বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য খুলনা মহানগরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে

ময়ূরের পানি দূষণের মাত্রা পৌঁছেছে চরমে!

- প্রবীর বিশ্বাস

ময়ূর নদীর দূষণ

খুলনা : খুলনা শহরের অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ময়ূর নদের পানি দূষণের মাত্রা পৌঁছেছে চরমে। পরিবেশ অধিদপ্তরের নমুনা পরীক্ষায় এই নদী দূষণের ভয়াবহ প্রমাণ মিলেছে। বর্তমানে নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ গ্রহণহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে ঢের কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ময়ূরের দূষণের কারণে খুলনা মহানগরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে।

২২ কিলোমিটার দীর্ঘ খুলনা মহানগরীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদটি এক সময়ে এ অঞ্চলের মানুষের সুপেয় পানি ও মাছের অন্যতম আধার ছিল। পাশাপাশি কৃষিতেও ব্যবহার হতো এর পানি। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ন ও বর্জ ব্যবস্থাপনায় দূষিত হয়ে পড়েছে এই নদে পানি। পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার ল্যাব সহকারী আসমা খাতুন জানান, ২০১১ সাল থেকে তাঁরা যখন ময়ূর নদে পানির নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা শুরু করেন তখন এই পানিতে দ্রবীভুত অক্সিজেনের মাত্রা প্রতিলিটারে ৪ মিলিগ্রাম পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে এই মাত্রা গড়ে ২ মিলিগ্রামের কম থাকছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার সিনিয়র কেমিস্ট মোঃ কামরুজ্জামান সরকার জানান, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ অনুযায়ী মাছসহ জলপ্রাণী বেঁচে থাকা ও কৃষি কাজে ব্যবহারের জন্য পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন সর্বনি¤œ প্রতিলিটারে ৫ মিলি গ্রাম থাকা প্রয়োজন। কিন্তু গতবছরের জানুয়ারিতে ময়ূরের পানিতে দ্রবীভুত অক্সিজেনের মাত্রা ছিল মাত্র ১.১, ফেব্রæয়ারিতে যা ছিল ১.৩। মার্চ মাসে কমে আসে ০.৫ মিলিগ্রাম প্রতি লিটারে। মে, জুন ও জুলাই মাসের চিত্র আরও ভয়াবহ; এসময় ছিল যথাক্রমে ০.৭, ০.৮ ও ০.৮। বৃষ্টির সময় অর্থাৎ জুলাই থেকে অক্টোবরে মাত্রা কিছুটা বাড়লেও তা জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়। এই সময়ে যাথাক্রমে ২.১, ২.৫, ২.৮ ও ২.৯ মিলিগ্রাম পাওয়া যায়। এভাবে সারা বছরই ময়ূর নদীর পানিতে দ্রবীভুত অক্সিজেনের মাত্র কম থাকায় এই নদীটি মারত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে জানান তিনি। তাই এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে বায়োলজিক্যালি অর্থাৎ বৈজ্ঞিানিক ভাবে এই নদ মৃত হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁর।

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সহকারী অধ্যাপক তুষার কান্তি রায় ময়ূর নদ নিয়ে দীর্ঘ দিন গবেষণা করছেন। তিনি জানান, ময়ূর নদের পানির স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বর্তমানে নেই। রূপসা নদীর সাথে সংযোগ স্থলে স্লুইস গেট নির্মাণ করে তা রক্ষণাবেক্ষণ না করায় বর্তমানে ময়ূর একটি বদ্ধ জলাধারে পরিণত হয়েছে। এর ফরে এই পানিতে দূষণের মাত্রা দিন দিন আরও বাড়ছে। পাশাপাশি দখলদারদের কারণে এই নদ প্রতিনিয়ত তার পরিবেশগত দিকটিও হারাচ্ছে।

