উপকূল সাংবাদিকতা সহায়কপত্র-৩ : উপকূল সাংবাদিকতার গুরুত্ব ও চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় রাখুন

স্টোরি কভার চিত্র
রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল সাংবাদিকতার নানান দিন নিয়ে যখন আলোচনা হচ্ছে, তখন উপকূল সাংবাদিকতার গুরুত্বের বিষয়টি সামনে চলে আসে। উপকূলে যারা সাংবাদিকতা করছেন, উপকূল সাংবাদিকতার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত- তাদেরকে উপকূল সাংবাদিকতার গুরুত্ব অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।

বিষয় এবং কাঠামোগত দিক বিবেচনায় অনেক ধরণের সাংবাদিকতা প্রচলিত আছে দেশে-বিদেশে। এর কোন কোনটি আবার বেশ আলোচিত। পরিবেশ সাংবাদিকতা এক সময় বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে খুবই কম গুরুত্ব পেতো। পরিবেশের সঙ্গে জলবায়ু বিষয়টি যুক্ত হয়ে বিষয়টি এখন বৃহৎ পরিসর পেয়েছে। উন্নয়ন সাংবাদিকতাও অনেকখানি জায়গা করে নিয়েছে। দুর্যোগ সাংবাদিকতা, কৃষি সাংবাদিকতা, নারী ও শিশু বিষয়ক সাংবাদিকতা, আদিবাসী বিষয়ক সাংবাদিকতা, নৌপথ বিষয়ক সাংবাদিকতা, মানবাধিকার বিষয়ক সাংবাদিকতার ধারা আমাদের দেশে প্রচলিত আছে। তবে এগুলো এখনও বিশেষ গুরুত্বের আসনে স্থান পায়নি। ঘটনা ঘটলেই কেবল এসব বিটের সাংবাদিকদের খোঁজ পড়ে। কিন্তু রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসন, অপরাধ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে যারা কাজ করেন- তাদের গুরুত্ব বরাবরই বেশি। সংবাদ মাধ্যম তাদের কাছ থেকে খবর চায় প্রতিদিন। এত ধরণের সাংবাদিকতা থাকতে ‘উপকূল সাংবাদিকতার’ গুরুত্ব কতখানি? প্রশ্নটা সামনে চলে আসে। কেনই বা আমরা উপকূল নিয়ে ভিন্ন ধারার সাংবাদিকতার কথা ভাবছি?

নিবিড়ভাবে কাজ শুরুর আগে এই প্রশ্নগুলো নিজেকেই করছিলাম। কেন উপকূল নিয়ে কাজ করবো? নিজের কাছে নিজেই যখন জানতে চাই- তখন বের হয় অনেক ধরণের উত্তর। উপরে যেসব বিষয়ভিত্তিক সাংবাদিকতার কথা উল্লেখ করলাম, উপকূল সাংবাদিকতার এর সবগুলোই বিদ্যমান। একজন পরিবেশ সাংবাদিকের জন্য উপকূলে রয়েছে হাজার রকমের বিষয়। আবার জলবায়ু নিয়ে যে সাংবাদিক কাজ করেন, তাকেও নজর ফেরাতে হবে উপকূলে। প্রতিটি বিষয় ধরে বলার প্রয়োজন নেই- এক কথায় বলা যায়, সব ধরণের সাংবাদিকতার উপাদান রয়েছে উপকূলে। তাই বলে উপকূল সাংবাদিকতাকে এইসব বিষয়ের মধ্যে ফেলে দেওয়াও যায় না। উপকূল সাংবাদিকতাকে শুধুমাত্র পরিবেশ সাংবাদিকতা কিংবা মানবাধিকার সাংবাদিকতা কিংবা দুর্যোগ সাংবাদিকতা কিংবা উন্নয়ন সাংবাদিকতার মধ্যে ফেলে রাখা যাবে না। হয়তো কাজটা চালিয়ে নেওয়া যাবে, কিন্তু উপকূল সেভাবে গুরুত্ব পাবে না। সেই কারণেই এটাকে আমরা পৃথকভাবে ‘উপকূল সাংবাদিকতা’ বলতে চাই। আবার প্রতিদিন চলমান ঘটনা নির্ভর খবরকেও আমরা সেভাবে উপকূল সাংবাদিকতার সংজ্ঞায় ফেলতে পারি না। ‘উপকূল সাংবাদিকতা’ হচ্ছে এমন সাংবাদিকতা, যে সাংবাদিকতায় উপকূলীয় জনজীবনের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। অন্যভাবে বলা যায়- যে সাংবাদিকতায় উপকূল অঞ্চলের পরিবেশ-প্রতিবেশ, দুর্নীতি-অপরাধ, জনজীবনের সংকট এবং সম্ভাবনার চারদিক ফুটিয়ে তোলে সেটাই উপকূল সাংবাদিকতা।

