উপকূল সাংবাদিকতা সহায়কপত্র-২: ঘূর্ণিঝড় রিপোর্টিংয়ের প্রস্তুতি নিতে বিস্তৃত পরিসরে ভাবুন

ঘূর্ণিঝড়ের ছবি

রফিকুল ইসলাম মন্টু

ঘূর্ণিঝড় মৌসুমে কী ধরণের রিপোর্টিং প্রস্তুতি নিয়েছেন? নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত হাতের কাছে নিয়ে রেখেছেন। খসড়া পরিকল্পনাটাও মাথায় আছে। হয়তো সময় হলে ঝাঁপিয়ে পড়বেন কাজে। আসুন, ঘূর্ণিঝড় রিপোর্টিংয়ের প্রস্তুতিটা একটু পাকাপোক্ত করে নেই। জেনে নেই ঘূর্ণিঝড় মৌসুমে কোন বিষয়গুলো আপনার প্রতিবেদনকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলবে।

উপকূল ইস্যুতে কর্মরত সাংবাদিকগণ ঘূর্ণিঝড় রিপোর্র্টিংয়ে পাকা, এ বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। কারণ, দুর্যোগের সময় তাদের ছুটতে হয়। অনেক তথ্য-উপাত্ত খুঁজতে হয়। দুর্যোগ বিষয়ে তাদের কাছে রয়েছে অনেক তথ্য। মাঠের খোঁজও রাখেন তারা। তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা প্রান্তিকে পৌঁছে গেছে। জরুরি তথ্য আদান প্রদানে সুবিধা বেড়েছে। ঘূর্ণিঝড় কোন দিক দিয়ে আসার সম্ভাবনা, কোন এলাকায় বাতাসের গতিবেগ বাড়ছে-এসব এখন আমরা সহজেই জানতে পারি। ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কীকরণ বার্তা পেলে তাই সাংবাদিকদের ব্যস্ততাও বেড়ে যায় অনেকখানি। কিন্তু এই ব্যস্ততার ভেতর দিয়ে আমরা কতটা ভালো প্রতিবেদন করতে পারছি? বিশেষ কোন খবরের দিকে আমাদের নজর থাকে কী? অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা তাৎক্ষণিক জরুরি বার্তাগুলো দিয়েই দায়িত্ব শেষ করি। আমার মনে হয়, ঘূর্ণিঝড় বিষয়ক খবর শুধু এই জরুরি সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিষয়ক রিপোর্টিং ভাবনা প্রসারিত করতে আমরা নিচের কয়েকটি বিষয় নিয়ে একটু ভাবতে পারি।

ঘূর্ণিঝড় রিপোর্টিং করতে হলে অবশ্যই সবার আগে আপনাকে ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা রাখতে হবে। ঘূর্ণিঝড় কেন হয়, ঘূর্ণিঝড়ের সংজ্ঞা কী? এসব বিষয়ে পরিস্কার ধারণা এক্ষেত্রে আপনাকে অনেক সমৃদ্ধ করবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে দুর্যোগ তথা ঘূর্ণিঝড় ব্যবস্থাপনা করা হয়। আপনাকে জানতে হবে এই ব্যবস্থাপনা কীভাবে কাজ করে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দেখে একটি আইন রয়েছে। এ সম্পর্কেও আপনার জানা খুব জরুরি। ঘূর্ণিঝড়ের তারিখগুলো নোটে থাকলে সব সময় আপনার কাজে লাগবে। বিশেষ প্রতিবেদনের প্রস্তুতিও নিতে পারবেন। নিয়মিত আবহাওয়া বার্তা ছাড়াও সাধারণত কোন সময়ে ঘূর্ণিঝড় বেশি হয়- একটু বিবেচনায় রাখুন। অবশ্যই আবহাওয়া বার্তা সম্পর্কেও আপনাকে সজাগ থাকতে হবে। ঘূর্ণিঝড় প্রতিবেদনের জন্য পরিকল্পনা করুন তিনধাপে। তবে সবার আগে আমরা তিন ধাপের রিপোর্টিং পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে পারি।