তিনি আরও জানান, তাঁদের গবেষণা অনুয়ায়ী আরএস খতিয়ানে নদ যে এলাকা ছিল সেখান থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত নদ দখল হয়েছে ৫ দশমিক ১২ শতাংশ, ২০০৪ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত আরও ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ জমি দখলদারদরে কবলে চলে গেছে। আর ২০১০ থেকে ২০১৪ এই চার বছরে নদ তার সর্বশেষ আয়তনের ৪ দশমিক ১৭ শতাংশ হারিয়েছে। এসব কারণে ময়ূর নদ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে আগামীতে নগরীর জলাবদ্ধতা আরও বৃদ্ধিসহ নানা অসুবিধায় পড়বে নগরবাসী।

পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার পরিচালক ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেন জানান, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ২৬টি ড্রেন থেকে বর্জ্যমিশ্রিত পানি প্রতিনিয়ত পড়ছে ময়ূর নদে, যার ফলে এই মারত্মক দূষণের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ বিষয়ে অসচেতনতা, অপর্যাপ্ত পানি প্রবাহসহ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ঐতিহ্যবাহী এই নদীটি বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও তুরাগের মতো দূষণের পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনার গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট পাওয়ার পর পরিবেশ মন্ত্রনালয় এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গত ১৮ আগস্ট ময়ূর নদ দূষণ রোধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। ড. সুলতানা আহমেদ স্বাক্ষরিত মন্ত্রনালয়ের ঐ পত্রে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পরিবেশ মন্ত্রনালয়সহ খুলনা সিটি কর্পোরেশনরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

এবিষয়ে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের চীফ প্লানিং অফিসার আবীর উল জব্বার বলেন, ময়ূর নদ দূষণ রোধ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে ৮’শ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৭ সাল থেকে ৫ বছর মেয়াদী একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। যা বাস্তবায়ন হলে দূষণ মুক্ত হবে ময়ূর নদ এমন পত্যাশা তাঁর।

//প্রবীর বিশ্বাস/১৪০২২০১৭//


এ বিভাগের আরো খবর...
তৃতীয়বারের মত ডিআরইউ অ্যাওয়ার্ড পেলেন রফিকুল ইসলাম মন্টু তৃতীয়বারের মত ডিআরইউ অ্যাওয়ার্ড পেলেন রফিকুল ইসলাম মন্টু
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় ‘সবুজ উপকূল’ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় ‘সবুজ উপকূল’
সবুজ উপকূল, সাগরপাড়ে আলোর হাতছানি সবুজ উপকূল, সাগরপাড়ে আলোর হাতছানি
‘সবুজ উপকূল’ পড়ুয়াদের সৃজনশীল মেধার বিকাশ ঘটাচ্ছে ‘সবুজ উপকূল’ পড়ুয়াদের সৃজনশীল মেধার বিকাশ ঘটাচ্ছে
‘সবুজ উপকূল’-এর পথে হাঁটছে অসংখ্য সবুজযোদ্ধা ‘সবুজ উপকূল’-এর পথে হাঁটছে অসংখ্য সবুজযোদ্ধা
উপকূল বাঁচিয়ে রাখতে ‘সবুজ উপকূল’ মাইলফলক উপকূল বাঁচিয়ে রাখতে ‘সবুজ উপকূল’ মাইলফলক
উপকূলের তরুণদের প্রকাশের আলোয় আনছে ‘সবুজ উপকূল’ উপকূলের তরুণদের প্রকাশের আলোয় আনছে ‘সবুজ উপকূল’
সবুজ উপকূল, জেগে উঠছে আগামী প্রজন্ম সবুজ উপকূল, জেগে উঠছে আগামী প্রজন্ম
লক্ষ্মীপুরে সকল শিক্ষাঙ্গনে লাইব্রেরি গড়ে তোলার দাবি লক্ষ্মীপুরে সকল শিক্ষাঙ্গনে লাইব্রেরি গড়ে তোলার দাবি
আসুন, ১২ নভেম্বর ‘উপকূল দিবস’ পালন করি আসুন, ১২ নভেম্বর ‘উপকূল দিবস’ পালন করি

ময়ূরের পানি দূষণের মাত্রা পৌঁছেছে চরমে!
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)