ওরা সুযোগ চায়, আলোকিত মানুষ হতে চায়!

- আব্দুল বারী বাবলু

বেদে শিশু

সুবর্ণচর, নোয়াখালী : পথের ধূলা গায়ে জড়ায়ে অন্যের ঠিকানায় ছাপড়া ঘরের মাটির বিছানায় অন্ধকার মাথায় নিয়ে জন্ম যাদের। বাসস্থান, জীবন জীবিকা, সুশিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বেড়ে ওঠার সার্বিক দিক থেকে বঞ্চিত হয়েই তাদের পথ চলা। একটু সহযোগিতার হাত বাড়ালে ওরাই গড়ে নিতে পারবে ওদের ভবিষ্যৎ। বেঁচে থাকার ভাল পরিবেশ ও সুযোগ পেলে ওরাও হতে পারে আগামীর আলোকিত মানুষ।

যদি সমাজ, সরকার  বা আমাদের দায়িত্ব এদের প্রতি না থাকে তবে সেই অবহেলিত পিছিয়ে পড়া সমাজের মত এরা বরাবরই  বঞ্চিত থেকে যাবে। ওদের বিদ্যালয়ে যাওয়া, দিনশেষে আলো জ্বালিয়ে  বর্ণ পরিচয়ে, ওদের শিতি, যোগ্য মানুষ হিসেবে  গডে ওঠা হবে কিনা- তা  আজো  অনিশ্চয়তার কালো মেঘে ঢাকা। ওরা বেদে পল্লীর চিরবঞ্চিত অবহেলিত শিশু।

প্রায় প্রত্যেকটি ঘরের সামনে মহিলারা  টিনের চুলায় রাতের রান্না বসিয়েছে,কেউ রান্নার আয়োজন করছে। কয়েকজন বসে নানা ধরনের গল্প করছে। পুরুষরা মহিলাদের রান্নার কাজে সহযোগিতা করছে।শিশুরা এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছে। আবার কেউ শিশুদের নিয়ে বানরের খেলা ও সাপ খেলার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। নোয়াখালীর সুবর্ণচর এর চরবাটা ইউনিয়নের ভূঁঞার হাট সংলগ্ন সড়কের পাশে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। এখানে একজন সরদার এর নেতৃত্বে পলিথিন দিয়ে তৈরি ১০/১৫টি ছাপড়া ঘর নিয়ে এক সপ্তাহের জন্য আস্তানা গড়ে একটি বেদের দল।

বেদে পল্লীতে দেখা যায়, ছাপড়া ঘরের সামনে বেদে শিশুরা  মনের আনন্দে ছোটাছুটি করে খেলছে। গোধুলীর সোনালী আলো ওদের স্নান না করা মলিন বিবর্ণ চেহারাকে সযত্নে ঢেকে দিয়ে যেন পরম আদরে খানিকটা সোনালী করে দিয়েছে, দৃশ্যটা মনে রাখার মত। এ দৃশ্য কোন শিল্পীর চোখে পড়লে হয়তো বা  তুলির পরশে একটি মনে মত ছবি বেরিয়ে আসতো। কিন্তু এদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করলে সচেতন যে কোন মানুষেরই হৃদয়কে বিষাদে আচ্ছন্ন করে দেবে। কারণ এদের জীবন অবহেলা ও  বঞ্চনায় চাদরে ঢাকা।

সড়কের পাশে, পতিত জমিতে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খোলা মাঠে তীব্র শীতে, মুষলধারে ঝড় বৃষ্টিতে অথবা উড়িয়ে নেওয়া ঝড়ের মুখে মাঠের ময়লাযুক্ত বিছানায় রাত কাটায় বেদে শিশুরা। এদের নিয়ে নির্বিকার সভ্য সমাজের সবাই।