প্রতিবেদন পরিকল্পনা করুন তিনধাপে
ঘূর্ণিঝড় কিংবা অন্যকোন দুর্যোগ হোক না কেন, এ ধরণের রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে তিনধাপে প্রস্তুতি রাখা প্রয়োজন। এগুলো হলো: ১) ঘূর্ণিঝড় বা দুর্যোগের আগের প্রস্তুতি; ২) ঘূর্ণিঝড় বা দুর্যোগকালীন প্রস্তুতি; এবং ৩) ঘূর্ণিঝড় বা দুর্যোগ পরবর্তী প্রস্তুতি।

একজন দুর্যোগ প্রতিবেদক হিসাবে দুর্যোগ বিষয়ে ধারণা যেমন রাখতে হবে, তেমনি নিয়মিত আপডেট থাকতে হবে। দুর্যোগের আগের সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ন। এ সময়ে ঘূর্ণিঝড়ের গতিবিধি সম্পর্কে আপডেট থাকা যেমন জরুরি, তেমনি প্রস্তুতি, পূর্ব সতর্কতা ইত্যাদি বিষয়েও জেনে রাখা প্রয়োজন। দুর্যোগের পূর্ববর্তী সময়কালে আমরা নিচের বিষয়গুলোর দিকে মনযোগ দিতে পারি। যেমন,

  • ঝুঁকির উৎস ও মাত্রা বিশ্লেষণ করা: রিপোর্টার হিসাবে আপনাকে আগে থেকেই জেনে রাখতে হবে ঝুঁকিটা কোন এলাকা থেকে আসছে এবং কী মাত্রায় এটি আঘাত হানতে পারে।
  • পূর্ব সতর্কতা: ঝুঁকির মাত্রাটা জানা থাকলে আপনি পাঠক-শ্রোতাকে জানাতে পারবেন সংশ্লিষ্টদের কী ধরণের সতর্ক ব্যবস্থা নিতে হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে ঝুঁকি ছড়িয়ে পড়তে পারে, সে বিষয়েও সকলকে জানাতে হবে।
  • প্রস্তুতি সংক্রান্ত তথ্য: কোন ধরণের ঝুঁকির আশংকা দেখা দিলে আপনাকে অবশ্যই ঝুঁকিসমূহ মোকাবেলায় প্রস্তুতি কী আছে, সে বিষয়ে সকলকে অবহিত করতে হবে।
  • ঝুঁকি নিরসনে সহায়তা করা: যে ধরণের ঝুঁকির আশংকা করা হচ্ছে, তা নিরসনে কী ধরণের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে সে বিষয়ে জানাতে হবে। কমিউনিটি থেকে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, প্রশাসন থেকে কী পদক্ষেপ নিতে পারে, সেসব বিষয়ে ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ দেওয়া যেতে পারে।
  • জনগনের অংশগ্রহনে উৎসাহ দেয়া: ঝুঁকি মোকাবেলায় স্থানীয় বাসিন্দারা কীভাবে পদক্ষেপ নিতে পারে, সে বিষয়ে খোঁজখবর রাখা যেতে পারে। এর মধ্যদিয়ে জনগন উৎসাহিত হতে পারে।

ঘূর্ণিঝড় বা দুর্যোগকালের প্রস্তুতিটা আরও গুরুত্বপূর্ন। একজন সংবাদকর্মী ঘূর্ণিঝড় অথবা বড় ধরণের দুর্যোগ আসার অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে থাকবেন। ঘূর্ণিঝড়ের গতিবিধি দেখেই হয়তো নিউজ ম্যানেজমেন্ট থেকে নির্দিষ্ট প্রতিবেদকদের দায়িত্ব দিবেন অথবা সতর্ক হতে বলবেন। দায়িত্ব পেয়ে প্রতিবেদক কী করবেন? তাকে অবশ্যই প্রথম ধাপের বিষয়গুলোর আলোকে পরের ধাপের প্রস্তুতি নিতে হবে। যেমন,

