যে গ্রামে হাতে লেখা কমিউনিটি পত্রিকা আলোড়ণ তুলেছে

গ্রামের দৃষ্টিশক্তি হারানো প্রবীণ আবদুল হামিদ বাঘাকে পত্রিকা পড়ে শোনাচ্ছেন তার নাতনি সোনিয়া আক্তার

রফিকুল ইসলাম মন্টু

নাম তার আবদুল হামিদ বাঘা। বয়স সত্তুর ছুঁয়েছে। সামান্য লেখাপড়া জানেন। তবে চোখ ঝাপসা হয়ে যাওয়ায় এখন আর পড়া সম্ভব নয়। হাসানের কাছ থেকে এক কপি কমিউনিটি পত্রিকা ‘আন্ধারমনিক’ কিনে নিয়েছেন। ঘরের বারান্দায় বসে ছেলের ঘরের নাতনি সোনিয়া আক্তার দাদাকে পড়ে শোনায় পত্রিকায় প্রকাশিত খবর।

গল্পটা পশ্চিম সোনাতলা গ্রামের। গ্রামটি উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের। আবদুল হামিদের মত আরও অনেকে ‘আন্ধারমানিক’ পত্রিকাটি কিনেছেন। গ্রামের তালগাছের রস সংগ্রহ যার কাজ, সেই ব্যক্তি মো. সানাউল্লাহ অবাক বিস্ময়ে পত্রিকার পাতায় চোখ রাখেন। প্রবীন ব্যক্তি মো. সামুদ্দিন কাজের ফাঁকে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন আন্ধারমানিক-এর পাতায়। আবার গ্রামের শ্রমজীবী মো, ইউসুফ হাওলাদার, যিনি নিজে পড়তে পারেন না, তিনিও তার সহযোগী মো. সোহাগ হাজারীকে দিয়ে পত্রিকা পড়িয়ে শুনছেন গ্রামের গল্পগুলো।

গ্রামবাসী তাল গাছের রস সংগ্রহকারী মো. সানাউল্লাহ, পত্রিকা পাঠে তার মনযোগ

গ্রামের স্বল্প শিক্ষিত গৃহিনী সাজেদা বেগমের চোখ আন্ধারমানিক-এর পাতায়। পত্রিকাটি হাতে পেয়ে অনুভ‚তি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ঈদের চান্দে শাড়িকাপড়ের ভাঁজে পত্রিকা পেতাম। রান্না করতে করতে সেই পুরানোপত্রিকা পড়তাম। এতো দেখি আমাদের গ্রামের তরতাজা খবর নিয়ে পত্রিকা। আজ আমি খুবই আনন্দিত। আমাদের গ্রামের খবর মাসে মাসেই পাব।’

নাতনি সোনিয়া আক্তারের কাছে পত্রিকার খবর শুনে আবদুল হামিদ বাঘা বলছিলেন, ‘খুব ভালো। আমরা এখন গ্রামের খবর পড়তে পারছি। গ্রামের মানুষের গল্পগুলো কাগজে দেখতে পেয়ে মনটা ভরে উঠেছে। এ তো আমাদের পত্রিকা।’

গৃহিনী মোসা. সাজেদা বেগমের বাড়িতে পত্রিকা নিয়ে উপস্থিত হাসান পারভেজ, পত্রিকা হাতে পেয়ে আগ্রহের সঙ্গে চোখ বুলাচ্ছেন

অবাক বিস্ময়ে পত্রিকার পাতায় চোখ রাখতে রাখতে গ্রামের শ্রমজীবী মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘এভাবেই এগিয়ে যাবে আমাদের গ্রাম। প্রতি মাসেই পত্রিকাটি আমরা চাই। আমাদের প্রত্যাশা একদিন এ আন্ধারমানিক পত্রিকা ছাপাখানায় ছাপা হবে। গ্রামের খবর ছড়িয়ে যাবে পৃথিবীর সবখানে। এই পত্রিকার প্রকাশ অব্যাহত রাখতে হবে।’

গ্রামের শ্রমজীবী ইউসুফ হাওলাদার পড়তে পারেন না। তবুও পত্রিকাটি হাতে পেয়ে খুব আনন্দিত। পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রকাশিত একটি শ্রমজীবী শিশুর ছবির ওপর হাত বোলাতে বোলাতে তিনি বলেন, ‘এই গ্রামের মানুষেরা যে কত কষ্ট করে জীবিকা নির্বাহ করে, সে খবর কেউ রাখে না। পত্রিকাটির মাধ্যমে এখানকার অনেক গল্প জানতে পারলাম। এটা ভিন্ন রকমের এক উদ্যোগ। গ্রামের মানুষের গল্পগুলো এভাবেই ছড়িয়ে পড়বে সকলের মাঝে। এই পত্রিকাটি সমাজ বদলে গুরুত্বপূর্ন রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস।’

