বালু উত্তোলন, ৩ হাজার একর ম্যানগ্রোভ বন হুমকিতে

প্রশাসনের নজর নেই, তজুমদ্দিনের মেঘনায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন

- শরীফ-আল আমীন

বালু উত্তোলনের দৃশ্য

তজুমদ্দিন, ভোলা : কেওড়া, আকাশ মণি, সুন্দরী, গোলপাতা ও রেন ট্রিসহ আরো বিভিন্ন ধরনের সবুজ গাছ গাছালির অরণ্য দ্বীপ। আছে প্রায় ৭ শতাধিক হরিণ, বানর, বন্য মহিষসহ বিভিন্ন পশু প্রাণী। সূদুর সাইবেরিয়া থেকেও আসে শীতকালীন অতিথি সাইব্রেরিয়ান হাঁসসহ অনেক পাখি। এমনই সবুজের সমারোহে বনবিভাগ কর্তৃক সৃজিত ৩ হাজার ১০০ একর আয়তনের দ্বীপটি পরিচিত বাসন ভাঙ্গার চর নামে।

ভোলা জেলার তজুমদ্দিন উপজেলার মেঘনা নদীর তীর হতে প্রায় ১ কি.মি. দুরে এ দ্বীপের অবস্থান। কিন্তু দিনের পর দিন ওই চরের ১ হাজার ফুট দুরত্বের মধ্যে তিনটি ড্রেজার দিয়ে অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন করায় হুমকির মুখে পড়েছে এ দ্বীপটি।  ফলে উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন লোকালয়ের বাড়ী-ঘর ও শত শত একর ফসলি জমিও নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।

সরোজমিন এলাকা গুলিতে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার মেঘনানদীর বাসন ভাঙ্গা চরের কোল ঘেষে কিছু অসাধু ব্যক্তি সরকারি কোন অনুমোদন ছাড়াই গত দুই সপ্তাহ ধরে অবৈধ ভাবে ড্রেজার বসিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনফুট বালি উত্তোলন করে তা বিক্রি করছে। তারা অবৈধ ভাবে বালি উত্তোলন করে তা বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করছে অথচ সরকার প্রতিদিন হারাচ্ছে হাজার হাজার টাকার রাজস্ব। এতে করে যেমন সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে তেমনি করে ভয়াবহ রুপ নিচ্ছে সর্বগ্রাসী মেঘনার ভাঙ্গন।

উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের চৌমূহনী, মহেষখালী ও ভুইয়াগ্রাম এলাকায় এসব ড্রেজার বসিয়ে প্রতিদিন ২-৩ লক্ষ ঘনফুট বালি উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব বালি বেড়িবাঁধ ও শহর রক্ষা বাধেঁর সিসি বøক নির্মানকারী প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারের কাছে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে ভোলা শহরের হারুন গাজীর মালিকানাধীন ড্রেজার গাজী ট্রান্সপোর্ট, তার আপন ভাই ফারুক গাজীর ফারুক ট্রান্সপোর্ট ও দুলাল বাবুর মালিকানাধীন ড্রেজার দিয়ে প্রশাসনের কোন অনুমতি ছাড়াই বালি উত্তোলন করছে। এজন্য ড্রেজার মালীকরা লোড-আনলোডের জন্য ২ টি করে মোট ৬ টি ড্রেজার ও ৭ টি জাহাজ বালি আনার কাজে ব্যবহার করছে।

অপরিকল্পিতভাবে এসব বালু তোলায় সবুজ বনায়ণসহ নদী তীরবর্তী বহু লোকের জমিজমা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নদী থেকে বালি উত্তোলন বন্ধের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকার ভুক্তভোগী ও সাধারন মানুষসহ অভিজ্ঞ মহল।

এ ব্যাপারে চৌমুহনী এলাকার মো: আব্দুস সগির নামে একজনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বøক তৈরী করার কাজের নামে যেন বালু উত্তোলনের ধুম পড়েছে। প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত ড্রেজার মেশিন চালিয়ে বালু উত্তোলন করা হয়। আমরা বর্তমানে খুব সমস্যার মধ্যে আছি, এভাবে বালি তুলতে থাকলেতো নদীতে ঘর বাড়ি সব বিলীন হয়ে যাবে।

স্থানীয় প্রেসক্লাব সভাপতি হেলাল সুমন জানান, আমরা দীর্ঘদিনের নদী ভাঙ্গন কবলিত। বালি উত্তোলনের কারনে আমরা ঝুঁকির মধ্যে আছি। আমাদের সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধূরী শাওন ভাই দীর্ঘদিন পরিশ্রম করে নদী ভাঙ্গন ঠেকাতে সাড়ে ৪’শ কোটি টাকা বরাদ্ধ এনেছেন। কিন্তু একটি মহলের সহযোগীতায় বøক নির্মানকারী ঠিকাদারদের নদী কেটে বালি দিচ্ছে। ঠিকাদার সরকারের কাছ থেকে টাকা নিবে কাজ করার জন্য কিন্তু নদী থেকে বালি উত্তোলনের কোন বৈধতা তার নেই। কাজ করার স্বার্থে মাটির দরকার হলে হাজার হাজার মানুষের ঘর বাড়ি নদী ভাঙ্গনের ঝুঁকিতে ফেলে সরকারে উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ করার ষড়যন্ত্র এটা।