  • সময়মত তথ্যভিত্তিক তথ্য দেওয়া: পাঠক-শ্রোতাকে সময়মত সঠিত তথ্য প্রদান করা প্রতিবেদকের দায়িত্ব। সংশ্লিষ্ট সকল মহলের সঙ্গে কথা বলে এ কাজটি করা যেতে পারে।
  • পদক্ষেপ গ্রহন বিষয়ে সজাগ করা: এই জরুরি সময়ে সরকার থেকে কী ধরণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে জানাতে হবে। সরকারি বার্তাগুলো সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছাতে হবে। কর্তৃপক্ষ বা ত্রাণ সংস্থার পদক্ষেপ সম্পর্কে জানাতে হবে।
  • বিচ্ছিন্ন জনপদের তথ্য দিয়ে উদ্ধার কাজে সহায়তা করা: জরুরি সময়ে উদ্ধার কাজ একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়। এক্ষেত্রে সাংবাদিক এমন কিছু তথ্য প্রকাশ করতে পারেন, যাতে উদ্ধার কাজে সহায়তা হয়।
  • দুর্গতদের জন্য কী প্রয়োজন, তা প্রচার করা: যারা জরুরি ত্রাণ-উদ্ধার ইত্যাদি কাজে রয়েছেন, তাদের কাছে মাঠের ক্ষতিগ্রস্থ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো জানাতে হবে।
  • সম্ভাব্য ঝুঁকির আভাস দেয়া: ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে কী ধরণের ঝুঁকি আসতে পারে, সে বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করা যেতে পারে।

ঘূর্ণিঝড় বা দুর্যোগ পরবর্তী সময়টাকেও অবহেলা করতে পারেন না একজন রিপোর্টার। এ সময়ে তাকে বেশকিছু বিষয়ের দিকে নজর দিতে হয়। একটু ব্যতিক্রমী চিন্তা মাথায় থাকলে ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে আপনি করতে পারেন কিছু বিশেষ প্রতিবেদন। নিচের বিষয়গুলোতে নজর দেই,

  • ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক ধারণা দেওয়া: ঘূর্ণিঝড় পরবর্তীকালে সবচেয়ে যেটি গুরুত্বপূর্ন সেটি হলো, ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক ধারণা দেওয়া। হয়তো ক্ষতির পরিমাণ পরবর্তীতে বাড়বে, তখন আপডেট করা যেতে পারে।
  • সাহায্যের আবেদন করা: দেখা গেল দুর্যোগে এমন ক্ষতি হয়েছে, স্থানীয় সম্পদ দিয়ে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। তখন ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সাহায্যের আবেদন সংক্রান্ত প্রতিবেদন করা যেতে পারে।
  • পুনর্বাসন ও পুননির্মাণ সংক্রান্ত তথ্য দেওয়া: এই সময়ে পুনর্বাসন কিংবা পুনর্গঠণের বিষয়ে তথ্য দিতে পারেন প্রতিবেদক। মাঠের ক্ষতিগ্রস্থদের বিপন্নতার গল্পগুলো প্রকাশ করতে পারেন।
  • পুনর্গঠণে সবাইকে উৎসাহ দান: পুনর্বাসনে সকল মহলকে উৎসাহ দিয়ে প্রতিবেদন করতে পারেন প্রতিবেদক।
  • ঝুঁকি নিরসনকে উৎসাহিত করা: ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী ঝুঁকি নিরসন কীভাবে হতে পারে, কী ধরণের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে, সেসব প্রতিবেদন প্রকাশ করা যেতে পারে।
  • ত্রুটি ধরিয়ে দেয়া: উদ্ধার, ত্রাণ, পুনর্বাসন, পুনর্বাসন ইত্যাদি ক্ষেত্রে ত্রæটি ধরিয়ে দিতে পারেন প্রতিবেদক।

ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা রাখুন
ঘূর্ণিঝড় বিষয়ক প্রতিবেদন করতে ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি। উপক‚ল অঞ্চলের মানুষের কাছে কিংবা সাংবাদিকদের কাছে ঘূর্ণিঝড় একটি অতি সাধারণ বিষয়। কিন্তু তা সত্বেও অনেক সাধারণ বিষয় অবহেলা করার কারণে আমরা অন্ধকারে থেকে যাই। যেমন ধরা যাক, ঘূর্ণিঝড় কী? এই প্রশ্নটির জবাবে কে কী বলবেন? হয়তো আমাদের ধারণাটা আছে। কিন্তু স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। এভাবে বলা যায়, ‘ঘূর্ণি’ নিয়ে ঝড় আসে বলে একে ‘ঘূর্ণিঝড়’ বলা হয়। ঘূর্ণিঝড়ের ঘূর্ণি ঘড়ির কাটার বিপরীত দিতে ঘোরে। আরও সজ্ঞায়িত করলে বলা যায়, ঘূর্ণিঝড় হলো গ্রীষ্মমন্ডলীয় একটি উত্তাল অবস্থা, বাতাসের প্রচন্ড ঘূর্ণায়মান গতির ফলে সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞানিরা বলেন, অত্যাধিক গরম ও তীব্র রোদের কারণে কোন স্থানের বাতাস হালকা হয়ে উপরের দিকে উঠে গেলে ওই স্থানে বাতাসের চাপ কমে ফাঁকা হয়ে যায়। আর সেই ফাঁকা জায়গা দখল করতে তীব্র বেগে চারদিক থেকে মেঘ বৃষ্টিসহ ঘুরতে ঘুরতে ছুটে আসা ভারি বাতাস ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি করে। ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয় গভীর সমুদ্রে। আর তার জন্য দরকার ২৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বা তার চেয়েও বেশি তাপমাত্রা।

প্রশ্নটি আসা খুবই স্বাভাবিক, কী কারণে ঘূর্ণিঝড় হয়? এই প্রশ্নের জবাবটিও ঘূর্ণিঝড় বা দুর্যোগ বিষয়ক সাংবাদিকের জানা খুবই জরুরি। এই প্রশ্নগুলোর জবাব জানা থাকলে তার প্রতিবেদন পরিকল্পনা গ্রহন সহজ হবে। আমরা জানি, ভৌগোলিক কারণে বঙ্গোপসাগর তথা উপকূল এলাকায় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর অনেক বেশি বিস্তৃত থাকলেও কিনারের দিকে এসে সে সংকুচিত হয়ে গেছে। এ কারণে ঝড়গুলো সংকুচিত এলাকার দিকে আসে। কোন ধরণের প্রবাল দ্বীপ না থাকায় ঘূর্ণিঝড় পথে কোথাও বাঁধা পায় না। বিজ্ঞানিরা বলেন, বাংলাদেশের উপক‚লীয় এলাকায় বর্ষার আগে এবং পরে সূর্যের তাপে ভ‚-পৃষ্ঠ উত্তপ্ত হয়, বাতাস গরম ও হালকা হয়ে উপরে উঠে যায়। এরফলে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। এছাড়া উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধ করার মত বনাঞ্চলও নেই।

সতর্কীকরণ সংকেত সম্পর্কে ধারণা রাখুন
ঘূর্ণিঝড়  প্রতিবেদন লেখার জন্য সতর্কীকরণ সংকেত বিষয়ে ধারণা রাখাটা জরুরি। যদিও আমরা জানি, উপকূল ইস্যুতে কাজ করেন, এমন সাংবাদিকগণ সতর্কীকরণ বার্তা ভালো করেই জানেন। কিন্তু এই বার্তা প্রসঙ্গে সাধারণ মানুষের ধারণা কতটা আছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদন লিখতে গেলে আপনার ধারণাটা আরেকটু ঝালাই করে দেওয়া দরকার নয় কী? এক সময় ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ বিষয়ে মানুষের মাঝে ছিল নানান বিভ্রান্তি। সে বিভ্রান্তি এখনও আছে। তবে পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে সহজ করা হয়েছে এ সংকেত পদ্ধতি। কী আছে ১০টি সতর্ক সংকেতে? জেনে নেই।

