‘সমৃদ্ধশালী মডেল ঢালচর গড়তে চাই’ : আবদুস সালাম হাওলাদার

আবদুস সালাম হাওলাদার

আবদুস সালাম হাওলাদার। চরফ্যাসনের ঢালচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। সম্প্রতি উপকূল বাংলাদেশ-এর সাথে কথা বলেছেন দ্বীপের সমস্যা-সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে। বলেছেন দ্বীপকে ঘিরে তার স্বপ্নের কথা। তুলে ধরেছেন এলাকার মানুষের কল্যাণে তার দাবিসমূহ। একটি সমৃদ্ধশালী মডেল ঢালচর গড়ার প্রত্যাশা তার। স্বেপ্ন দেখেন এখান মানুষ ফিরে পাবে খাসজমির অধিকার। নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে দ্বীপবাসীর। সাক্ষাতকারের পূর্ন বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:

আপনার এলাকার প্রধান সমস্যা কি?
আবদুস সালাম হাওলাদার: ঢালচরে সবচেয়ে বড় সমস্যা নদীভাঙণ। এই সমস্যার বিপরীতে এই চরেই রয়েছে কয়েক হাজার একর খাসজমি। এই চরে নেই রাস্তাঘাট, ব্রীজ, কালভার্ট। দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হওয়া সত্বেও এখানে নেই আশ্রয়কেন্দ্র। বিপুল সংখ্যক গবাদিপশু থাকলেও এদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। পর্যাপ্ত পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই। ভূমিহীন-নি:স্ব মানুষের জন্য নেই পর্যাপ্ত আবাসন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতাও ঢালচরের জন্য অন্যতম প্রধান সমস্যা।

সমস্যাগুলো সমাধানে কি কি পদক্ষেপ নিয়েছেন?
আবদুস সালাম হাওলাদার: সমস্যাগুলো সমাধানে বিভিন্ন সময়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন জানানো হয়েছে। সমস্যাগুলো লিখিতভাবে তাদেরকে দেওয়া হয়েছে। এতে সমস্যার বিবরণ ও দাবিসমূহ তুলে ধরা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কিছু সমস্যার সমাধান হয়েছে। যেমন, কিছু সংখ্যক নলকূপ বসানো হয়েছে। একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উত্তীর্ণ করা হয়েছে। কিছু রাস্তাঘাট হয়েছে। কিন্তু আমাদের দাবি অনুযায়ী সব বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

পাঁচ বছরে আপনার ইউনিয়ন কতটা এগিয়েছে?
আবদুস সালাম হাওলাদার: বিগত ৪০ বছরের তূলনায় গত পাঁচ বছরে ঢালচর অনেক এগিয়েছে। বিগত ৪০ বছরে এখানে তেমন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। কিন্তু পাঁচ বছরে এখানে একটি পাকা বাজার হয়েছিল; ইতিমধ্যে সেটি আবার নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। ৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন হয়েছে। এলজিইডি’র একটি ভবন হয়েছিল; সেটিও নদীগর্ভে। বেশকিছু নলক‚প বসেছে। রাস্তা হয়েছিল; তার মধ্যে অনেকখানি ভেঙে গেছে নদীতে। আগের চেয়ে দ্বীপটির দিকে উপর মহলের নজর বেড়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনে ঢালচরে কি ধরণের প্রভাব পড়েছে?
আবদুস সালাম হাওলাদার: গত কয়েক বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়েছে ঢালচরে। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় বলা যায় ক্ষতবিক্ষত সম্ভাবনাময় এই দ্বীপ। গত কয়েক বছরে এখানে দুর্যোগের মাত্রা অস্বাভাবিক বেড়েছে। আগে এতটা দেখা যায়নি। জোয়ারের পানি আগে এতটা বাড়ত না, জলোচ্ছ¡াসের প্রভাব এতটা ছিল না। কিন্তু এখন বর্ষাকাল আসতে না আসতেই জোয়ারের পানিতে বিপন্ন হয়ে পড়ে দ্বীপের জনজীবন। ঘূর্ণিঝড় এই দ্বীপের মানুষ আগে এতটা দেখেনি। মনে হয়, দুর্যোগের সময়কালটা অনেকখানি বেড়ে গেছে। আগে বছরে ২-৪টি নিম্নচাপ হতো, এখন তো বছরে অন্তত ১২-১৪বার নিম্নচাপ হয়। আর এটা জনজীবনে, বিশেষ করে জেলেদের জীবনে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলে। পানিতে লবনাক্ততাও বেড়েছে বলে লক্ষ্য করা যায়। অক্টোবর থেকে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত লবণ পানির প্রভাব থাকে। এক সময় এই দ্বীপের জমিতে কৃষকেরা ইরি ধান আবাদ হতো। কিন্তু এখন ইরি আবাদ তো দূরের কথা; রবিশস্য পর্যন্ত আবাদ করতে পারেন না কৃষকেরা। ফলে বহু জমি পতিত থেকে যায়।