সমস্যা ও সংকটের উপকূল

আমরা আলোচনা করছি উপকূল সাংবাদিকতার গুরুত্ব নিয়ে। সংকট ও সম্ভাবনা দুই দিক থেকেই উপকূল সাংবাদিকতার গুরুত্ব রয়েছে। সংকটের কথা যদি বলি- বলে শেষ করা যাবে না। উপকূল নিয়ে এখন যারা সাংবাদিকতা করছেন তাদের জীবদ্দশায় তো নয়-ই, পরের কয়েক প্রজন্মও উপকূল নিয়ে কাজ শেষ করে যেতে পারবে না। পিছিয়ে পড়া অনগ্রসর জনপদের নাম উপকূল। এই জনপদের মানুষদের প্রতিনিয়ত প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হচ্ছে। কখনো ঘূর্ণিঝড়ে লন্ডভন্ড হয়, কখনো জলোচ্ছ্বাসে ভাসে। প্রতি বছর দুর্যোগে হাজারো মানুষের প্রাণ যায়। কোটি কোটি টাকার সম্পদহানি ঘটে। চারিদিকে শুধু আতংক আর আতংক। এরপরও উপকূলের বহু এলাকায় পৌঁছেনি উন্নয়ন সুবিধা। সরকারি-বেসরকারি সেবা পৌঁছাচ্ছেনা সাধারণ মানুষের কাছে। গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। রাস্তাঘাট, কালভার্ট, হাসপাতাল কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। নদী-ভাঙ্গণে বিলীন হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো ভাসমান দিন কাটাচ্ছে। জীবিকা নির্বাহে সংকটের শেষ থাকে না। এর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে উপকূলে। কিন্তু প্রান্তিকের এই বিপন্নতার চিত্র কেন্দ্রীয় গণমাধ্যমে খুব কমই আসছে। নজর শুধু দুর্যোগ কিংবা অন্যান্য চলমান ঘটনায়। কিন্তু উপকূলের স্বাভাবিক জীবনটাও যে কতটা অস্বাভাবিক, সে খোঁজ কে রাখে?

ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসছে। ঘন্টায় ঘন্টায় বাড়ছে সতর্কীকরণ সংকেত, তিন, চার, ছয়, আট…। সতর্কীকরণ বার্তা যতটাই বিপদের দিকে এগোয়, ততই দ্রæত বেগে ব্যস্ত হয়ে ওঠে গণমাধ্যমের কেন্দ্রীয় বার্তা কক্ষ। উপকূলের দিকে বিপদ আসার খবরের ছবি চাই, সবার চেয়ে ভালো ছবি, লিড করার মত ছবি! বিস্তারিত প্রতিবেদন চাই, সবার চেয়ে ভালো প্রতিবেদন। গণমাধ্যমের ক্যামেরার চোখ তখন উপকূলের প্রান্তিকে, সেইসঙ্গে বাড়ে সংবাদকর্মীর ব্যস্ততাও। আর সেই ঘূর্ণিঝড়টি মহাপ্রলয় নিয়ে উপকূলে আঘাত হানে, তাহলে তো ঢাকা থেকে দল বেঁধে সংবাদকর্মীরা ছুটেন উপকূলের দিকে।

খবর খুঁজি উপকূলের প্রান্তিকে। ঝড়-ঝঞ্ঝায় ওলট-পালট জনপদ। ছুটে চলে বিপন্ন মানুষের দল। কেউবা দলছুট। শুকনো মুখগুলোর গভীর চাহনি আর দীর্ঘশ্বাসে কষ্টের ইঙ্গিত। সমুদ্রের নোনা জলে কালচে শরীর। তিনবেলা ভাত জোটানোর লড়াইটা যেন চোখেমুখেই স্পষ্ট। পরিবারের সদস্য সংখ্যা কারও পাঁচ, কারও সাত, আবার কারও দশ। বছরের একাধিকবার ঝড়ের তান্ডব এদের জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। জীবনের লড়াইটা তখন আরও কঠিন হয়ে পড়ে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মানুষগুলো নি:স্ব। এক একটি জনপদ বিলীন হয়ে যায় চোখের সামনে। আবার জেগে ওঠে নতুন চর। আবার জাগায় স্বপ্ন। উপকূলের এই প্রান্তিকে সরকারি-বেসরকারি সেবাও খুব একটা পৌঁছায় না। তবুও এগিয়ে যেতে হয়। জীবনযুদ্ধের নিয়মনীতি লঙ্ঘন করতে পারেন না বিপন্ন মানুষেরাও।