  • ১নং দূরবর্তী সতর্ক সংকেত ঘোষণা করা হলে বুঝতে হবে জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার পর দুযোগপূর্ণ আবহাওয়ার সম্মুখীন হতে পারে। দূরবর্তী এলাকায় একটি ঝড়ো হাওয়ার অঞ্চল রয়েছে, যেখানে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৬১ কিলোমিটার, যা সামুদ্রিক ঝড়ে পরিণত হতে পারে।
  • ২নং দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত এলে বুঝতে হবে দূরে গভীর সাগরে একটি ঝড় সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২-৮৮ কিলোমিটার। বন্দর এখনই ঝড়ে কবলিত হবে না। তবে বন্দর ত্যাগকারী জাহাজ পথিমধ্যে বিপদে পড়তে পারে।
  • ৩নং স্থানীয় সতর্ক সংকেত প্রচার হলে বুঝতে হবে বন্দর ও বন্দরে নোঙ্গর করা জাহাজগুলো দুর্যোগ কবলিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বন্দরে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে এবং ঘূর্ণি বাতাসের একটানা গতিবেগ ৪০-৫০ কিলোমিটার হতে পারে।
  • ৪নং স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত প্রচারের অর্থ হলো বন্দর ঘূর্ণিঝড় কবলিত। বাতাসের সম্ভাব্য গতিবেগ ঘণ্টায় ৫১-৬১ কিলোমিটার। তবে ঘূর্ণিঝড়ের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়ার মত তেমন বিপদজনক অবস্থায় এখনও আসেনি।
  • ৫নং বিপদ সংকেতের মানে বন্দর ছোট বা মাঝারি তীব্রতার ঝঞ্ঝাবহুল এক সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে নিপতিত। ঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২-৮৮ কিলোমিটার। ঝড়টি বন্দরকে বাম দিক রেখে উপকূল অতিক্রম করতে পারে।
  • ৬নং বিপদ সংকেত ঘোষণা হলে বুঝতে হবে বন্দর ছোট বা মাঝারী তীব্রতার ঝঞ্ঝাবহুল এক সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে নিপতিত। ঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২-৮৮ কিলোমিটার। ঝড়টি বন্দরকে ডান দিক রেখে উপকূল অতিক্রম করতে পারে।
  • ৭নং বিপদ সংকেত এলে বুঝতে হবে বন্দর ছোট বা মাঝারী তীব্রতার ঝঞ্ঝাবহুল এক সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে নিপতিত। ঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২-৮৮ কিমি। ঝড়টি বন্দরের উপর বা নিকট দিয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে।
  • ৮নং মহাবিপদ সংকেতের অর্থ হচ্ছে বন্দর প্রচন্ড বা সর্বোচ্চ তীব্রতার ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়তে পারে। ঝড়ো বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৯ কিলোমিটার বা তার ঊর্ধ্বে হতে পারে। প্রচন্ড ঝড়টি বন্দরকে বাম দিকে রেখে উপকূল অতিক্রম করবে।
  • ৯নং মহাবিপদ সংকেত এলে বুঝতে হবে বন্দর প্রচন্ড বা সর্বোচ্চ তীব্রতার ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়তে পারে। ঝড়ো বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৯ কিলোমিটার বা তার ঊর্ধ্বে হতে পারে। প্রচন্ড ঝড়টি বন্দরকে ডান দিকে রেখে উপকূল অতিক্রম করবে।
  • ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত ঘোষণা হলে বুঝতে হবে বন্দর প্রচন্ড বা সর্বোচ্চ তীব্রতার ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়তে পারে। ঝড়ো বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৯ কিমি বা তার ঊর্ধ্বে হতে পারে। প্রচন্ড ঝড়টি বন্দরের উপর বা নিকট দিয়ে উপকূল অতিক্রম করবে।

