উপকূল সাংবাদিকতা সহায়কপত্র-৪ : পূর্ব-উপকূলে সাংবাদিকতায় যে বিষয়গুলো মনে রাখা জরুরি

স্টোরি কভার চিত্র

রফিকুল ইসলাম মন্টু

পূর্ব উপকূলের শাহপরীর দ্বীপে যারা গিয়েছেন, তারা খুব ভালো করেই জানেন দ্বীপটি কীভাবে ক্ষয়ে যাচ্ছে। ভঙ্গুর এই দ্বীপকে আমরা সেভাবে তুলে ধরতে পারিনি। এক সময় মানব পাচারের কারণে আর এখন রোহিঙ্গাদের খবর নিতে শাহপরীর দ্বীপে বহু সাংবাদিকের আসা যাওয়া আছে। দ্বীপটি ঘুরে দেখার সুযোগ হলে চোখে পড়বে সেখানকার আসল চিত্র। শাহপরীর দ্বীপে পা রেখে আমরা অন্য খবর সংগ্রহে যাচ্ছি; কিন্তু দ্বীপের না বলা কথাগুলো পায়ের তলায়ই চাপা পড়ে থাকছে। অথচ এক শাহপরীর দ্বীপকে ভালোভাবে তুলে ধরতে পারলেই বাংলাদেশের উপকূলে জলবায়ু পরিবর্তনের ছবিটি স্পষ্ট করা যায়। এমন আরও অনেক রিপোর্টিং ইস্যু রয়েছে বাংলাদেশের উপকূলের পূর্বভাগে।

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় পূর্ব উপকূলের সাংবাদিকতার ইস্যু। বিষয়ে আসার আগে পূর্ব-উপকূলের ব্যাখ্যাটা করে নেওয়া ভালো। মেঘনার পূর্বপাড় থেকেই আসলে পূর্ব উপকূলের শুরু। ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যের দিক থেকে এ এলাকার বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। উপকূলের ঝূঁকিপূর্ন ১৬ জেলার মধ্যে ৬টি জেলা পূর্ব-উপকূলের মধ্যে পড়ে। জেলাগুলো হচ্ছে: কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর। এই মুহূর্তে আপনার কল্পনায় বাংলাদেশের মানচিত্রটি ভেসে উঠলে পূর্ব-উপকূলের সীমানা সহজেই অনুমান করতে পারেন। মধ্য ও পশ্চিম উপকূল থেকে পূর্ব-উপকূলের বৈশিষ্ট্য বিভিন্নভাবে আলাদা করা যায়। উপক‚লীয় এলাকা হিসাবে কিছু বিষয় এক থাকলেও বিশেষ বিশেষ অনেক বৈশিষ্ট্য রয়েছে পূর্ব উপকূলে। সাংবাদিকতার ইস্যু নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ভিন্ন অনেক বিষয় পাওয়া যায় পূর্ব উপকূলে।

চোখ রাখি কক্সবাজারে

যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম- শাহপরীর দ্বীপের কথায় আবার আসি। আমি যখন প্রথমবার এই দ্বীপে যাই, তখন নাফ তীরের জেলেপল্লীর প্রতিবেদন করেছিলাম। লবণ চাষ, বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিয়ে প্রতিবেদন করেছিলাম। তখন এই দ্বীপে অচেনা লোকজনের যাতায়াত ছিল ঝুঁকিপূর্ন। অচেনা লোকজনকে অর্থের বিনিময়ে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনা ঘটতো। এমনকি মস্তিস্ক বিকৃত ব্যক্তিদের গোসল করিয়ে, ভালো কাপড় পড়িয়ে পাচারকারীদের নৌকায় তুলে দেওয়া ঘটনাও শুনেছি। শাহপরীর দ্বীপে কিংবা টেকনাফের সৈকতে বেশিক্ষণ অবস্থানও নিরাপদ ছিল না। এই এলাকায় ইয়াবার চালান আসার ঘটনা তখনও ছিল। এখন আবার যোগ হয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যু। কিন্তু আলোচিত এই ইস্যুর অন্তরালে দ্বীপের মানুষের আসল খবরগুলো কিন্তু ঢাকা পড়ে যায়। শাহপরীর দ্বীপে প্রবেশ পথের সড়কের হাল যদি কেউ দেখেন, অবাক হবেন। মানুষ এ পথ দিয়ে কীভাবে যাতায়াত করে। দ্বীপের বহু মানুষ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ধাক্কা লেগেছে এখানে। বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব দিয়ে খবর হয়ে আসতে পারে সংবাদ মাধ্যমে।

