শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘ফণি’ আসছে, জেনে নেই বাংলাদেশের উপকূলের অবস্থা কী?

ঘূর্ণিঝড় ফনি’র গতিপথ

রফিকুল ইসলাম মন্টু: ফুঁসছে ‘ফণি’। ৪০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী এ ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় বাংলাদেশেও নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। এই ভয়ের সময়ে উপকূলের মানুষের মনে পড়ছে প্রলয়ংকরী সব ঘূর্ণিঝড়ের কথা। ২০০৭ সালে উপকূলের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। ২০০৯ সালের আইলায়ও কম ক্ষতি হয়নি। ১৯৯১ কিংবা ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় তো আর বড় প্রলয় ডেকে এনেছিল। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় ফণি’র প্রভাবে এখন উপকূলের অবস্থা কী? স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্য থেকে জেনে নেই।

নলিয়ান, দাকোপ, খুলনা: খুলনার দাকোপের নলিয়ানের ট্রলার চালক আবদুর রহমান জানিয়েছেন, সেখানকার আকাশ সকাল থেকে মেঘাচ্ছন্ন। শিবসা নদীতে পানি বেড়েছে। নদী উত্তাল রয়েছে। নতুন বাঁধের বাইরে থাকা মানুষেরা ঝুঁকিতে। ঘূর্ণিঝড় আইলায় বাড়িঘর হারানো ঝুলন্ত পাড়ারার মানুষেরা আতংকে রয়েছেন।

শ্যামনগর, সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরার শ্যানগরের সাংবাদিক রনজিৎ বর্মনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, সেখানে আজ দুপুর ১২টার দিকে বৃষ্টি হয়েছে। আকাশ এখন মেঘাচ্ছন্ন। বৃষ্টি নেই। থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। রমজানগর ইউনিয়নের গোলাখালী, কালিঞ্চি, বুড়িগোয়ালিনীর দাতিনাখালী, দুর্গাভাটি, পদ্মপুকুরের কামালকাঠির অন্তত দশ হাজার মানুষ ঝুঁকিতে। ১৫৫টি সাইক্লোন শেলটার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নদীতে জোয়ারের পানির উচ্চতা বেড়েছে। পানি আরও বাড়লে নিচু বাঁধ উপচে পানি প্রবেশের ভয় আছে।

গাবুরা, শ্যামনগর, সাতক্ষীরা: গাবুরার তরুণ খান আবু হাসান জানান, দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার চারিদিকে নদীর পানি বেড়েছে। আকাশে মেঘের আনাগোনা। তবে বৃষ্টি নেই। গুমোট আবহাওয়া। থমথমে অবস্থা বিরাহ করছে। ইউনিয়নের চারিদিকে অন্তত ১০টি স্থানে নাজুক বেড়িবাঁধের কারণে মানুষ আতংকিত। নদীর পানি বেশি বাড়লে বাঁধ উপচে পানি প্রবেশ করতে পারে।

কয়রা, খুলনা: কয়রার সাংবাদিক হারুন অর রশিদ জানান, সেখানকার অধিকাংশ স্থানে বেড়িবাঁধের অবস্থা নাজুক। বেড়িবাঁধের উচ্চতা কোথাও ৩ ফুট, ৪ ফুট, ৫ ফুট। অন্তত ৩৫টি স্থান ঝুঁকিপূর্ন অবস্থায় রয়েছে। নদীর পানি বাড়লে এসব স্থান দিয়ে পানি প্রবেশ করতে পারে। আজ সারাদিন সেখানে মেঘলা আকাশ। গুমোট আবহাওয়া বিরাজ করছে। ভ্যাপসা গরম। মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে। ১১৬টি সাইক্লোন শেলটার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

মংলা, বাগেরহাট: মংলার সাংবাদিক মনিরুল হায়দার ইকবাল জানান, সেখানে অনেকটা স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, তবে বৃষ্টি নেই। পশুর নদীর পানি কিছুটা বেড়েছে। নদী উত্তাল রয়েছে। ৭৮টি সাইক্লোন শেলটার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

শরণখোলা, বাগেরহাট: শরণখোলার সাংবাদিক শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, আজ সকাল থেকে পশ্চিম-দক্ষিণ কোনে মেঘের আনাগোনা চোখে পড়ছে। নদীর পানি কিছু বাড়লেও সেটা অতিরিক্ত কিছু নয়। তবে মানুষের মাঝে আর্তক ছড়িয়ে পড়েছে। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর যেখানে আঘাত করেছিল, সেই সাউথখালী, বগী এলাকায় অন্তত ২ কিলোমিটার এলাকার বেড়িবাঁধ নাজুক। দেড় হাজার পরিবারের প্রায় ৬ হাজার মানুষ ঝুঁকিতে। ৮৬টি সাইক্লোন শেলটার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

