উপকূলে ঝুঁকির মৌসুমের জন্য চাই বিশেষ প্রস্তুতি

উপকূলের বিপন্নতা

রফিকুল ইসলাম মন্টু

দুর্যোগের মৌসুম এলে বাড়ি বদলের হিড়িক পড়ে যায় উপকূল জুড়ে। এক ধরণের নিরব আতংক। যেটা চোখে দেখা যায় না। তবে আতংকগ্রস্থ মানুষের ছুঁটাছুঁটি দেখে বিষয়টি সহজেই অনুমান করা যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের তাড়া খেয়ে যুগযুগে গড়ে ওঠা পুরানো বাড়িগুলো সরিয়ে নিতে হয় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। ঝড়-ঝাপটা বিপন্ন-বিধ্বস্ত বহু মানুষ। তবুও নি:স্ব মানুষেরা আবার স্বপ্ন দেখে বাঁচার, ঘর বাঁধার। এখন এমনই এক আতংকের সময়ের মধ্যে রয়েছে উপকূলবাসী। সময়টাকে বলা হয় ডেঞ্জার পিরিয়ড। বহু মানুকে কাঁদিয়ে এ সময়টি বারবার আসে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কতটা প্রস্তুত হতে পারছি ঝুঁকির সময়ের জন্য?

বর্ষপঞ্জির হিসেবে, ১৫ মার্চ থেকে ঝড়ের মৌসুম শুরু হয়ে শেষ হয় ১৫ অক্টোবর। এই সাত মাস বিভিন্ন ধরণের দুর্যোগের মুখোমুখি হয় উপকূলের মানুষ। এই সময়ে বহু দ্বীপ-চর পানিতে ডুবে থাকে। জলোচ্ছ¡াসে ভাসিয়ে নেয় বাড়িঘর। বহু মানুষ গৃহহারা হয়ে বাঁধের পাশে ঠাঁই নেই। ঘূর্ণিঝড়ের সিগন্যাল প্রচারে সরকার যেভাবে তৎপর, নদীভাঙণ ও জলোচ্ছ¡াসের ভয়াবহতা কমাতে সে ধরণের সরকারি উদ্যোগ চোখে পড়ে না। দুর্যোগের সিগন্যাল প্রচারের চেয়েও এটা জরুরি। নদীভাঙণের নিরবে বহু মানুষ সর্বস্ব হারাচ্ছে। পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এই ভয়াবহতা আমরা সেভাবে চোখে দেখি না। বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। স্থানান্তরিত প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

চোখে দেখা বাস্তবের এক ঘটনা বলি। ভর দুপুরে মেঘনাপাড়ের এক বাড়ি থেকে ভেসে আসছিল কান্নার শব্দ। নারী-পুরুষের বুক ফাঁটা আহাজারিতে চারপাশের বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। বাড়ির এক সদস্যকে পরিবার পরিজনসহ বিদায় জানাতে গিয়ে এই কান্না। ভাঙণ তীরে শুণ্য ভিটে পড়ে থাকছে। কোলাহল থেমে গেছে। ক্রমেই নিস্তব্ধ হচ্ছে চারপাশ। বর্ষা আর ঝড়ের মৌসুম সামনে রেখে মেঘনাপাড়ে বাড়ি বদলের হিড়িক পড়েছে। দৃশ্যটা উপকূলীয় জেলা ল²ীপুরের মেঘনা ঘেঁষা উপজেলা কমলনগরের সাহেবেরহাট ইউনিয়নের চরজগবন্ধু গ্রামের। গ্রামের প্রায় ৫০ বছরের পুরানো বাড়িটি এবার ঝড়ের মৌসুমের আগেই মেঘনা তীর থেকে সরাতে হচ্ছে। বাড়ির প্রধান সাত পরিবারের অনেকেই এরইমধ্যে অন্যত্র চলে গেছে। ঐতিহ্যবাহী এই পরিবারের দীর্ঘদিনের বন্ধন ভেঙে যাচ্ছে।