পূর্ব-উপকূলের মানব পাচার ইস্যু মোটামুটি বিলুপ্ত হয়ে গিয়ে চাঙ্গা হয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যু। এ ইস্যুটি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচিত। কিন্তু এই আলোচিত বিষয়টির দিকেই আমরা বেশি নজর রাখছি। এর অন্তরালে আরও অনেক ইস্যু চাপা পড়ে যাচ্ছে। প্রথমদিকে মানবিক কারণে নিজ বাড়িতেই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন টেকনাফ-উখিয়ার বহু বাসিন্দা। ওই এলাকার বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি- তারা আসলে শেষ পর্যন্ত অনেক সমস্যার মোকাবেলা করছেন। টেনাফের সাবরাং উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমাকে বলছিলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয় জনজীবনে যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে, সেটা তেমন খবরে আসছে না। বনায়নের ক্ষতি, পরিবেশের ক্ষতির দিকগুলো নিয়ে প্রতিবেদন করার অনৈক সুযোগ আছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আইইউসিএন-এর একটি প্রেজেন্টেশন দেখছিলাম। এতে বলা হয়েছে টেকনাফ-উখিয়া এলাকার হাতিগুলো নিরাপদে চলাচল করতে পারছে না রোহিঙ্গা আবাসনের কারণে। ঠিক একই ভাবে বনের জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে- তা বলার আপেক্ষা রাখে না। এসব ভাবনা থেকে আরও প্রতিবেদন আইডিয়া বের করা সম্ভব।

আমাদের সকলেরই জানা আছে, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সমুদ্র সৈকত পূর্ব-উপকূলে, কক্সবাজারে। একে ঘিরে প্রতিনিয়ত চলমান ঘটনার অনেক খবরই আমরা দেখি সংবাদ মাধ্যমে। যে কোন সংবাদ মাধ্যমের হয়ে কক্সবাজারে কাজ করা মানে সকাল-সন্ধ্যা বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। অনেকগুলো খবর পাঠাতে হয়। চলমান ঘটনা তো রুটিন কাজ। কিন্তু বিশেষ খবর আসে ক’টা? একেবারেই হাতে গোনা। আবার সমুদ্র সৈকত কেন্দ্রিক খবরের বাইরেও সমুদ্র লাগোয়া এই শহরে রয়েছে অনেক খবর। বাঁকখালী মরে গেল প্রায়। মৎস্য অবতরণকেন্দ্র শেষ হতে চলেছে। কক্সবাজার-মহেশখালী ঘাট নিয়ে কত ধরণের বাণিজ্য! কে খবর রাখে! নাজিরের টেকের নিকটে আছে কুতুবদিয়া পাড়া। মানে কুতুবদিয়া থেকে নি:স্ব হয়ে যারা এই শহরে এসে আশ্রয় নিয়েছে, তারা এক স্থানে সংঘবদ্ধ হয়ে বসবাস করছে বলে এলাকাটির নাম কুতুবদিয়া পাড়া। এমন পাড়া আরও আছে এই শহরে। খবর হতে পারে এসব বিষয়ে। শুধু সংকটের কথা বলি কেন- এই জেলায় যেসব সম্ভাবনার ক্ষেত্র আছে, তা কতটা বিকশিত হতে পারছে। এই যেমন ধরুন নাজিরের টেক শুটকি পল্লী। মৌসুমে হাজার হাজার মানুষ এখানে কাজ করে। মহেশখালীর সোনাদিয়ায়ও শুটকি উৎপাদন হয়। আমরা কয়টা খবর লিখি, লিখতে পারছি। কক্সবাজার এবং চট্টগ্রামের কিছু অংশে রয়েছে লবণ চাষের ক্ষেত্র। এসবের ওপর কিছু সাদামাটা, গতানুগতিক খবরই আমরা দেখতে পাই।