বেদে পল্লীর মেয়ে শিশুটি বড় হয়ে একদিন তার মায়ের মত শালীনতাহীন ভাবে কালোদৃষ্টির রোগ সারানোর মত অদ্ভূত পেশা গ্রহন করবে। সেখানে ভাল উপার্জন না করতে পেরে হয়ত শহরের ভিড়ে কিশোরী মা হয়ে, কোলে নোংরা খাড়ি ওঠা চুলের একটি বাচ্চাকে নিয়ে অশোভনীয় ভিক্ষা পেশা, না হয় নিষিদ্ধ পল্লীর অন্ধকার পথেই হবে তার ঠিকানা। ছেলেরা বড় হয়ে পান খাওয়া দাঁত আর অপরিচ্ছন্ন শরীর নিয়ে ছাপড়া পাহারা দিবে আর সময় সুযোগ মত সাপ ধরা, বানরের খেলা দেখানো, পুকুরে হারিয়ে যাওয়া স্বর্ণ খোঁজা বা কোন বাজারে পাতা লতার ঔষধ বিক্রির মত প্রতারনামূলক পেশায় নিজেকে ব্যস্ত রাখবে।

বেদে ফারুক এর স্ত্রী জরিনা খাতুন (৩৫) জানালেন, শিঙ্গা দেওয়া, কোমরের ব্যাথা চিকিৎসা ও দাঁতের পোকা সারিয়ে চলে আমাদের জীবনের চাকা। সংসার চালাতে যেখানে আমরা হিমশিম খাচ্ছি , সেখানে শিশুদের জীবনে শিক্ষার আলো জ্বালাবো কীভাবে? তাছাড়া বাড়ি ফেরার কথা যেখানে অজানা সেখানে বিদ্যালয়ের কথা তো ভাবাই যায়না। আমাদের যাযাবর জীবনে শিশুদের শিার কথা ভাবনা তো কালের মহা অভিষাপ।

অপরিচ্ছন্ন পোশাকে ১২ বছরের কিশোরী  সুমি ও ১৩ বছরের কিশোর মামুন জানায়, আমাদেরও ইচ্ছে করে বই হাতে বিদ্যালয়ে যেতে, অন্যদের মত শিক্ষিত হতে। কিন্তু আমাদের জন্মই যে আজন্মের পাপ। অশিক্ষিত হয়ে বড় হওয়া আর ঠিকানা বিহীন পথে অন্যের তাড়া খেয়ে বেড়ানো আমাদের মত হাজার হাজার বেদে শিশু কিশোর  হারিয়ে যাচ্ছে যাযাবর জীবনের অন্ধকার ছায়া পথে।

বেদে বসতি

বেদে সরদার আব্দুল মান্নান ও শেফালী আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, এখন আর সাপ ধরা হয় না গ্রামের মানুষ প্রায় সচেতন। অসচেতন গরীবরা ছাড়া কেউ চিকিৎসা করায় না। আমাদের যাযাবর জীবনের জীবিকা নির্বাহের পৃথিবীটা অনেক ছোট হয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর কথা তো আমরা ভাবতে পারছি না। এমন মানবেতর জীবনের চাকায় পিষ্ট হয়েও আমরা ভিক্ষা চাই না, চায় কাজের বিনিময়ে আমাদের সন্তানদের সামাজিক ভাবে মানুষ করতে।

বেদে মধুমিতা ও চারু বেগম জানায়, আমাদের বেদে দলে ১৫টি পরিবারে ২২জন শিশু রয়েছে। এভাবে সারা দেশে আমাদের বেদে পরিবারে হাজারও শিশু রয়েছে। তারা আক্ষেপ করে বলেন, দেশের সকল শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষার বাধ্যতামূলক হলেও, আমাদের শিশুরা বরাবরের মত বঞ্চিতই রয়ে গেলো। আমাদের শিশুদের আমরা দেশের বোঝা করতে চায় না। জন্মসূত্রে পাওয়া এ পেশা এবং যাযাবর  জীবন আমাদের প্রজন্মকে অভিশাপে পরিনত করেছে।

