কলকাতায় সুন্দরবনের বনদেবীর পূজা হয় যেভাবে

কলকাতায় বনবিবি পূজা
শংকর লাল দাশ
একটি-দু’টি নয়। একেবারে গুনে গুনে এক লাখ হাঁসের ডিম দিয়ে পূঁজার প্রসাদ হলো। তাও আবার যেমন তেমন দেবী নয়। একেবারে জঙ্গলের দেবী বনদুর্গার। তাও আবার সুন্দরবনের গহীন অরণ্য কিংবা সুন্দরবন ঘেঁষা কোন গাঁ-গেরাম নয়, খোদ কলকাতা শহরে। সারাদিন ব্যাপী ব্যাপক জাকজমকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হলো বনদেবীর এ পূজা। এ উপলক্ষে বসেছিল বিশাল মেলাও। লোকে লোকারণ্যে হয়েছিল মেলা প্রাঙ্গন।

কেউ বলেন বনদুর্গা। কেউ বলেন বুড়ি কিংবা বুড়িমা। আবার কেউ বলেন বনদেবী। অনেকে আবার বনবিবিও বলেন। নামে যাই হোক, তিনি মূলত বনজীবীদের দেবী। সুন্দরবনের গহীন বনাঞ্চল কেন্দ্র করে নানা পেশাজীবীদের বাস। মাছ ধরা। কাঠ কাটা। মধু সংগ্রহ। এমন আরও অনেক লাভজনক কাজকর্ম রয়েছে সুন্দরবন ঘিরে। তাদের প্রায় সবারই আরাধ্য এই বনদেবী বা বনবিবি। সুন্দরবনে যেমন রয়েছে জীবিকার্জনের নানা উপায়। তেমনি পদে পদে রয়েছে মৃত্যুফাঁদ। হিংস্র রয়েল বেঙ্গল টাইগার থেকে শুরু করে কুমির। জল থেকে ডাঙ্গা। সর্বত্র হিংস্র স্বাপদে ভরপুর। একটু এদিক-সেদিক হলেই অকাল মৃত্যু নিশ্চিত। সুন্দরবন ঘেষা গাঁ-গেরামগুলোকে এজন্য অনেকে বিধবাদের গ্রামও বলে। বনজীবীদের বিশ্বাস-একমাত্র বনের দেবী বনদুর্গাই পারেন তাদের রক্ষা করতে। তাইতো বনদুর্গা কিংবা বনবিবিকে তুষ্ট করতে পূঁজা থেকে শুরু করে বনজীবীদের রয়েছে অসংখ্য আচার-আয়োজন। এসব আচার-আয়োজন কিংবা পূঁজা-পার্বন না করে বনজীবীরা কখনই অরণ্যের পথে পা বাড়ান না। এ ধারা চলে আসছে আবহমান কাল থেকে। যা বনজীবীদের রীতিমতো ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