ইউনিয়নের উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনায় প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাচ্ছেন কী?
আবদুস সালাম হাওলাদার: ইউনিয়নের উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া যায় না। হয়তো এটা দ্বীপ বলে কিংবা ভাঙণপ্রবণ এলাকা বলে এখানে কর্তৃপক্ষ বরাদ্দ দিতে চাইছে না। কিন্তু এখানে বরাদ্দ বাড়িয়ে মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা সম্ভব, এখানকার সম্ভাবনার বিকাশ ঘটানো সম্ভব। অন্যান্য ইউনিয়নের ত‚লনায় বরাদ্দের ক্ষেত্রে বৈষম্যও লক্ষ্য করা যায়। যেমন, দ্বীপে মোট ১৮০০ জেলে তালিকাভ‚ক্ত থাকলেও সহায়তা আসে মাত্র ৭০০ জনের জন্য। এভাবেই সব ক্ষেত্রেই বরাদ্দ কম দেয়া হয়।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কতটা রক্ষা করতে পেরেছেন?
আবদুস সালাম হাওলাদার: নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি শতভাগ পূরণ করতে পারিনি। ইতিমধ্যে নলক‚প স্থাপন, রাস্তা নির্মানের মত কিছু কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে আমার সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি ছিল পতিত খাসজমিতে নি:স্ব মানুষের পূনর্বাসন। ঢালচরের দক্ষিণ-পশ্চিমে কয়েক হাজার একর খাস জমি বন বিভাগের আওতায় রয়েছে। সেখানে কোন বন নেই। বনায়নের সুযোগও নেই। ইতিমধ্যে ওই জমির বয়স প্রায় ৫০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। আইনি জটিলতার কারণে বন্দোবস্ত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মাধ্যমে যোগাযোগের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।

ইউনিয়নকে ঘিরে আপনি কি স্বপ্ন দেখেন?
আবদুস সালাম হাওলাদার: এ কথা সকলেই জানেন, গোটা চরফ্যাসন উপজেলার মধ্যে ঢালচর ছিল একটি মডেল দ্বীপ। কিন্তু গত কয়েক বছরে ভাঙণের তীব্রতা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় দ্বীপের সে ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে। বিপুল পরিমাণ পতিত খাসজমি দ্বীপে আশার আলো জ্বেলে রেখেছে। আমিও সেটাই স্বপ্ন দেখি। খাসজমিতে ভূমিহীনদের পুনর্বাসন করা সম্ভব হলে, ভাঙণ প্রতিরোধের জন্য চারদিকে বেড়িবাঁধ দেওয়া হলে ঢালচর আবার সেই হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে। দ্বীপবাসীর জীবনযাপনে ফিরবে নিশ্চয়তা।

স্বপ্ন পূরণের পথে প্রধান বাঁধাসমূহ কি কি?
আবদুস সালাম হাওলাদার: ঢালচরকে ঘিরে আমার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে বহুমূখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দ্বীপের সম্ভাবনার কথা, সমস্যার কথা সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলকে জানানো হয়েছে। কিন্তু দ্বীপের বিচ্ছিন্নতা ও ভাঙণপ্রবণতার কারণে কর্তৃপক্ষের অনীহা আমার সেইসব স্বপ্ন পূরণের পথে প্রধান বাঁধা বলে মনে করি।