জানা যায়, ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন বসিয়ে নদীর মাঝ থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু তোলায় নদীর বিভিন্ন স্থানে গভীর খাদের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকার মানুষ বার বার বালু তোলা বন্ধের দাবি জানালেও তা বন্ধ হয়নি। এ ব্যাপারে বালু উত্তোলনকারী কয়েক জনের সাথে কথা হলে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, আমরা যে বালি উত্তোলন করছি তা শহর রক্ষা বাঁধের বøক নির্মানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করছি। এ ছাড়াও যে টুকু বেশি বালু থাকছে তা বাইরে বিক্রি করছি। সরকারি অনুমোদন আছে কিনা প্রশ্ন করা হলে তারা বলেন, সরকার দলীয় লোকজন ড্রেজার ভাড়া নিয়েছে আবার অনুমোদন কিসের।

এ ব্যাপারে তজুমদ্দিন বনবিভাগের শশীগঞ্জ বিট কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, এভাবে বালি উত্তোলন করা হলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে ভাঙ্গন আরো তীব্রতর হবে। একারনে বনবিভাগের ৩১০০ একর আয়তনের বাসন ভাঙ্গা চরও আগামী বর্ষা মৌসুমে ভাঙ্গন দেখা দিতে পারে। দ্রæত সবুজ এ বনটি রক্ষার জন্য এ দ্বীপের কাছাকাছি হতে বালি উত্তোলন বন্ধ না করলে তা রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

বালি উত্তোলনকারী ড্রেজারের মালিক বাবু দুলাল চন্দ্র’র কাছে বালি উত্তোলনের কোন অনুমোদন আছে কিনা জানতে চাইলে উত্তর না দিয়ে তিনি সরাসরি দেখা করে কথা বলবেন বলে ফোন রেখে দেন। ভোলা শহরের বাসিন্দা অপর ড্রেজার মালিক হারুন গাজী জানান, বালি উত্তোলনের জন্য ভোলা জেলায় কারো অনুমতি নেই। তবে উন্নয়নমুলক কাজের জন্য বালি তুলতে পারবে। ডিসি সাহেবকে দলের নেতারা বলে দিয়েছে। এর বেশি কিছু বলতে পারবোনা।

উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা জালাল উদ্দিন এ বিষয়ে বলেন, নদী থেকে বালি উত্তোলনের সংবাদ কেউ জানায়নি । তবে এখনই আমি খোঁজ নিয়ে দ্রæত ব্যবস্থা নিচ্ছি।

//শরীফ আল-আমীন/প্রতিবেদন/১৪০২২০১৭//


এ বিভাগের আরো খবর...
২৯ এপ্রিল স্মরণ, উপকূল সুরক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংস্কার দাবি ২৯ এপ্রিল স্মরণ, উপকূল সুরক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংস্কার দাবি
ভয়াল ২৯ এপ্রিল, উপকূলে নিয়ে আসে কষ্ট-বেদনা! ভয়াল ২৯ এপ্রিল, উপকূলে নিয়ে আসে কষ্ট-বেদনা!
উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী, রফিকুল ইসলাম মন্টু’র ছবির গল্প উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী, রফিকুল ইসলাম মন্টু’র ছবির গল্প
উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী শেষ || উপকূল সুরক্ষায় নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ বিশিষ্টজনদের উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী শেষ || উপকূল সুরক্ষায় নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ বিশিষ্টজনদের
ঢাকার দৃক গ্যালারিতে ৩ দিনব্যাপী উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনীর সমাপ্তি ঢাকার দৃক গ্যালারিতে ৩ দিনব্যাপী উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনীর সমাপ্তি
ঢাকায় উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে রফিকুল ইসলাম মন্টু’র তোলা ছবি ঢাকায় উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে রফিকুল ইসলাম মন্টু’র তোলা ছবি
দৃক গ্যালারিতে চলছে উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী, আজ শুক্রবার শেষদিন দৃক গ্যালারিতে চলছে উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী, আজ শুক্রবার শেষদিন
উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী || উপকূলে নজর বাড়ানোর দাবি দর্শনার্থীদের উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী || উপকূলে নজর বাড়ানোর দাবি দর্শনার্থীদের
রাজধানীর দৃক গ্যালারিতে ৩ দিনব্যাপী ‘উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী’ শুরু রাজধানীর দৃক গ্যালারিতে ৩ দিনব্যাপী ‘উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী’ শুরু
দৃক গ্যালারিতে ‘উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী’ চলবে শুক্রবার পর্যন্ত দৃক গ্যালারিতে ‘উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী’ চলবে শুক্রবার পর্যন্ত

বালু উত্তোলন, ৩ হাজার একর ম্যানগ্রোভ বন হুমকিতে
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)