সম্ভাবনার উপকূল

সংকটের পাশাপাশি বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নিরিখেও উপকূল সাংবাদিকতার গুরুত্ব অনেক। ইলিশসহ উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্য সম্পদ দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখছে। কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা এই মৎস্য খাত। আবার উপকূলের কৃষি, শুটকি উৎপাদন, চিংড়ি চাষ, লবণ চাষ, কাঁকড়া চাষ ইত্যাদি ক্ষেত্রের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও উপক‚লের সম্ভাবনা ও গুরুত্ব বাড়িয়ে তোলে। পূর্বে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকে পশ্চিমে শ্যামনগরের কালিঞ্চি গ্রাম পর্যন্ত পর্যটনেরও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। পশ্চিম উপকূলে বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবন ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয়। আবার ধরুন, উপকূলের দ্বীপ-চরগুলোতে রয়েছে হাজার হাজার একর উর্বর ভূমি। এর সদব্যবহার কী হচ্ছে? কিন্তু এসব সম্ভাবনার কতটুকুই বা বিকশিত করা সম্ভব হয়েছে! উপকূলকে যদি আমরা গোল্ডেন চেইন হিসাবে বিবেচনা করি, তাহলে সেই চেইনের এক টুকরোও আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। উপকূলের এইসব সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র জাগিয়ে তুলতে উপকূল সাংবাদিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। উপক‚লের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে উপক‚লের মানুষকে ভালো রাখা যায়। সমস্যা ও সংকটও অনেকখানি কমিয়ে আনা যায়।

জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি

পরিবেশগত দিক থেকেই বিশ্বজুড়ে উপকূল অঞ্চলের গুরুত্ব বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূল অঞ্চলের ঝুঁকি বেড়ে চলেছে। জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। প্রতি বছর বহু ঘরবাড়ি হারিয়ে নি:স্ব হচ্ছে। অনেকে কাজ হারাচ্ছে। কৃষক নিজের জমিতে ধান ফলিয়ে টিকে থাকতে পারছে না। মৎস্যজীবীর জালে মাছের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। দুর্যোগের মাত্রাও বেড়েছে অস্বাভাবিক। বদলাচ্ছে তাপমাত্রা। গবেষণা সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে গড়ে প্রতি বছর তাপমাত্রা বেড়েছে দশমিক ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ১৯৬১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দেশে গড়ে প্রতি বছর তাপমাত্রা বেড়েছে দশমিক ৭২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শেষ দশ বছরে তাপমাত্রা এত বেশি বেড়েছে যে ৪০ বছরের গড়  তাপমাত্রার হার দ্বিগুন হয়েছে। গত ১০০ বছরে বাংলাদেশে তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে দশমিক ৫ মিটার। দক্ষিণ-পশ্চিম খুলনা অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার রেকর্ড করা হয়েছে ৫ দশমিক ১৮ মিলিমিটার। এইসব তথ্য থেকে দেখা যায়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে অত্যন্ত ধীর গতিতে। এরপরও এ হারে বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৮৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে উপকূলে। পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে মানুষজন বসতি বদলাচ্ছে বারবার। এইসব ঝুঁকির মধ্যেই বেঁচে আছে উপকূলের প্রায় চার কোটি মানুষ। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতাই এই অঞ্চলের জীবনযাত্রা পিছিয়ে রাখছে। উপকূলের বহু এলাকা মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণেই সেখানকার মানুষ কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে। এরই প্রভাব পড়ছে সমাজের নানা স্তরে। অশিক্ষা-অসচেতনতা জনপদের মানুষদের অনগ্রসরতার গন্ডি পেরোতে দিচ্ছে না। উপকূলের মানুষকে সেইসব সংকট থেকে বের হতে সহায়তা করার ভাবনা থেকেই ভিন্নধারার উপকূল সাংবাদিকতার পথে চলা।