বনদেবীর পূঁজা হবে সুন্দরবন কিংবা সংলগ্ন গাঁ-গেরামে, এটি স্বাভাবিক। তাই বলে কলকাতা শহরের মানুষও মেতে উঠবে বনদেবীর পূঁজায়, যা অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক বিষয়। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি এ বছরের ১৫ জানুয়ারি মঙ্গলবার কলকাতার বিজয়গড়-শ্রীকলোনির বারো ভূত দ্বাদশ অবতার মন্দিরে মকর সংক্রান্তির দিনে লাখো মানুষের অংশগ্রহণে ব্যাপক জাকজমকে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বনদুর্গা বা বনবিবির পূঁজা। এ উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী মেলাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারই প্রথম বনদেবীর পূঁজা নয়। বিজয়গড়-শ্রীকলোনিতে গত ৬৮ বছর ধরে বনদেবীর পূঁজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ১৯৪৭ সালে দেশভাগ এবং পরবর্তী সময়ে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ থেকে অসংখ্য হিন্দু ভারতে পাড়ি জমিয়েছিল। অন্যদের মতো তৎকালীন ঢাকার রোহিতপুর গ্রাম থেকেও বহু মানুষ ভারতে পাড়ি জমান। এদের মধ্যে বিশ্বনাথ শীল, রাধারমণ ঘোষ, হরেন বিশ্বাস, কালাচাঁদ দত্তরা ১৯৫১ সালে কলকাতার ওই তল্লাটে বারো ভূতের পূঁজা ও মেলার পত্তন করলেন। বারো ভূত মানে বিষ্ণুর বারো জন অবতারের পূঁজো। একই সঙ্গে গণকঠাকুর নামের একজন ভক্ত তার গৃহদেবতা বনদেবীকে বারো ভূত দ্বাদশ অবতারের পূঁজার সঙ্গে জুড়ে দিলেন। শুরু হলো বনদেবীর পুঁজা। আর প্রসাদ হিসেবে ডিম ! তারও আছে ইতিহাস। মেলা ও পূঁজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাশীনাথ শীল বলেন, বড়দের কাছ থেকে শোনা কথা। এক বার বুড়ি ভিখারির বেশে বনদুর্গা এক গরিব ঘরে যান। সে বাড়িতে ছিল শুধু চাল আর বাড়িতে পোষা হাঁসের ডিম। ভাত আর ডিম রান্না করে দেয়া হয়েছিল বনদুর্গাকে। তাতেই তিনি প্রসন্ন হন। সেই থেকে দেবীকে হাঁসের ডিম দেয়ার প্রচলন। মেলা কমিটির সদস্য কালু ঘোষ আর একটু এগিয়ে বলেন, হাঁসের ডিম তো নিরামিষ। মুরগির ডিম কিন্তু আমিষ। মুরগির ডিমে দোষ আছে, হাঁসের ডিমে নেই। তাই, পূঁজায় হাঁসের ডিম দেয়াই যায়।

এবারের বনদেবীর পূঁজায় মোট এক লাখ হাঁসের ডিম প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করা হয়। যার পুরোটাই মানত হিসেবে ভক্তদের কাছ থেকে এসেছে। বিরাটি, বাগুইআটি, বারাসাত, মধ্যমগ্রাম, দত্তপুকুর, ঠাকুরনগর, বেলঘরিয়া, ইছাপুর, ব্যারাকপুর, নৈহাটি থেকে শুরু করে সুদূর বর্ধমান থেকে আসা বহু মানুষ বনদুর্গার পূঁজা দেবেন বলে এ দিন ভোর ৫টা থেকে বারো ভূত দ্বাদশ অবতার মন্দিরের সামনে লাইনে দাঁড়ান। তাদের অনেকেই নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী হাঁসের ডিম মানত করেছেন। আবার মনস্কামনা পূর্ণ হওয়ায় কেউ কেউ গতবার যা মানত করেছিলেন, ততগুলো হাঁসের ডিম দিয়েছেন বনদুর্গাকে। পাড়ার দত্ত বাড়ির মেয়ের সম্প্রতি বিয়ে হয়েছে। গত বছরের মানত অনুযায়ি দত্ত গিন্নি এ দিন ২১০টি ডিম দিলেন বনদেবীকে। লক্ষ্মীরানী নামের এক নারী দিলেন ৫১টি ডিম। ৫-১০টি ডিম দিয়েছেন অনেকেই। সন্ধ্যার মধ্যে জমা পড়ে এক লাখ ডিম।

শুধু ভক্তদের মধ্যে বিতরণ নয়। আশপাশের কয়েকটি হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম, অনাথ আশ্রমেও বিপুল সংখ্যায় পাঠানো হয় বুড়ি মায়ের প্রসাদের ডিম। যাকে উদ্যোক্তারা বলছেন, মায়ের পূঁজোর মধ্যে দিয়ে লোকসেবা। সুন্দরবনের দেবীর পশ্চিমবঙ্গের জনবহুল রাজধানী কলকাতা শহরে পূঁজিত হওয়া অনেকের কাছেই যথেষ্ট কৌতুহলের। এ যেন গাঁ-গেরামের দেবীর অভিজাত শ্রেণীতে অবস্থান।

//উপকূল বাংলাদেশ/০৮০৫২০১৯//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য