প্রতিবেদকের সামনে জড়ো হওয়া বেদে পল্লীর বেদেনীরা জানান, থেমে না থাকা সময় আমাদের সাথে বড়ই নিষ্ঠুর আচরণ করছে। পেশা হয়েছে অভিশাপ, প্রজন্ম চলছে ঠিকানা বিহীন অজানা অন্ধকার পথে। আজ আর সাপ খেলা আমাদের শিশুদের বিনোদন দেয় না। আমাদের শিশুরা কম্পিউটারে গেম খেলে, ইন্টারনেটে বিশ্ব ভ্রমন করে। তাই সাপের খেলার ব্যবসা আগের মত জনপ্রিয় নেই।

তারা আরও জানান, এদিকে আইনি বাধায় সাপ ধরা দন্ডনীয় অপরাধ। অপরদিকে আমাদের সন্তানের মত এরাও এদশের সন্তান। আমাদের শিশুরা যখন প্রযুক্তির ছোয়ায় শিক্ষিত আগামীর কথা ভাবছে , তখন এই বেদে শিশুরা তাদের মা বাবার  অভিশপ্ত যাযাবর জীবনের কারনে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা কি তাদের কথা ভাবছি ? তারা শেওলার মত অন্তহীন পথে ভেসে চলছে দিক দিগন্তে।

নোয়াখালী সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো: বেলাল হোসেন জানান, দলিত জনগোষ্ঠী সেবার আওতায় সরকার বেদেদের জন্য সেবামূলক নানা প্রকল্প নিয়েছে। তবে কিছু সেবা আমরা দিচ্ছি। এ অঞ্চলে বেদেদের পরিসংখ্যান জরিপ কাজ হয়েছিল কয়েক বছর আগে। কিন্ত এরা ভাসমান হওয়ায় এদের সঠিক পরিসংখ্যান করা সম্ভব হয়নি। এদের সহযোগিতা করার জন্য আমরা কর্তৃপক্ষোর কাছে সুপারিশমালা প্রেরণ করেছি।

//প্রতিবেদন/১৫০৬২০১৭//


এ বিভাগের আরো খবর...
আলোকযাত্রা ভোলা দলের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ আলোকযাত্রা ভোলা দলের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ
সবুজ উপকূল ২০১৭-এর আয়োজন উপকূলের ২০ স্থানে সবুজ উপকূল ২০১৭-এর আয়োজন উপকূলের ২০ স্থানে
স্থানীয় বিশিষ্টজনদের মূল্যায়নে সবুজ উপকূল কর্মসূচি স্থানীয় বিশিষ্টজনদের মূল্যায়নে সবুজ উপকূল কর্মসূচি
সবুজ উপকূল কর্মসূচি উপকূল জুড়ে সাড়া ফেলেছে সবুজ উপকূল কর্মসূচি উপকূল জুড়ে সাড়া ফেলেছে
শিগগিরই শুরু হচ্ছে সবুজ উপকূল ২০১৭ কর্মসূচি শিগগিরই শুরু হচ্ছে সবুজ উপকূল ২০১৭ কর্মসূচি
১৪ বছরের কিশোরীকে বাল্যবিয়ে থেকে বাঁচালো আলোকযাত্রা মহেশখালী দল ১৪ বছরের কিশোরীকে বাল্যবিয়ে থেকে বাঁচালো আলোকযাত্রা মহেশখালী দল
ঈদ আনন্দে কমলনগর মেঘনা বীচে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় ঈদ আনন্দে কমলনগর মেঘনা বীচে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়
ঈদে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর মতিরহাট মেঘনা বীচ ঈদে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর মতিরহাট মেঘনা বীচ
মনপুরার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মুখে হাসি ফুটালো আলোকযাত্রা দল মনপুরার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মুখে হাসি ফুটালো আলোকযাত্রা দল
পর্যটকের ভিড় বাড়ছে লক্ষ্মীপুরের মতিরহাট মেঘনাতীরে পর্যটকের ভিড় বাড়ছে লক্ষ্মীপুরের মতিরহাট মেঘনাতীরে

ওরা সুযোগ চায়, আলোকিত মানুষ হতে চায়!
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)