হরিনগর, শ্যামনগর, সাতক্ষীরা: হরিনগরে কর্মরত উন্নয়নকর্মী শান্তনু বিশ্বাস জানান, সেখানে গুমোট আবহাওয়া বিরাজ করছে। আকাশ মেঘলা। দুপুরের দিকে হালকা বৃষ্টি হয়েছে। কমিউনিটির মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতির মহড়া দেওয়া হয়েছে।

আশাশুনি, সাতক্ষীরা: আশাশুনি থেকে সাংবাদিক এস কে হাসান জানান, সেখানে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন রয়েছে সকাল থেকে। তবে বৃষ্টি নেই। মানুষের মাঝে আর্ক রয়েছে। খোলপেটুয়া ও মরিচ্চাপ নদীর তীরের নাজক বেড়িবাঁধের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে প্রতাপনগর, শ্রীউলা ও আশাশুনি সদরের কিছু এলাকার মানুষ। বর্ষা মৌসুম আসার আগেই এসব এলাকার বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

পাইকগাছা, খুলনা: পাইকগাছার সাংবাদিক প্রকাশ ঘোষ বিধান জানান, আবহাওয়া ততটা খারাপ না হলেও মানুষের মাঝে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। আকাশ সকাল থেকে হালকা মেঘলা। তবে বৃষ্টি হয়নি। উপজেলার গড়ইখালী, সোলাদানা, গদাইপুরের কিছু অংশ এবং পৌরসভার কিছু অংশ ঝুঁকিতে রয়েছে। পানি বাড়লে কিংবা প্লাবিত হলে এইসব এলাকা ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

বরগুনা: বরগুনা থেকে সাংবাদিক সুমন সিকদার জানান, সকাল থেকে আকাশ কিছুটা মেঘলা থাকলেও বিকালে বরগুনার আকাশে ছিল ঝকঝকে রোদ। অবস্থা বেশ স্বাভাবিক। ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর সঙ্গে তুলনা করলে, সে সময় ৪-৫ নম্বর সিগন্যালে যে অবস্থা ছিল, এখন ৭ নম্বর সিগন্যালে তার কিছুই লক্ষ্য করছি না। জেলায় ৩৩৫টি সাইক্লোন শেলটার প্রস্তুত রয়েছে।

বরগুনার বেশকিছু স্থানে বেড়িবাঁধ নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ন স্থানগুলো হচ্ছে- সদর উপজেলার ডেমা, গুলিশাখালী, মানিকখালী, লবণগোলা, নাপিতখালী, পূর্ব বুড়িরচর, দক্ষিণ ডালভাঙ্গা, মাঝখালী, বান্দরগাছিয়া, নলী, ছোটবালিয়াতলী, বেতাগী উপজেলার দক্ষিণ কালিকাবাড়ি, উত্তর কালিকাবাড়ি, ভোড়া, বেতমোর, উত্তর বেতাগী, কেওয়াবুনিয়া, আমতলী উপজেলার বৈঠাকাটা, কুলুরচর, পূর্ব চিলা, পশ্চিম চিলা, উত্তর তক্তাবুনিয়া, জেলেপাড়া, কলাগাছিয়া, পৌরসভা সংলগ্ন আমুয়ার চর, তালতলী উপজেলার খোট্টার চর, তেতুলবাড়িয়া, নলবুনিয়া, আশারচর, সকিনা, আমখোলা, পাথরঘাটা উপজেলার কাকচিড়া, আমতলী, খাসতবক, ভয়াল, গুদিঘাটা, কালিকাবাড়ি, সিংড়াবুনিয়া, বাইনচটকি এবং বামনা উপজেলার শফিপুর, চেচাং, বড় তালেশ্বর ও রামনা।

চরমোন্তাজ, রাঙ্গাবালী, পটুয়াখালী: চরমোন্তাজ থেকে সাংবাদিক আইয়ূব খান জানান, সেখানে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। গুমোট আবহাওয়া। ভ্যাপসা পরম। বাতাস নেই। ছোট নদীতে তেমন ঢেউ নেই। তবে সমুদ্রের মোহনায় দাঁড়ালে কিছুটা ঢেউ চোখে পড়ে। জামাল মাঝি নামে এক ব্যক্তির একটি ট্রলার ডুবি হয়েছে। দ্বীপ ইউনিয়ন চরমোন্তাজের অধিকাংশ স্থানে বেড়িবাঁধ নাজুক।

কুয়াকাটা, পটুয়াখালী: কুয়াকাটার সাংবাদিক রুমান ইমতিয়াজ তুষার জানান, অবস্থা একেবারেই স্বাভাবিক। অন্তত হাজার খানেক পর্যটক সেখানে আছেন আজ। সমুদ্র ততটা উত্তাল হয়নি। স্বাভাবিক রয়েছে। আকাশ কিছুটা মেঘলা। আবার মেঘ সরে গেলে রোদ। তবে তীব্র গরম পড়ছে।

//02052019//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য