ভাবনায় যোগ করি আরও কিছু বিষয়

দেশের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই অঞ্চলটি পিছিয়ে আছে যুগের পর যুগ। দুর্যোগ এলে সব গণমাধ্যমে হইচই পড়ে যায়। ‘সিডর’, ‘আইলা’, ‘মহাসেন’-এর কল্যাণে উপকূলের প্রতি গণমাধ্যমের সাময়িক নজর পড়ে উপকূলের প্রান্তিকে। দুর্যোগ সরে গেলে সেসব কথা কারও মনে থাকে না। দ্বীপের খবর কেউ রাখেন না। উপকূলের বিচ্ছিন্ন জনপদের প্রকৃত খবর নেই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারছে না। সেখানকার জেলেরা কীভাবে বেঁচে থাকে? কৃষকেরা কেন ফসল পায়না? শিশুরা কেন স্কুলে যেতে পারে না? নানামূখী দুর্যোগে মানুষগুলো কীভাবে বেঁচে থাকে? এসব প্রশ্নের জবাব আমাদের অনেকেরই জানা নেই। আবার থাকলেও আছে শুধুমাত্র উপরিভাগের তথ্য। ভেতরের তথ্য জানার সুযোগ একেবারেই কম। উপকূলকে এগিয়ে নিতে হলে, সেখানকার মানুষের সংকট কাটাতে হলে, এইসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চাই। তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, উপকূলের সমস্যা নিয়ে উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভাবনার সুযোগ করে দেওয়া, নীতিনির্ধারকদের সামনে সমস্যা সমাধানের পথ বের করে দিতেই উপকূল সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। আর এই লক্ষ্য নিয়েই আমি এই ধরণের ঝুঁকিপূর্ন সাংবাদিকতায় যুক্ত হই। এখানে চ্যালেঞ্জ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ভালো প্রতিবেদন তৈরির অনেক ক্ষেত্র। যথাযথ পরিকল্পনার মধ্যদিয়ে উপকূলের অনেক নতুন তথ্য তুলে আনা সম্ভব, যা দিয়ে চমৎকার প্রতিবেদন তৈরি করা যেতে পারে।

নিবিড় উপকূল সাংবাদিকতা প্রান্তিকের জেলে-কৃষক-ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সব পেশার মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে আনতে পারে। এর মাধ্যমে উপকূলের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে কেন্দ্রের সঙ্গে সংযুক্ত করা সম্ভব। দুবলার চর, নিঝুমদ্বীপ, মনপুরা, হাতিয়া, শাহপরীর দ্বীপের মত বিচ্ছিন্ন জনপদকে কেন্দ্রের সামনে উপস্থাপন করতে পারে উপকূল সাংবাদিকতা। প্রতিনিয়ত বিচ্ছিন্ন জনপদের মানুষগুলো কী সমস্যায় পড়ছেন, কীভাবেই-বা তার সমাধান করছেন, সব বিবরণ প্রতিবেদন আকারে উপস্থাপন করতে পারে উপকূল সাংবাদিকতা। খতিয়ে দেখতে পারে কেন প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য সরকারি-বেসরকারি সেবা মিলছে না? কেনই-বা তারা পিছিয়ে আছে যুগের পর যুগ? এর সঙ্গে বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ, সরকারি-বেসরকারি তৎপরতা আর নতুন নতুন ভাবনার খবরাখবর তুলে আনতে পারে উপকূল সাংবাদিকতা। তথ্য প্রচার এবং এ সংক্রান্ত নানামূখী কর্মকান্ডের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া সম্ভাবনাময় অঞ্চলটিকে সামনে নিয়ে আসা সম্ভব। মনে রাখা প্রয়োজন, বারবার কড়া নাড়লেই উপকূলের অন্ধকার দুয়ারে আলো ফেলা সম্ভব। আর সে ক্ষেত্রে উপকূল সাংবাদিকতা অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।