ঘূর্ণিঝড়ের তারিখগুলো নোটে রাখুন
ঘূর্ণিঝড় বিষয়ক প্রতিবেদন লেখার জন্য উল্লেখযোগ্য ঘূর্ণিঝড়ের তারিখগুলো মনে রাখা একজন সাংবাদিকের জন্য অত্যন্ত জরুরি। হয়তো বড় ঘূর্ণিঝড়ের তারিখগুলো আপনার জানা আছে। দিবসটি এলে একটি প্রতিবেদনও লিখেন। আগেরদিন হয়তো তাড়াহুড়ো করে একটি ছোট রিপোর্ট দিয়ে দায়িত্ব সারেন। কিন্তু এ বিষয়ে পূর্ব প্রস্তুতি আপনি এটি ভালো তথ্যসমৃদ্ধ প্রতিবেদন নিউজ ম্যানেজমেন্টর কাছে আগেভাগেই জমা দিতে পারেন। এতে আপনার প্রতিবেদনটির ভালো ট্রিটমেন্ট পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। প্রয়োজনে ঘূর্ণিঝড়ের তারিখের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত তথ্যও সংরক্ষণ করে রাখতে পারেন। আগে থেকে প্রস্তুতি থাকলে হাতে সময় নিয়ে মাঠ সরেজমিন করেও ভালো প্রতিবেদন লেখা সম্ভব। উল্লেখযোগ্য কিছু ঘূর্ণিঝড়ের তালিকা নিচে উল্লেখ করা হলো। এরমধ্যে কোন কোনটি উপক‚লে প্রচন্ডভাবে আঘাত হেনেছে। আবার কোনটি শুধুমাত্র ঘূর্ণিঝড়ের মত বিরূপ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তবে ঘূর্ণিঝড় রিপোর্টার হিসাবে তথ্যগুলো আপনার জানা থাকলে বিভিন্ন সময় কাজে লাগতে পারে।

  • ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর প্রচন্ড শক্তি নিয়ে উপকূলে আঘাত করে ভোলা সাইক্লোন।
  • ১৯৮৫ সালের ২৪ মে মাসে একটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে উপকূলের উড়িরচরে।
  • ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়টি বাংলাদেশের পূর্ব উপকূলে প্রচন্ড আঘাত করে।
  • ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর মধ্য ও পশ্চিম উপকূলে আঘাত হানে।
  • ২০০৭ সালের ১৫ মে ঘূর্ণিঝড় আকাশ প্রভাব বিস্তার করে উপকূলে।
  • ২০০৮ সালের ৩ মে ঘূর্ণিঝড় নার্গিস আঘাত হানে উপকূলে।
  • ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা আঘাত করে পশ্চিম উপকূলে।
  • ২০১৩ সালের ১৪ মে ঘূর্ণিঝড় মহাসেন আঘাত করে উপকূলে।
  • ২০১৩ সালের ১০ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় হাইয়ান আঘাত করে উপকূলে।
  • ২০১৪ সালের ৬ অক্টোবর ঘূর্ণিঝড় হুদহুদ উপকূল প্রভাবিত করে।
  • ২০১৪ সালের ২৫ অক্টোবর ঘূর্ণিঝড় নিলোফার আঘাত করে উপকূলে।
  • ২০১৫ সালের ২ আগষ্ট ঘূর্ণিঝড় কোমেনের আঘাতে প্রভাবিত হয় উপকূল।
  • ২০১৫ সালের ৪ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় চপলা প্রভাব বিস্তার করে উপকূলে।
  • ২০১৬ সালের ২১ মে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু আঘাত করে পূর্ব উপকূলে।
  • ২০১৭ সালের ৩০ মে ঘূর্ণিঝড় মোরা আঘাত করে পূর্ব উপকূলের কক্সবাজার-চট্টগ্রাম এলাকায়।
  • ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর ঘূর্ণিঝড় তিতলির প্রভাবে উপকূল প্রভাবিত হয়।

