দরিদ্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় অংশ বয়ে চলেছে। পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও ভু-প্রাকৃতিক, মানবসৃষ্ট কারণ ও সরকারের  সদিচ্ছার অভাবে এ অঞ্চলে পানি ও স্যানিটেশন সেবা নিশ্চিত করা যায়নি। এ অঞ্চলের মাটিতে বর্তমানে লবণাক্ততার পরিমাণ ৭.৬-১৫.৯ পিপিটি অথচ মাটির সহনীয় মাত্রা ০.৪-১.৮ পিপিটি।

অন্যদিকে আইলা পূর্ববর্তী বছর ২০০৮-এ এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল ৩,১১২ মিলিমিটার যা ক্রমান্বয়ে কমে ২০১২ সালে এসে দাঁড়ায় ২,৭৬৯ মিলিমিটারে। এবছরও এখনো এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুব কম। একই সাথে গরমের তীব্রতা প্রতিবছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে। লবণাক্ততার কারণে গাছপালার পরিমাণও আশংকাজনকভাবে কমে যাচ্ছে, বর্তমানে এ অঞ্চলে বৃক্ষের হার মাত্র ৯%। পুকুরে লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে মাছসহ সকল জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে।

বক্তারা বলেন, সরকারের সদিচ্ছার অভাবে সমস্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। আইলায় ভেঙ্গে যাওয়া অনেক বেড়ি বাঁধ এখনো মেরামত করা হয়নি, খাল আটকে রেখে লোনা পানি জমিতে ঢুকিয়ে চিংড়ি চাষ করা যাবে না এ সংক্রান্ত আইন রয়েছে কিন্তু তার কোন বাস্তবায়নে নেই, কপোতাক্ষসহ বিভিন্ন নদীর পানি আটকে রেখে অবাধে জমিতে লবণ পানি ঢোকানো হচ্ছে। বৃক্ষায়নের নামে বাঁধের পাশে এলাকা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর গাছ রোপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে একটি করে সুপেয় পানির পুকুর সংরক্ষিত রাখার বিধান থাকলেও বাস্তবে এ লক্ষ্যে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

বক্তারা আরও বলেন, সরকারি পর্যায় থেকে আইলা উপদ্রত অঞ্চলের পানীয় জলের সংকট মোকাবিলায় দেয়া হয়নি কোন বিশেষ বরাদ্দ। ফলে বাণিজ্যিকভাবে চিংড়ি চাষের জন্য পুনর্নির্মিত বাঁধের অসংখ্য স্থান কাঁটা  এবং অবৈধ স্লুইস  গেট নির্মাণ করা হচ্ছে । সামান্য বন্যায়ও বাঁধ ভেঙ্গে গ্রামের পর গ্রাম পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। ফলাফলস্বরূপ এ এলাকায় বিভিন্ন পানি প্রযুক্তি টেকসই হচ্ছে না। জমির উর্বরতা কমছে। এর সাথে সংযুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। সামগ্রিকভাবে এ অঞ্চলগুলোতে এখনো তীব্র খাবার পানি-সংকট বিরাজ করছে। সুপেয় পানির জন্য এ অঞ্চলের ব্যয় ঢাকার তুলনায় প্রায় ৩০০ গুণ বেশি।

ফলে মানুষ লবণাক্ত পানি ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যপরিচর্যার উপরও। সার্বিকভাবে বাড়ছে পুষ্টিহীনতার হার। ২০০৯ সালে আইলা পরবর্তী সময়ে প্রায় ৪,৫০০০ জন মানুষ আশেপাশের শহরে চলে গেছেন। দূরের শহরে অভিবাসন করেছেন প্রায় ১,৫০০০ জন। আইলা দূর্গত অঞ্চল থেকে শহরাঞ্চলে অভিবাসন এখনো অব্যাহত আছে। পুরুষরা অধিকমাত্রায় অভিবাসন করায় নারী প্রধান পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। নারীরা সংসার চালাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত বহুবিধ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন ।