উপকূলের ব্যাপ্তি   

বাংলাদেশ সরকার পরিচালিত ইন্টিগ্রেটেড কোস্টাল জোন ম্যানেজমেন্ট প্রকল্প (আইসিজেডএমপি) প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত দেশের ১৯টি জেলাকে উপকূলের আওতাভূক্ত বলে চিহ্নিত করেছে। জেলাগুলো হচ্ছে বাগেরহাট, বরগুনা, বরিশাল, ভোলা, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, গোপালগঞ্জ, যশোর, ঝালকাঠি, খুলনা, লক্ষীপুর, নড়াইল, নোয়াখালী, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, সাতক্ষীরা, শরীয়তপুর। জেলাগুলোতে সংসদীয় আসনের সংখ্যা ৯০টি। এরমধ্যে ৪১টি সংসদীয় আসন প্রত্যক্ষ উপক‚ল সংশ্লিষ্ট। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে উপকূলভূক্ত এই এলাকায় লোকসংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। সমগ্র উপকূল অঞ্চলকে ‘এক্সপোজড’ ও ‘ইন্টেরিয়র’ এই দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এ হিসাবে বিপন্নতায় ১৬ জেলা। তিনটি নির্দেশককে ভিত্তি ধরে চিহ্নিত করা হয়েছে উপক‚ল অঞ্চল। এগুলো হলো- জোয়ার-ভাটার বিস্তৃতি, ঘূর্ণিঝড়ের বাতাস ও লবনাক্ততার প্রভাব। এই তিন নির্দেশক কেন্দ্র করেই উপক‚ল অঞ্চলের অধিকাংশ সমস্যা আবর্তিত। তিনটি নির্দেশকের মধ্যে যেখানে কমপক্ষে দুটো বিদ্যমান সে এলাকাকে এক্সপোজড জোন আর যেখানে একটি বিদ্যমান সে এলাকাকে ইন্টেরিয়র জোন হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের বিস্তৃতি পূর্বে কক্সবাজারের শাহপরীর দ্বীপ থেকে শুরু করে পশ্চিমে সুন্দরবন। ৭১০ কিলোমিটার তটরেখা বেষ্টিত সমগ্র উপকূলে ঝুঁকিপূর্ন জেলা ১৬টি। জেলাগুলো হচ্ছে: পূর্ব উপকূলের কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, মধ্য উপকূলে বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, শরীয়তপুর এবং পশ্চিম উপকূলে রয়েছে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা। পরোক্ষভাবে উপকূলের আওতায় আরও তিনটি জেলা রয়েছে। এগুলো হচ্ছে: গোপালগঞ্জ, নড়াইল ও যশোর। মোটা দাগে সমগ্র এই অঞ্চলের সাংবাদিকতাকেই ‘উপকূল সাংবাদিকতা’ ধরা যায়। তবে সমগ্র উপকূল অঞ্চলকে একই ফ্রেমে নিয়ে এসে পরিকল্পনার ভিত্তিতে নিবিড়ভাবে যে সাংবাদিকতা, সেটাকেই প্রকৃত ‘উপকূল সাংবাদিকতা’ বলা উচিত। সমগ্র উপকূল নিয়ে এ ধরণের সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলাম দীর্ঘদিন ধরে। অবশেষে এই ভিন্নধারার সাংবাদিকতার পথে হাঁটলাম বেশ কয়েক বছর ধরে। উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার তটরেখার খুব কম এলাকাই আছে, যেখানে আমার পা পড়েনি।

উপকূল সাংবাদিকতা, সময়ের দাবি    

গুরুত্বের দিক বিবেচনায় জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পর্যায়ে বিশেষ স্থান জুড়ে বিরাজমান ‘উপকূল সাংবাদিকতা’। হয়তো এটি এখনও ‘উপকূল সাংবাদিকতা’ হিসাবে স্বীকৃতি পায়নি। কখনো উপকূলের এই ভিন্ন ধরণের সাংবাদিকতা পরিচিতি পায় মফ:স্বল সাংবাদিকতা হিসাবে, কখনো বা দুর্যোগ সাংবাদিকতা হিসাবে। ইদানিংকালে আবার এটি জলবায়ু পরিবর্তন সাংবাদিকতা হিসাবেও স্থান করে নিচ্ছে। এই যে বিভিন্ন ফরমেটে আমরা উপকূল সাংবাদিকতা দেখছি- এখানেই রয়েছে সম্ভাবনা। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উপকূলের যেখানে বিশেষ অবদান রয়েছে; আবার প্রাকৃতিক বিপদের বড় সূত্র যেখানে এই উপকূল- সেখানে ‘উপকূল সাংবাদিকতা’ পৃথক মর্যাদা পাওয়া এখন সময়ের দাবি। গত কয়েক বছর ধরে নিবিড়ভাবে উপকূল সাংবাদিকতা শুরু হয়েছে। আর এই কাজের ভেতর দিয়ে সামনে আসছে কিছু চ্যালেঞ্জ। উপকূল সাংবাদিকতায় রয়েছে চ্যালেঞ্জ আর ঝুঁকি। কিন্তু এইসব চ্যালেঞ্জ আর ঝুঁকি কাটিয়ে সামনে যেতে পারলে আছে সম্ভাবনার সুদীর্ঘ দিগন্ত রেখা। উপকূল সাংবাদিকতা বিকাশের মধ্যদিয়ে সেই দিগন্ত রেখায় পৌঁছানো সম্ভব।