কক্সবাজারে রয়েছে কয়েকটি দ্বীপ। এরমধ্যে দু’টি দ্বীপ উপজেলা। এরমধ্যে আবার একটি দেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ। সমুদ্র ঘেঁষা নয়নাভিরাম দু’টো দ্বীপে যেতে ভ্রমণ পিপাসুরা ব্যাকুল থাকেন। সকলেই বুঝতে পারছেন আমি কোন এলাকার কথা বলতে চাই। দেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী তো এখন উন্নয়নের ভারে জর্জরিত। সকল উন্নয়ন কর্মকান্ডই যেন এখানে। এরফলে বহু মানুষ কাজ হারাবে এলাকার থেকে। একবার মাতারবাড়ির গ্রামে কয়েক দিন অবস্থান করে জানতে পেরেছি- মানুষগুলোর সংকটের শেষ নেই। অনেক মানুষ এলাকা থেকে অন্যত্র চলে গেছে। কী চমৎকার সোনাদিয়া দ্বীপ। যেন প্রকৃতির এক অপরূপ নিদর্শন। উন্নয়নের কারণে এগুলো রক্ষা হচ্ছে না। এ জেলার অপরূপ সৌন্দর্য্যরে আরেক স্থান সেন্টমার্টিনও রক্ষা করা যাচ্ছে না। এইসব বিষয়ে প্রতিবেদন লেখার য়েছে অনেক বিষয়। এ জেলার কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, কুতুবদিয়া, উখিয়া, মহেশখালী, রামু, টেকনাফ- সবগুলো উপজেলাকেই উন্মুক্ত উপক‚লীয় এলাকা হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

চট্টগ্রামে কী ইস্যু রয়েছে

চট্টগ্রামের দিকে চোখ ফেরালেও উপক‚লীয় অনেক বিষয় চোখে পড়ে। এ জলার আনোয়ারা, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম বন্দর, ডালমুরিং মিরসরাই, পাহাড়তলী, পাঁচশাইল, সন্দ্বীপ, সীতাকুন্ড, পতেঙ্গা, হালিশহর, কেতোয়ালী এবং বায়েজীদ বোস্তামী এলাকা উন্মুক্ত উপক‚লীয় এলাকা হিসাবে বিবেচিত। এলাকাগুলোর দিকে চোখ রেখে কল্পনায় মানচিত্র যোগ করলে খুব সহজেই বিষয়গুলো বুঝতে পারি। বাঁশখালীর খানখানাবাদ, ছনুয়া এলাকায় যারা গিয়েছেন- তারা বুঝতে পারেন সেখানকার জনজীবনের সংকট। ছনুয়া থেকে ওপারে কুতুবদিয়ার শেষ মাথা। তারপর ধূ ধূ সমুদ্র। খানখানাবাদ সবসময় থাকে ঝুঁকিতে। ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর ধাক্কায় খান খান হয়ে গিয়েছিল এই খানখানাবাদ। বাঁধ ভেঙে লবণ পানিতে ভেসেছিল গ্রামের পর গ্রাম। কী বিবর্ণ চেহারা। কয়েক বছর ছিল বাঁধহীন। জীবনজীবনে যে ধাক্কা দিয়ে গেছে রোয়ানু- তা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। আনোয়ারা সমুদ্র তীরে রয়েছে বৃহৎ পর্যটন সম্ভাবনা। এগুলো নিয়ে খবর কী হচ্ছে তেমনটা? নি:ন্দেহে নজর ফেলা উচিত।

চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ঘুরে গেলে পাওয়া যাবে অনেক খবরের বিষয়। বাঁধের উপর বসতি। জলদাস সম্প্রদায়ের জীবন। আবার আছে অপরিকল্পিত উন্নয়ন। বাঁধ কেটে বাড়িঘর হয়েছে, কলকারখানায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বাঁধের। পতেঙ্গা থেকে সীতাকুন্ডের দিকে এলে আর প্রতিবেদন লেখার বিষয় ধরিয়ে দিতে হবে না। সীতাকুন্ডের কুমিরায় যারা গিয়েছেন, তারা জানেন এখানে বিশাল এক জলদাস পাড়া রয়েছে। অন্তত ৫০০ পরিবার রয়েছে। তবে অধিকাংশই আছে অন্যের জমিতে। মাছ ধরাই যে মানুষগুলোর জীবিকার একমাত্র অবলম্বন, সেখানে তাদের মাছ ধরার পথই বন্ধ হয়ে গেছে। একমাত্র কারণ পরিবেশ বিধ্বংসী জাহাজ কাটা শিল্প। সমুদ্রে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। গাছপালা মরে যাচ্ছে। পানি নষ্ট হয়ে গেছে। মাছ পেতে হলে জেলেদের এখন যেতে হয় সমুদ্রের অনেক দূরে। আর সেখানে গিয়ে তারা পড়েন জলদস্যুদের বদলে। এসব নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে খবর হতে পারে।

সন্দ্বীপ থেকে স্টিমারে চট্টগ্রাম গেছেন? আমি গেছি। আমার ফটোফোল্টারে একটা ছবি আছে- রহমতপুরের স্টিমার ঘাটের জেটিতে সারিবদ্ধ মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। অপেক্ষা স্টিমারের। হাতিয়া থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী স্টিমারটি সন্দ্বীপের যাত্রী নিয়ে যাবে। কিন্তু স্টিমার ঘাটে ভিড়তে পারবে না। নোঙ্গর করবে অনেক দূরে। জেটি থেকে যাত্রী নেওয়া হবে নৌকায় করে। স্টিমার ঘাটে আসতে পারছে না, কারণ পলি। এখন আর হাতিয়া থেকে চট্টগ্রামগামী স্টিমার সমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়েও স›দ্বীপের যাত্রী নিতে পারে না। যে সন্দ্বীপ ভেঙে এতটুকু হয়ে গিয়েছিল, সে সন্দ্বীপ আবার বড় হচ্ছে। ঠিক একই অবস্থা দেখা যায় উড়িরচর হয়ে নোয়াখালীর সঙ্গে সন্দ্বীপের যোগাযোগের ক্ষেত্রে। নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চরলক্ষ্মী থেকে সন্দ্বীপের কালাপানিয়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা ছোট্ট ট্রলারও খুব সাবধানে এটুকু পথ পাড়ি দেয়। কারণ পলি জমেছে। এগুলো সম্ভাবনার ইস্যু। এর সঙ্গে আবার আছে নেতিবাচক খবর। এগুলো ভেবে প্রতিবেদন ইস্যু বের করা যেতে পারে।

উড়িরচরের নাম আমাদের প্রায় সকলেরই জানা। এই দ্বীপের জাসু সরদারের নাম শুনেছেন? ভয়ংকর এক মানুষ। তার নিয়ন্ত্রণেই ছিল উড়িরচর। না, ভয় পানে না। এখন নেই জাসু সরদার। মারা পড়েছে র‌্যাবের হাতে। তার সেকেন্ড ইন কমান্ড ইব্রাহিমসহ আরও অনেক দস্যু এখন আর নেই। একবার নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জের চর এলাহী ইউনিয়নের ক্লোজার ঘাট দিয়ে উড়িরচর পার হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। পারিনি। কারণ দস্যুদের ভয়। সাধারণ অপরিচিত মানুষ তো দূরের কথা পুলিশও সেসময় দস্যুদের ভয় করতো। আমি ফিরে আসি। এপারের বেড়িবাঁধে হেঁটে ধূ ধূ উড়িরচর দেখে সেবারের মত শান্তনা নেই। কিন্তু দস্যুগুলো মারা পড়ার পর উড়িরচরে কয়েকদিন অবস্থান করে সেখানকার সার্বিক অবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন লিখি। পালকির যুগ এখনও টিকে আছে উড়িরচরে। ১৯৮৫ সালের ২৪ মে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল উড়িরচর। অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানগণ এসেছিলেন এ দ্বীপে। প্রতিবেদন লেখার অনেক বিষয় রয়েছে এখানে।