ডেঞ্জার পিরিয়ডের এমন হুদয়বিদারক ঘটনা শুধু এই একটি বাড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চোখে পড়ে বিভিন্ন স্থানের নানান দৃশ্য। কমলনগরের মেঘনাতীরের চর ফলকন, লুধুয়া বাজার, চরজগবন্ধু, কালকিনির মতিরহাটসহ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেল, সামনের বর্ষা আর ঝড়ের মৌসুম সামনে রেখে বহু মানুষ বাড়ি বদল করছেন। কেউ ঘরের চালা-বেড়া অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছেন। কেউবা পুরানো গাছপালা কেটে নিয়ে পানির দরে বিক্রি করে দিচ্ছেন। বাড়ির ভিটে, সান বাঁধানো পুকুর ঘাট, স্বজনের কবরস্থান সবই পড়ে থাকছে ভাঙণ তীরে।

উপকূল অঞ্চলের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সম্পদ হারানো বহু মানুষের কান্না শুনেছি। কানে এসেছে অসহায় মানুষের আর্তনাদ। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাড়ি বদলের এই ঘটনা যে শুধু বিপুল পরিমাণ সম্পদহানি ঘটাচ্ছে তা নয়, এক একটি সম্পশালী পরিবারকে পথে বসিয়ে দিচ্ছে, পারিবারিক বন্ধন ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। কত কান্নার জল ভাঙণ রোধ করতে পারবে, জানেন না ভাঙণতীরের মানুষেরা। দ্রæত সময়ের মধ্যে এলাকা বিলীন হওয়ার কথা ভাবতেও পারেন না বাসিন্দারা। জগবন্ধু গ্রামের লোকজন বলছিলেন  জানালেন, এক সময় এই বাড়ি থেকে মেঘনা নদীর দূরত্ব ছিল প্রায় দশ কিলোমিটার। নিজেদের জমিতে চাষাবাদ করেই জীবিকা নির্বাহ করেছেন তারা। এক বর্ষা আগেও ভাবেননি বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু নিয়তি বাড়ি বদলে বাধ্য করল। প্রতিবছর বর্ষা ও ঝড়ের মৌসুম উপকূলের মানুষের কাছে চরম বিপর্যয় হয়ে আসে। এই মৌসুমকে ঘিরেই বেঁচে থাকার সব প্রস্তুতি চলে। বর্ষা এলেই এই অঞ্চলের মানুষের আতংক বাড়তে থাকে। যারা কোনভাবেই নিজের বাড়িটিতে থাকতে পারছেন না, তারা কেউ শহরে যায়, কেউবা অন্যের বাড়িতে ঠাঁই নেয়। খুব কম সংখ্যক ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ ধারদেনা করে এক টুকরো জমি কিনে আবার ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে।

প্রতিটি মানুষের স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার সঙ্গে ঝুঁকি হ্রাসের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দুর্যোগে বারবার লন্ডভন্ড হলে স্বাভাবিকভাবে বাঁচার কোন সুযোগ থাকে না। তাছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুর্যোগ ঝুঁকি কমিয়ে আনা জরুরি। দুর্যোগে যে শুধু ঘরবাড়ি কিংবা জমিজমা হারিয়ে যায় তা নয়, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যপক ক্ষতি হয়। এই প্রাকৃতিক সম্পদও বহু মানুষের জীবিকার প্রধান মাধ্যম। উপকূলে এই ডেঞ্জার পিরিয়ডে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ¡াস, জলাবদ্ধতা, ভাঙণসহ বিভিন্ন ধরণের দুর্যোগ আসে। পরিসংখ্যান বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই দুর্যোগের মাত্রা আগের চেয়ে বেড়েছে। অন্যান্য মৌসুমে দুর্যোগের তেমন ভয় না থাকলেও ডেঞ্জার পিরিয়ডে উপকূলবাসীকে তাই আতংকেই কাটাতে হয়। নানা ধরণের উদ্যোগ নিয়েও ক্ষতি কমিয়ে আনা কিংবা আতংক নিরসন করা সম্ভব হচ্ছে না। ঠিক দশ-কুড়ি বছর আগে উপকূলের মানুষ যেভাবে আতংকগ্রস্থ ছিলেন এখনও সেভাবেই আছে। তাদের জীবন ততটা নিরাপদ হয়েছে বলে মনে হয় না।