ঢালচরের কি কি সম্ভাবনা রয়েছে?
আবদুস সালাম হাওলাদার: যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ঢালচরে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। তারুয়া সৈকতসহ ঢালচরের একাধিক সমুদ্র সৈকত ঘিরে গড়ে উঠতে পারে পর্যটন কেন্দ্র। শুধুমাত্র যোগাযোগ সমস্যার কারণে এখানে পর্যটকেরা অনায়াসে যাতায়াত করতে পারেন না। ঢালচরের দক্ষিণ-পশ্চিমে সমুদ্রের বুকে জেগে উঠছে আরেক বাংলাদেশ। এসব সম্ভাবনা বিকাশের উদ্যোগ নেওয়া হলে গোটা অঞ্চলের চিত্র বদলে যাবে। একইসঙ্গে সম্ভাবনা বিকাশের উদ্যোগ নেওয়া হলে সরকারও এ থেকে পাবে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। এ বিষয়ে এলাকার সাংসদ ও উপমন্ত্রী মহোদয় এবং জেলা-উপজেলা প্রশাসন বরাবরে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

ইউনিয়নকে আরও সমৃদ্ধশালী করতে আপনার প্রস্তাব কি?
আবদুস সালাম হাওলাদার: ঢালচরকে সমৃদ্ধশালী করে গড়ে তুলতে প্রধানত এখানকার পতিত খাসজমি ভূমিহীনদের মধ্যে বরাদ্দ দিতে হবে। এরপর দ্বীপের ভেতর দিয়ে একটি খাল খনন করতে হবে। ঢালচরের চারিদিকে বেড়িবাঁধ দিতে হবে। সেইসঙ্গে মূলভূখন্ডের সঙ্গে ঢালচরের যোগাযোগ ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আর তাহলেই ঢালচর হয়ে উঠবে সমৃদ্ধশালী দ্বীপ।

//প্রতিবেদন/১৩০২২০১৮//


এ বিভাগের আরো খবর...
‘কুকরির জনারণ্যে সম্প্রীতির সুবাতাস’ -আবুল হাসেম মহাজন ‘কুকরির জনারণ্যে সম্প্রীতির সুবাতাস’ -আবুল হাসেম মহাজন
বরগুনায় বাণিজ্যিক সূর্যমুখী চাষে লাভবান কৃষক বরগুনায় বাণিজ্যিক সূর্যমুখী চাষে লাভবান কৃষক
পাইকগাছার পড়ুয়ারাদের প্রকৃতিপাঠ, সবুজে গড়ছে জীবন পাইকগাছার পড়ুয়ারাদের প্রকৃতিপাঠ, সবুজে গড়ছে জীবন
উপকূলের উদীয়মান সংবাদকর্মী ছোটন সাহা’র ছুটে চলার গল্প উপকূলের উদীয়মান সংবাদকর্মী ছোটন সাহা’র ছুটে চলার গল্প
কমলনগরে পড়ুয়াদের সবুজ জগত, অনুপ্রেরণায় ‘সবুজ উপকূল’ কমলনগরে পড়ুয়াদের সবুজ জগত, অনুপ্রেরণায় ‘সবুজ উপকূল’
শ্যামনগরে পড়ুয়ারা গড়ে তুলেছে পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন শ্যামনগরে পড়ুয়ারা গড়ে তুলেছে পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন
জনতার প্রিয় মানুষ এমপি মুকুল জনতার প্রিয় মানুষ এমপি মুকুল
একুশে বইমেলায় সাংবাদিক ছোটন সাহার ‘মেঘের আঁধারে’ একুশে বইমেলায় সাংবাদিক ছোটন সাহার ‘মেঘের আঁধারে’
কুয়াকাটায় জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সাংবাদিক প্রশিক্ষণ সমাপ্ত কুয়াকাটায় জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সাংবাদিক প্রশিক্ষণ সমাপ্ত

‘সমৃদ্ধশালী মডেল ঢালচর গড়তে চাই’ : আবদুস সালাম হাওলাদার
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)