মাছের গদিতে জেলে মো. ইউসুফ হাওলাদারকে পত্রিকা পড়ে শোনাচ্ছে তারই সহযোগী মো. সোহাগ

ভর দুপুরে কেউ পুকুর পাড়ে, কেউ ঘরের বারান্দায়, কেউ ঘরের চৌকিতে, কেউবা ঘরের দুয়ারে বেঞ্চে বসে অধির আগ্রহে পত্রিকা পাঠে অতি উৎসাহ নিয়ে মনোনিবেশন করেছিলেন। গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি মো. সামসুদ্দিন নাজির অধির আগ্রহে গাছের ছায়ায় বসে পত্রিকাটি পড়ছিলেন। গ্রামেই একটি পত্রিকা! হাতে পেয়ে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘খুবই ভালো উদ্যোগ। এই ধরণের উদ্যোগ গ্রামকে এগিয়ে নিবে। দোয়া করি এ কাজটি যেন আরও বহুদূর এগিয়ে যায়।’

পশ্চিম সোনাতলা গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে আন্ধারমানিক নদী। এই নদীর নামেই পশ্চিম সোনাতলা গ্রাম থেকে প্রকাশিত হয়েছে কমিউনিটি পত্রিকা ‘আন্ধারমানিক’। ব্যতিক্রমী এই পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে গ্রামের শ্রমজীবী মানুষেরা। গত পহেলা মে ঐতিহাসিক মে দিবসে পত্রিকাটির আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে। গ্রামের লোকজন এবং শহর থেকে আসা সাংবাদিকগণ উপস্থিত ছিলেন সে অনুষ্ঠানে।

পত্রিকাটি প্রকাশের পর সম্পাদক হাসান পারভেজ নিজের হাতে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেন পত্রিকার কপি। এ পর্যন্ত গ্রামের পাঠকের কাছে পৌঁছেছে ৫৫ কপি পত্রিকা। গড়ে প্রতিটি পত্রিকার ৫জন করে পাঠক হলেও পাঠক সংখ্যা প্রায় ৩০০ জন।

ভর দুপুরে গাছের ছায়ায় বসে আন্ধারমানিক কমিউনিটি পত্রিকায় চোখ বুলাচ্ছেন গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি মো. সামসুদ্দিন নাজির

কমিউনিটি পত্রিকা পশ্চিম সোনাতলা গ্রামে এক বিস্ময়কর উদ্যোগ। পাঠকদের মধ্যে কেউই এর আগে এমন উদ্যোগ দেখেননি। গ্রামেরই শ্রমজীবী যুবক হাসান পারভেজ এমন একটি উদ্যোগ নিয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। হাসান পত্রিকার কমিউনিটি সম্পাদক। তার সঙ্গে রয়েছেন ১২জন কমিউনিটি রিপোর্টার। সম্পাদকসহ এরা সকলেই গ্রামের শ্রমজীবী, কৃষিজীবী, গৃহিনী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, জেলে কিংবা শিক্ষার্থী। এরা নিজেদের মত করে খবর তৈরি করে। আর সেই খবর নিয়ে হাতে লেখা কমিউনিটি পত্রিকা তৈরি হয়। সম্পাদক নিজেই সুন্দর হাতের লেখা দিয়ে পত্রিকাটি সাজায়। ফটোকপি করে চাহিদা অনুযায়ী পাঠকদের সরবরাহ করা হয়।

কমিউনিটি পত্রিকার সম্পাদক হাসান পারভেজ বলেন, ‘এই পত্রিকার মধ্যদিয়ে আমরা গ্রামের মানুষের মাঝে সেতুবন্ধন রচনা করতে চাই। সমাজের অধিকাংশ মানুষ ডুবে আছে নেতিবাচক খবরে। অন্যের সমালোচনা করতেই আমরা বেশি পছন্দ করি। ভালো কাজটি বলি না। সেই কুশল সংবাদগুলো গ্রামের মানুষকে জানানোই আমাদের উদ্দেশ্য। এভাবেই আমরা মানুষের মনোভাব বদলাতে চাই। সমাজের পরিবর্তন চাই। আমাদের উদ্যোগ আছে। প্রয়োজন সকলের সহযোগিতা।’

//উপকূল বাংলাদেশ/১৭০৫২০১৯//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য