রাষ্ট্রীয় পলিসি, নীতিমালা কিংবা আইনকানুন লেখার সময় প্রান্তিক মানুষের ঝুঁকি হ্রাসের বিষয়গুলো লিপিবদ্ধ করা হয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের কথাও উল্লেখ থাকে। যেমনটা ২০০৫ সালে প্রণীত উপকূলীয় অঞ্চল নীতির কথাই ধরা যাক। ওই নীতির ৪ দশমিক ৩ ধারায় ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এই ধারার কয়েকটি বিষয় এরকম, ক) দারিদ্র্য হ্রাসের জাতীয় কৌশলের অংশ হিসাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংক্রান্ত ঝুঁকি হ্রাসের ওপর গুরুত্ব দেয়া; খ) উপকূলীয় অঞ্চলকে বিবেচনায় এনে সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় সাধন করা; গ) দুর্যোগকালে দরিদ্রদের দুর্যোগ মোকাবেলার ক্ষমতা বাড়ানোর কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহন করা ও তাদের সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য বীমা পদ্ধতি চালু করা; ঘ) নদীভাঙণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করা এবং নদীভাঙা মানুষের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা; ঙ) দুর্যোগকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, বহুমূখী ব্যবহার উপযোগী বাঁধ, কিল্লা, রাস্তাঘাট ও দুর্যোগ সতর্কীকরণ ব্যবস্থার সমন্বয় করা; চ) জলোচ্ছ¡াস মোকাবেলায় প্রাথমিক কার্যক্রম হিসাবে বাঁধগুলোর নিয়মিত রক্ষাবেক্ষণ ও বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী বনায়ন করা ইত্যাদি।

দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে উপকূল অঞ্চল নীতিমালার এই কয়েকটি বিষয়ের দিকে চোখ রাখলেই অনুধাবন করা যায়, কাগজে ঠিকঠাক মানুষের নিরাপদে বসবাসের কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে রয়েছে এর সামান্যই। উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলোর মধ্যে অনেকগুলোই কার্যত নীতিতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। জলোচ্ছ¡াসে বাড়িঘর ভেসে যাওয়ার পর পূনরায় বাড়ি করতে সহায়তার খবর খুব কমই পাওয়া যায়। একইভাবে নদীভাঙণে বাড়িঘর হারানো মানুষের জন্য সহায়তার পরিমাণ সামান্যই। যে বেড়িবাঁধ উপকূলবাসীকে নিরাপত্তা দেয়, সে বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণে বরাদ্দ থাকে না। পক্ষান্তরে গ্রামের পর গ্রাম ভেঙে যাওয়ার পর আসে বরাদ্দ। আবার সে বরাদ্দের কাজ শুরু হতে হতে বিলীন হয় আরও কয়েকগ্রাম। এই হলো আমাদের উপকূলের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যক্রমের চিত্র। সে ক্ষেত্রে প্রতিবছর দুর্যোগ মৌসুম উপকূলবাসীর জন্য আতংক নিয়ে আসবে, এটাই তো স্বাভাবিক।

নতুন কিছু করার প্রয়োজন নেই। নীতিতে যা আছে, আইন যতটা অনুমোদন দিয়েছে, ততটুকুই ততটুকুই করুন। তাতেই উপকূলবাসীর কল্যাণ হবে। অন্তত দুর্যোগ মৌসুমে কান্নার শব্দ খানিকটা হলে কমে আসবে।

//১৯.০৪.২০১৯//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য