উপকূল সাংবাদিকতার ইস্যু

মানুষের দুঃখকষ্টের প্রতিবেদনও যে পাঠকের আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠতে পারে, তার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন। মানুষের খবর জানতে একেবারে মানুষের কাছে যাওয়া। বঞ্চিত মানুষটির মুখ থেকেই শোনা যেতে পারে ঘটনার বিবরণ। সরেজমিন অনুসন্ধানের ভিত্তিতে সেইসব অজানা কাহিনী তুলে ধরা যেতে পারে পাঠকের সামনে। পাঠকরা রাষ্ট্রের আলোচিত বিষয় ও রাজনৈতিক খবরের ওপর কিছুটা ঝুঁকে থাকলেও তাদের জানার আগ্রহের পরিধি অনেক বেড়েছে। তারা অন্যান্য খবরের পাশাপাশি মানুষের খবরও জানতে চান। উপকূলের মানবিক আবেদনধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতে জনমত সৃষ্টি হতে পারে। উপকূলের ইস্যুকে প্রধানত ৮টি ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলো হলো: ১) পরিবেশ-প্রতিবেশ; ২) জলবায়ু পরিবর্তন; ৩) দুর্যোগ-দুর্বিপাক; ৪) নাগরিক সেবা; ৫) দুর্নীতি-অপরাধ; ৬) রাজনীতি; ৭) সমস্যা ও সম্ভাবনা; এবং ৮) উন্নয়ন ও অপ-উন্নয়ন।

উপকূল সাংবাদিকতা, বাঁধা পদে পদে

উপকূল সাংবাদিকতায় যেখানে এত সম্ভাবনা ও সুযোগ, সেখানে বাংলাদেশের উপকূল সাংবাদিকতা কতটা এগিয়েছে? সঙ্গত কারণেই এই প্রশ্নটা সামনে এসে দাঁড়ায়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, উপকূলের খবরের প্রতি এদেশের কেন্দ্রীয় গণমাধ্যমের নজর খুবই কম। বহুমূখী প্রতিবন্ধকতায় উপকূলের মানুষের সংকটের বিষয়গুলো কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হতে পারেনি। এরফলে সংবাদকর্মীরাও বিশেষভাবে উপকূল সাংবাদিকতায় আগ্রহী হয়ে উঠছেন না। ঠিক কেন্দ্রীয় গণমাধ্যমের মতই উপকূল অঞ্চলে কর্মরত সংবাদকর্মীরাও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপকূলের কিছু চলমান বিষয়ে খবর তৈরির পর থেমে যান। অনেকে আবার দৈনন্দিন খবরের চাপে উপকূল নিয়ে বিশেষ খবর তৈরির সুযোগ পান না। তাদের পক্ষে শহর ছেড়ে প্রান্তিকের কোন জনপদে যাওয়াও সম্ভব হয় না। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, উপকূল অঞ্চলে বেশকিছু স্থানে ভালো লিখিয়ে রয়েছেন, যাঁরা প্রতিনিয়ত প্রান্তিকের মানুষের খবর রাখেন। তবে সে সংখ্যা একেবারেই হাতে গোনা। কিন্তু এই সংখ্যা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের দিক থেকে উৎসাহ একেবারেই কম। উপকূলের সাংবাদিকতায় এটিই সম্ভবত সবচেয়ে বড় সমস্যা। এই সমস্যার কারণে প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্বেও একজন সংবাদকর্মীর পক্ষে সেভাবে উপকূলের ইস্যু নিয়ে কাজ করা সম্ভব হয় না। তবে বাঁধা থাকবে, সেই বাঁধা অতিক্রম করে উপকূল সাংবাদিকতাকে এগিয়ে নিতে হবে।