খুঁজুন বিশেষ প্রতিবেদনের আইডিয়া
কয়েকটি ঘটনা বলি। ঘূর্ণিঝড় মোরা আঘাতের আগের দিন আমি কথা বলছিলাম রামগতির দ্বীপ ইউনিয়ন চর আবদুল্যাহ’র চেয়ারম্যানের সঙ্গে। তিনি জানালেন, অনেক কষ্টে আমি সেখান থেকে শ’খানেক মানুষকে এপাড়ে আনতে পেরেছি। দ্বীপে আশ্রয় নেওয়ার মত তেমন কোন ব্যবস্থা না থাকার পরও অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে এপারে আসতে চায়নি। আবার ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর যেখানে আঘাত করেছিল, সেই সাউথখালী এলাকার মানুষেরা কিন্তু ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ বার্তা সম্পর্কে বেশ সচেতন। এই এলাকায় গিয়ে যদি কেউ জিজ্ঞেস করেন, ঘরের নারী-পুরুষেরা এক নি:শ্বাসে বলে দিতে পারেন- কোন সিগন্যালে কী করতে হবে। কিন্তু এখনও সে এলাকার অনেক স্থানে সাইক্লোন শেলটারে যাওয়ার রাস্তাটি ঠিকমত নেই। ঘূর্ণিঝড় সিডরের রাতেই বহু মানুষ সাইক্লোন শেলটারে গিয়ে তালাবদ্ধ পেয়ে সেখানে আর আশ্রয় নিতে পারেনি। আবার অনেক স্থান থেকে খবর পাই- সাইক্লোন শেলটারগুলোর ধারণ ক্ষমতা খুবই কম। এলাকার সব মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারেন না। অন্যদিকে নারী-শিশুদের জন্য সেখানে অবস্থান খুবই কষ্টসাধ্য। পানি ও টয়লেটের ব্যবস্থাও থাকে অপ্রতূল। এইসব বহুবিধ কারণে মানুষ সাইক্লোন শেলটারে যান না। ঘূর্ণিঝড়ের সময় প্রবল জোয়ারের চাপে বাঁধ ভেঙ্গে গ্রামের পর গ্রাম তলিয়ে যাওয়ার চিত্র এবারও চোখে পড়ে। ঘূর্ণিঝড় ভাসায় বহু মানুষের বাড়িঘর। এঅবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই উপকূলের বেড়িবাঁধ কতটা টেকসই, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতিবছর বেড়িবাঁধ হতে দেখি। কিন্তু বাঁধগুলো কেন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না, তা বোধগম্য নয়। স্থানীয় মানুষের দাবি, শক্ত এবং উঁচু বাঁধের। অন্যদিকে উপকূলীয় দ্বীপগুলো কিন্তু সব সময়ই অরক্ষিত থাকে।

একজন সাংবাদিক হিসাবে চোখ বুজে উপরের ঘটনাগুলো দেখুন। প্রতিবেদন লেখার অনেক বিষয় আপনার মাথায় আসবে। যেমন- ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে মানুষের অনাগ্রহের কারণ, সিগন্যাল সম্পর্কে ধারণা সম্পর্কে আপনি অনায়াসে অনুসন্ধান করতে পারেন। দ্বীপ অঞ্চলে আশ্রয়ের ব্যবস্থা না থাকা, মানুষের অসচেতনতা বিষয়ে লিখতে পারেন ভালো প্রতিবেদন। আশ্রয়কেন্দ্রের সঙ্গে লোকালয়ের যাতায়াত ব্যবস্থা কেমন- আপনি এ নিয়ে ভালো প্রতিবেদন লিখতে পারেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর অব্যবস্থাপনা, বেড়িবাঁধ না থাকা, নাজুক বেড়িবাঁধ, আশ্রয়কেন্দ্রে নারী ও শিশুদের অবস্থানের ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা নিয়ে আপনি অনায়াসেই প্রতিবেদন লিখতে পারেন। এভাবে সবক্ষেত্রেই বিশেষ প্রতিবেদনের আইডিয়া খোঁজার প্রবনতা গড়ে তুলুন নিজের ভেতরে।