ফেনীর দিকে তাকাই

উপকূলীয় জেলা হিসাবে ধরা হয় ফেনীকেও। এ জেলার সোনাগাজী উপজেলাটি সমুদ্র লাগোয়া। সে হিসাবে এই উপজেলাটি উন্মুক্ত উপকূল হিসাবে বিবেচিত। সোনাগাজীর দক্ষিণ সীমানায় চরচান্দিয়ার বেড়িবাঁধের দাঁড়ালে ফেনী জেলা সদরে বসবাসকারী যে কোন সাংবাদিক ক্ষণিকের জন্য ভুলে যাবেন বড় শহরের কথা। ইচ্ছে করবে একটি ভালো ছবি তুলি, একটি ব্যতিক্রমী প্রতিবেদন লিখি। চরচান্দিয়ার বাঁধ ঘেঁষে আছে কিছু জলদাস পরিবার। এই পাড়ায় ঢুকলে যে কেউ অবাক হবেন। এমনও জীবন! কীভাবে বেঁচে আছেন এরা! সমুদ্র তীরবর্তী এই এলাকার মানুষ সর্বক্ষণ দুর্যোগের ভয় নিয়ে টিকে থাকে। নাজুক বাঁধ, নেই পর্যাপ্ত ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র। জীবিকার জন্য নিজের ভিটেয় থাকতে হয় ভয় হলেও। অন্যত্র যাওয়ার কোন উপায় নেই। মাতামুহরী বৃহৎ সেচ প্রকল্প রয়েছে এই সোনাগাজীতে। সব সংকট নয়, অনেক সম্ভাবনার খবরও এখানে রয়েছে। ছোট ফেনী নদীর ওপর যে ক্লোজার নির্মিত হয়েছে অনেক চেষ্টার পর, সেটি এখন সম্ভাবনা বিকাশের কেন্দ্রে। ক্লোজার নির্মানের আগে যেখানে ভয়াল স্রোত বইতে দেখেছি, সেখানে এখন উর্বর ভূমি। পর্যটনের দুয়ার খুলে দিয়েছে এ ক্লোজার। ফেনীর সোনাগাজী ও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের সীমানায় জেগে থাকা এ ক্লোজার আশা জাগাচ্ছে মানুষের মনে। এসব নিয়ে হতে পারে নানামূখী প্রতিবেদন।

নজর যখন নোয়াখালী

নোয়াখালীর উপজেলাগুলোর মধ্যে হাতিয়া, কোম্পানীগঞ্জ, সুবর্ণচর এবং নোয়াখালী সদরকে উন্মুক্ত উপক‚ল হিসাবেই ধরা হয়। কোম্পানীগঞ্জের মুছাপুর, চর এলাহীর মত অনেক এলাকা অত্যন্ত দুর্গম। ছোট ফেনী নদীতে ক্লোজার নির্মানের আগে মুছাপুরের দুর্গম জনপদে ছিল দস্যুদের আস্তানা। সাধারণ মানুষ ছিল ভীত সন্ত্রস্ত। এখন যদিও সেসব ভয় নেই। যোগোযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটায় দস্যুদের তৎপরতা কমে গেছে। স্বাভাবিক জীবনে ফেরা বেশ কয়েকজন দস্যুদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তাদের জীবন নিয়ে আমি প্রতিবেদন লিখেছি। তারা কেমন আছে? এখনও প্রতিবেদন করা যেতে পারে। কোম্পানীগঞ্জে কিছু জলদাস পরিবার পেয়েছি, যাদের অবস্থা কিছুটা উন্নত। কীভাবে তারা এগোলো? প্রতিবেদন হতে পারে। এইসব প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষেরা কীভাবে বেঁচে আছে- প্রতিবেদন হতে পারে। সুবর্ণচর নোয়াখালীর সম্ভাবনাময় এক জনপদ। ধান আবাদের জন্য বিখ্যাত। ধানের মৌসুমে বিভিন্ন এলাকা থেকে মজুর আসে সুবর্ণচরে। ধান কেটে রোজগার করে তারা আবার ফিরে যায়। ধানের মৌসুমে বিকেলের দিকে বিভিন্ন হাট ঘুরে আমি কর্মজীবীদের দেখা পেয়েছি। মজুরি ঠিক হয় হাটে। রাতে মালিকের বাড়ি চলে যায়। সকালে শুরু হয় ধান কাটা। এ এক অন্যরকম দৃশ্যপট। শুধু ধান আবাদ নয়, কৃষি নিয়ে সুবর্ণচরে অনেক প্রতিবেদন লেখা যায়। আছে প্রভাবশালীদের দাপট, খাসজমি দখল। মাছ চাষ, নদীর ভাঙন, নতুন চর- ইত্যাদি নানান বিষয়। এসব নিয়ে অনেক প্রতিবেদন করার সুযোগ রয়েছে।