তবুও এগিয়ে যেতে হবে

উপকূলের প্রায় প্রতিটি জেলায় রয়েছে দ্বীপ ও চর। ভাঙণ কবলিত এলাকা রয়েছে অসংখ্য। এমন অনেক সংকটাপন্ন এলাকা আমি চিনি, যেখানে কখনো কোন সংবাদকর্মীর পা পড়েনি। পা ফেলেননি সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা কিংবা জনপ্রতিনিধি। কেমন আছেন ওইসব এলাকার মানুষেরা? জানি, প্রান্তিকের এই দুর্গম জনপদে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহে সময় ও অর্থের প্রয়োজনটাই সবার আগে দেখা দেয়। তারপরেও নিজের প্রয়োজনেই উপকূল অঞ্চলে কর্মরত প্রত্যেক সংবাদকর্মীর উচিত নিজ নিজ এলাকাটি ভালোভাবে চেনা। একটি এলাকা ভালোভাবে চেনা থাকলে যেকোন প্রতিবেদন লেখা সহজ হয়ে যায়। তাছাড়া সরেজমিনে এলাকায় গেলে লেখার ধরণটাও বদলে যায়। বিষয়টি আরও সহজভাবে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা সম্ভব। উপকূলের জেলাগুলোর মধ্যে প্রায় সব জেলাতেই কমবেশি দুর্গম এলাকা রয়েছে।

পূর্ব উপকূলে চোখ ফেরালেও অনেক স্থানের একই চিত্র। কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের কুদিয়ার টেক তো সমুদ্রে হারিয়ে গেল! তারই নিকট গ্রাম তাবালরচরও হারানোর পথে। সেখানকার মানুষগুলোর দুরাবস্থা ক’জন সংবাদকর্মী নিজের চোখে দেখেছেন? বাড়ি হারানো মানুষগুলো কোথায় গেলেন? ক’জন সংবাদকর্মীর কাছে সে খবর আছে? ক্রমাগত পরিবেশ বিপর্যয়ে কক্সবাজারের মহেশখালীর ধলঘাটা ইউনিয়ন, টেকনাফের সাবাং ইউনিয়নের মানুষের কেবলই ছুটাছুটি। কে কার খোজ রাখে! আবার আসি, ভোলার দ্বীপ চর নিজামের দিকে। দ্বীপ উপজেলা মনপুরা থেকে তিনঘন্টা ট্রলার চালালে ওই দ্বীপের দেখা মেলে। সেখানকার মানুষের কাছে পৌঁছায় না কোন ধরণের নাগরিক সুবিধা। কীভাবে জীবনটা পার করছেন ওই এলাকার মানুষেরা? কীভাবেই বেড়ে উঠছে সেখানকার আগামী প্রজন্ম? কী খোঁজ আছে উপকূলের সাংবাদকর্মীদের কাছে? পটুয়াখালীর আন্ডার চর, চর মোন্তাজ, চর কাজল, চর লতা, রাঙ্গাবালীর সরেজমিন তথ্য-উপাত্ত ক’জন সংবাকর্মীর কাছে আছে? ভাঙণ রোধে অর্থ বরাদ্দের পরও লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের লুধুয়ার বড় অংশ অল্প দিনের ব্যবধানে বিলীন হয়ে গেল। নি:স্ব হলো বহু মানুষ। কই, এ সম্পর্কে খুব বেশি প্রতিবেদন তো চোখে পড়ল না! এসব এলাকার তথ্যাবলী নীতিনির্ধারক মহলে পৌঁছাতে হলে উপকূলের সাংবাদিকদেরই সবার আগে নজর ফেলতে হবে।

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এগিয়ে আসতে হবে

অবশ্যই চ্যালেঞ্জ আছে। দুর্গম এলাকার তথ্য তুলে আনতে চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই! আর সাংবাদিকতা পেশাটাই তো চ্যালেঞ্জের। ঝুঁকি আর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে যাওয়ার নামই উপকূল সাংবাদিকতা। পশ্চিম উপকূলের সুন্দরবনের গা ঘেঁষে জেগে থাকা উপকূলীয় জেলা বাগেরহাাটের মংলায় রয়েছে দুবলার চর। এর আওতায় রয়েছে অনেকগুলো চর। শুঁটকি উৎপাদনকে কেন্দ্র করে শীত মৌসুমে সেখানে হাজারো মানুষের ভিড় জমে। এছাড়াও কিছু মানুষ সেখানে নিয়মিত জীবিকার পথ খোঁজেন। কিন্তু একজন সংবাদকর্মী চাইলেই খুব সহজে সেখানে সংবাদ সংগ্রহে যেতে পারেন না। সুন্দরবনের আওতায় থাকায় দুবলার চরে যেতে বন বিভাগের অনুমতি লাগে। তাছাড়া ওই চরে যাওয়ার জন্য নেই কোন যানবাহন। দ্বীপ জেলা ভোলার দিকে চোখ ফেরালে চোখে ভাসে অসংখ্য চরের দ্বীপ চরের ছবি। ক’টা দ্বীপে গিয়ে ক’জন সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহ করতে পারছেন? সেখানকার অনেক দ্বীপ এখনও অধিকাংশ সংবাদকর্মীর কাছেই অচেনা।