সঙ্গে রাখুন মাঠের অভিজ্ঞতা
এলাকার পথঘাট চেনা, মানুষের সঙ্গে পরিচয়, তাদের অভিমত নেওয়া খুব জরুরি। এটাই মাঠের অভিজ্ঞতা। ঘূর্ণিঝড় বিষয়ে প্রতিবেদন লেখার জন্য একজন প্রতিবেদকের মাঠের অভিজ্ঞতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। আপনাকে এলাকাগুলো চিনতে হবে। বিভিন্ন সময়ে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবসমূহ বিশ্লেষণ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হবে। আপনি যদি উপক‚ল এলাকার সাংবাদিক হন, কিংবা উপকূল বিষয়ে প্রতিবেদন করেন, তাহলে নিশ্চয়ই আপনাকে বিভিন্ন সময়ে উপক‚লের প্রান্তিক জনপদে যেতে হয়। অন্যান্য কাজের ফাঁকে ঘূর্ণিঝড় বা দুর্যোগে সেখানকার মানুষের লড়াই-সংগ্রামের বিষয়গুলো সম্পর্কেও খোঁজ নিন। এটাই আপনার পরবর্তীতে কাজে লাগবে। ধরুন, কোন দ্বীপ-চরে গিয়ে দেখলেন কোন সাইক্লোন শেলটার নেই, বেড়িবাঁধ নেই। কল্পনা করুন তো একটা বড় বিপদ এলে সেখানকার মানুষেরা কীভাবে জীবন রক্ষা করে। এভাবে আরও অনেক বিষয়ে খোঁজখবর নিতে পারেন। মাঠে না গেলেও অন্তত তথ্যগুলো সংরক্ষণ করুন। দুর্যোগে এলে সেগুলোই হতে পারে আপনার সমৃদ্ধ প্রতিবেদন লেখার প্রধান রসদ। প্রতিবেদন লেখায় এগিয়ে থাকতে পারেন আপনি।

তথ্য ভান্ডার গড়ে তুলুন, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন
ঘূর্ণিঝড় বিষয়ে প্রতিবেদন লেখার জন্য এ বিষয়ে যেখানে যে তথ্য পাওয়া যায়, সংরক্ষণে রাখুন। কারণ কোন তথ্যটি কোন প্রতিবেদনের সঙ্গে কাজে লাগবে, তা আপনি জানেন না। তথ্যগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে না রেখে বিষয়ভিত্তিক ফাইল করুন। ঘূর্ণিঝড়ের প্রাথমিক বার্তা পাওয়ার পর আপনার দায়িত্ব হবে বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। হয়তো আপনার জানা আছে ঘূর্ণিঝড় সাইক্লোন প্রিপারডনেস প্রোগ্রাম, সংক্ষেপে যাকে সিপিপি বলে। এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে গোটা উপক‚লে রয়েছে বৃহৎ স্বেচ্ছাসেবক দল। জেলা থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত এরা কাজ করে। মাঠ পর্যায়ে এদের রয়েছে একটি যোগাযোগ নেটওয়ার্ক। স্বেচ্ছাসেবকসহ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের একটি তালিকা করুন। জরুরি সময়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়। এদের কাছ থেকে আপনি পেতে পারেন তাৎক্ষণিত সব আপডেট। এই বিষয়গুলো আপনার নেটওয়ার্কের আওতায় এলে আপনি হয়ে উঠতে পারেন ঘূর্ণিঝড় বিষয়ে একজন দক্ষ রিপোর্টার।

 * উপকূল সাংবাদিকতা সহায়কপত্রটি কোস্টাল জার্নালিজম নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (সিজেএনবি) ও চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ-এর যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য