নোয়াখালীর একমাত্র দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া খবরের আরেক কারখানা। সুবর্ণচর থেকে সোজা দক্ষিণে চেয়ারম্যান ঘাট পার হয়ে যেতে হয় হাতিয়ার নলচিরা। সেখান থেকে চান্দের গাড়িতে ওছখালি, হাতিয়ার প্রাণকেন্দ্র। এ রুট আমাদের সকলেরই জানা। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে এখানে খবরের বিষয় কী? কোনটি বিষয় নয় বলুন! এই যে চেয়ারম্যান ঘাট থেকে নলচিরা পারাপার এখানেও রয়েছে বিরাট খবরের ইস্যু। অনেক খবরের তালিকা। এই ঘাট সব সময়ই প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। অর্থ রোজগার প্রভাবশালীদের, আর ভোগান্তিটা শুধু যাত্রীদের। হাতিয়ায় নদী ভাঙণের সমস্যা প্রকট হলেও সংবাদ মাধ্যমে সেভাবে প্রতিবেদন আসে না। নলচিরা ঘাটে নেমে পিচঢালা পথ ধরে ওছখালি না গিয়ে আপনি যদি নদীর তীর ধরে সুখচরের দিকে যান, খুব সহজেই বুঝবেন। আরও সামনে চেয়ারম্যান বাজার কিংবা তমরুদ্দিন ঘাট পর্যন্ত গেলে বোঝার আর কিছুই বাকি থাকবে না। হাতিয়ার দক্ষিণ অংশে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনার চর। এগুলো নিয়ে যেসব প্রতিবেদন হয়েছে, আরও হওয়া উচিত।

লক্ষ্মীপুরে কী দেখি

লক্ষ্মীপুরেও সমস্যা ও সম্ভাবনা দুটোই রয়েছে। এ জেলার রামগতি ও কমলনগর উপজেলাকে উন্মুক্ত উপজেলা হিসাবে বিবেচনা হয়। এ এলাকার এক নম্বর সমস্যা কাউকে জিজ্ঞেস করলে এক কথায় নদীভাঙণ। একশ জনের একশ জন একই জবাব দিবেন। অনেক আবেদন নিবেদনের পর রামগতির সামান্য কিছু এলাকায় ব্লক ফেলে বেড়িবাঁধ করা হলেও দুই উপজেলার একটি বড় অংশই এখনও অরক্ষিত। কমলনগর উপজেলাটি দেশে বিদেশে ভাঙণ এলাকা হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে সংবাদ মাধ্যমের কারণেই। লক্ষ্মীপুর জেলা সদর থেকে যে সড়কটি রামগতি গেছে, এটির পশ্চিমে এক সময় প্রায় ২৯ কিলোমিটার দূরে ছিল মেঘনা নদী। এখন মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে। এ থেকেই অনুমান করা যায়- কতটা ভঙ্গুর জনপদ কমলনগর। বহু মানুষ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। আমার সঙ্গে এমন অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে, যারা এক সময় সচ্ছল ছিল। ভাঙণের কারণে সব হারিয়েছে। বর্ষার আগে এই এলাকা হাঁটলে চোখে পড়বে ঘরের চালা, টিন, খুঁটি ইত্যাদি নেওয়া হচ্ছে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে। কৃষি আবাদ, শিক্ষা, আর্থিক অবস্থা, ব্যবসা বানিজ্য, জীবিকা- সব ক্ষেত্রেই পড়েছে ভাঙণের প্রভাব। কমলনগরের কিছু অংশে বাঁধ হয়েছে। কিন্তু তা আবার ভেঙেও পড়েছে। এসব নিয়ে প্রতিবেদন হয়েছে। আরও হতে পারে।