সংলাপে অতিথিরা পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ পরামর্শ প্রদান করেন যে, দুর্যোগকালীন সময়ে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন  সরবরাহের ব্যবস্থাসহ অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে; সরকারি নীতি অনুযায়ি প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য একটি করে পানীয় জলের জন্য পুকুর সংক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করতে হবে; স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সনাতনী জ্ঞানকে উন্নয়ন কাজে অর্ন্তভুক্ত করতে হবে; লবণ পানিতে চিংড়ি চাষের সম্প্রসারন বন্ধ করে অনতিবিলম্বে এর জন্য এলাকা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে; সরকারি খাল চিংড়ি চাষ বা অন্য কোন কারণে আটকে রাখা যাবে না; লবণসহনশীল কৃষির সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে; স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে দুর্যোগকালীন সময়ে আত্মরক্ষা ও উদ্ধার তৎপরতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে; উপকূলীয় অঞ্চলে কার্যকরী ঘূর্ণিঝড় পূর্বাভাস ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে; নিরাপদ পানির প্রয়োজনীয়তা, পানি সম্পদের উপর দ্রত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইত্যাদি বিষয়ে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে; আইলা উপদ্রত এলাকায় সরকারি, বেসরকারিসহ ব্যক্তি পর্যায় পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে; বর্তমান স্থানীয় বাস্তবতাকে বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে নিরাপদ পানি, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য পরিচর্যা সংকট মোকাবিলায় এবং এলাকা-উপযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বৃহৎ গবেষণা উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে; এবং সর্বোপরি আইলা উপদ্রত উপকূলীয় অঞ্চলের পানীয় জল ও স্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলাকে রাজনৈতিক অঙ্গিকার হিসেবে নিয়ে এই অঞ্চলে কাজ করার জন্য বিশেষ কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে এবং অতি দ্রত জাতীয় কৌশলপত্র বাংলাদেশের দুর্গম এলাকায় পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ২০১২-এর অতিদ্রত বাস্তবায়নসহ সংষিøষ্ট অন্যান্য কৌশল, আইন ও নীতিমালাসমূহ বাস্তবায়ন করতে হবে।

এছাড়াও সংলাপে স্থানীয় বাস্তবতা এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সংকট পরিস্থিতি তুলে ধরেন আইলা দূর্গত এলাকা থেকে আগত বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিবৃন্দ। তারা ভেঙ্গে যাওয়া বাঁধ উচু করে নির্মাণ, যথাযথভাবে স্লুইস গেট স্থাপন ও টেকসইভাবে সংরক্ষণ; পুকুরসহ সুপেয় পানির উৎসগুলো পুনঃখনন; অনতিবিলম্বে নদী ও খাল খনন; প্রতিটি পরিবারের জন্য রেইন ওয়াটার হর্ভেস্টিং সিস্টেম স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি তুলে ধরেন এবং সরকারকে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির দাবি জানিয়ে দুর্নীতি রোধের লক্ষ্যে সকল উন্নয়ন কার্যক্রমে সুশীল সমাজকে অন্তর্ভুক্ত করার আহবান জানান।

সূচনা বক্তব্যে এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেল্থ-এর নির্বাহী পরিচালক জনাব এস,এম,এ, রশীদ জাতীয় বাজেট, জলবায়ু ফান্ডসহ সরকারি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ফান্ড থেকে বরাদ্দ লাভ এবং সেই বরাদ্দের যথাযোগ্য ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি বলে মন্তব্য করেন।

//প্রতিবেদন/উপকূল বাংলাদেশ/ঢাকা/২৫০৫২০১৪//


এ বিভাগের আরো খবর...
তৃতীয়বারের মত ডিআরইউ অ্যাওয়ার্ড পেলেন রফিকুল ইসলাম মন্টু তৃতীয়বারের মত ডিআরইউ অ্যাওয়ার্ড পেলেন রফিকুল ইসলাম মন্টু
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় ‘সবুজ উপকূল’ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় ‘সবুজ উপকূল’
সবুজ উপকূল, সাগরপাড়ে আলোর হাতছানি সবুজ উপকূল, সাগরপাড়ে আলোর হাতছানি
‘সবুজ উপকূল’ পড়ুয়াদের সৃজনশীল মেধার বিকাশ ঘটাচ্ছে ‘সবুজ উপকূল’ পড়ুয়াদের সৃজনশীল মেধার বিকাশ ঘটাচ্ছে
‘সবুজ উপকূল’-এর পথে হাঁটছে অসংখ্য সবুজযোদ্ধা ‘সবুজ উপকূল’-এর পথে হাঁটছে অসংখ্য সবুজযোদ্ধা
উপকূল বাঁচিয়ে রাখতে ‘সবুজ উপকূল’ মাইলফলক উপকূল বাঁচিয়ে রাখতে ‘সবুজ উপকূল’ মাইলফলক
উপকূলের তরুণদের প্রকাশের আলোয় আনছে ‘সবুজ উপকূল’ উপকূলের তরুণদের প্রকাশের আলোয় আনছে ‘সবুজ উপকূল’
সবুজ উপকূল, জেগে উঠছে আগামী প্রজন্ম সবুজ উপকূল, জেগে উঠছে আগামী প্রজন্ম
লক্ষ্মীপুরে সকল শিক্ষাঙ্গনে লাইব্রেরি গড়ে তোলার দাবি লক্ষ্মীপুরে সকল শিক্ষাঙ্গনে লাইব্রেরি গড়ে তোলার দাবি
আসুন, ১২ নভেম্বর ‘উপকূল দিবস’ পালন করি আসুন, ১২ নভেম্বর ‘উপকূল দিবস’ পালন করি

আইলা-বিধ্বস্ত অঞ্চলে পানীয় জলের কষ্ট, ‘সরকারের সদিচ্ছার অভাব’!
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)