সময়, অর্থ ও সুযোগ এই তিনটি প্রশ্ন বারবারই আসে। তবে উপকূলের সাংবাদিকদের দৃষ্টিভঙ্গিটাও বড় বিষয়। এরসঙ্গে সাংবাদিকের সততা, একনিষ্ঠতা, কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা এবং নিজের ব্যক্তিগত লক্ষ্য নির্ধারণের বিষয়টিও জরুরি। উপকূলীয় কোন শহরে রাজনৈতিক হানাহানি, সড়ক দুর্ঘটনা, এমনকি কোন এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ে আঘাত হানার বিষয়টিকেও পুরোপুরি উপকূল সাংবাদিকতার আওতায় ফেলতে পারি না। নদীভাঙণে তাৎক্ষণিক কয়েকটি পরিবার নি:স্ব হওয়া, কিংবা জলোচ্ছ¡াসে কোন এলাকার ফসলের ক্ষতির মত বিষয়কেও উপকূল নিয়ে ব্যতিক্রমী সাংবাদিকতার আওতায় ফেলা যায় না। এজন্যই উপকূলের সাংবাদিকতায় ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয় চোখের (থার্ড আই) ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উপকূলের সংবাদকর্মীকে নতুন খবরের সন্ধান দেবে, যা ইতোপূর্বে কখনো বিস্তারিতভাবে লেখা হয়নি। প্রত্যেক সংবাদকর্মীর ব্যক্তিগত লক্ষ্য নির্ধারণের বিষয়টিও জরুরি। আমি কী চাই? আমি কী আর দশজন সংবাদকর্মীর মত দৈনন্দিন খবর নিয়েই ব্যস্ত থাকব? নাকি নতুন কিছু সন্ধান করবো? আমার লক্ষ্যই এইসব প্রশ্নের জবাব খুঁজে দেবে। আর ক্ষেত্রে উপকূল ইস্যুতে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও কম গুরুত্বপূর্ন নয়।

প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা

একা সংবাদকর্মীর ওপর সব দায়দায়িত্ব ফেলে রাখলেও চলবে না। উপকূল সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি মোকাবেলায় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের নীতিনির্ধারণ ও রিপোর্টিং পরিকল্পনায় উপকূলের ইস্যুগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। গণমাধ্যমগুলো উপকূল নিয়ে পৃথক বিট যেমন তৈরি করতে পারে, তেমনি বিভাগ চালু করতে পারে। পাশাপাশি উপকূল ইস্যুতে উপকূলের সংবাদকর্মীদের পেশার মান উন্নয়নে নজর দিতে হবে। বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি)’র সহায়তা নিয়ে সংবাদকর্মীদের পেশাগত মান উন্নয়নে এগিয়ে আসতে পারে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো। উপক‚ল অঞ্চলের সাংবাদিকদের নিয়ে ইস্যু-ভিত্তিক প্রশিক্ষণের আয়োজন করা যেতে পারে।

স্বপ্ন সুদূরপ্রসারী

চ্যালেঞ্জ আর ঝুঁকি অতিক্রম করে একদিন উপকূলের অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত হবে। কেন্দ্রীয় গণমাধ্যমের নজর পড়বে উপকূলের অন্ধকারে। আর সেই সাথে উপকূলের অন্ধকার উঠে আসবে প্রকাশের আলোয়। এরই পথ ধরে উপকূলের মানুষেরা এগিয়ে যাবেন স্বপ্ন পূরণের পথে। সেই দিনের অপেক্ষা করছি।

* উপকূল সাংবাদিকতা সহায়কপত্রটি কোস্টাল জার্নালিজম নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (সিজেএনবি) ও চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ-এর যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত 

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য