সয়বিনের কারণে দেশ জোড়া খ্যাতি কমলনগরের। এক সময় মোট উৎপাদনের ৮০ শতাংশ সয়াবিনের যোগান আসতো এ উপজেলা থেকে। ভাঙণের কারণে এখন হয়তো শতকরা হার কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু সয়াবিন চাষের ক্ষেত্রে চাষির সমস্যা নিয়ে বিশেষ কোন প্রতিবেদন খুব চোখে পড়ে না। আবার সয়াবিনের ন্যায্য মূল্য কী চাষিরা পাচ্ছেন? তাদের হাতে কী চাষাবাদের আধুনিক প্রযুক্তি আছে? এসব নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে প্রতিবেদনের সংখ্যা হাতে গোনা। এ উপজেলায় আরও অনেক সম্ভাবনার ক্ষেত্র আছে। চাঁদপুরের পর থেকে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর, কমলনগর, রামগতি এলাকার মেঘনায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ইলিশ আহরিত হয়। এক্ষেত্রে জেলে সম্প্রদায়কে নিয়েও হতে পারে বিভিন্ন ধরণের প্রতিবেদন। আবার যদি একটু দক্ষিণে যাই, মানে রামগতি ঘাট থেকে পার হয়ে ওপারে চর আবদুল্যা- সেখানে তো খবরের কারখানা। চর আবদুল্যা রামগতি উপজেলার একটি দ্বীপ ইউনিয়ন। সেখানকার নাগরিকেরা কেমন আছে? এপার বসে সেখবর খুব কমই রাখা হয়।

চাঁদপুরের ইস্যু কী

চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলাকে উন্মুক্ত উপকূল হিসাবে বিবেচনা করা হলেও মেঘনার গা ঘেঁসে জেগে থাকা চাঁদপুর সদরও উপকূলের প্রভাবমুক্ত নয়। উপকূল ভিত্তিক বহু খবর রয়েছে এইসব এলাকায়। হাইমচর এক সময় চাঁদপুরের মূল ভূখন্ডের সঙ্গে থাকলেও এখন সে পুরোটাই দ্বীপ। উপজেলা সদর স্থানান্তর করা হয়েছে আলগী ইউনিয়নে। হাইমচরে গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যায়, সেখানকার মানুষেরা কতটা কষ্টে জীবন যাপন করছেন। একটি মাত্র হাইস্কুল, অর্ধেক ওপারে, অর্ধেক এপারে! কীভাবে? একটু খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন। অনেকে অধিক কষ্টে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এপারে চরভৈরবীতে পড়তে আসে। কিছু ছেলেমেয়ে মাধ্যমিক পেরিয়ে কলেজে- তাদের থাকতে হয় চাঁদপুর সদরে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সংকট।

পূর্ব-উপকূলের জেলা ভিত্তিক কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করলাম। এক লেখায় আরও বর্ধিত পরিসরে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তবে আলোচিত বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে অনেক নতুন নতুন বিষয় বেরিয়ে আসবে। এছাড়া কমন বিষয়গুলো পূর্ব-উপকূলের জন্যও প্রযোজ্য। যেমন- পরিবেশ-প্রতিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, নাগরিক সেবা, যোগাযোগ-যাতায়াত, উন্নয়ন-অপউন্নয়ন, দুর্নীতি-অপরাধ ইত্যাদি।

* উপকূল সাংবাদিকতা সহায়কপত্রটি কোস্টাল জার্নালিজম নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (সিজেএনবি) ও চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ-এর যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত  

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য