কলাপাড়ায় দুর্যোগ ঝুঁকি কমেছে ৮০ ভাগ

নতুন সাইক্লোন শেলটার

কলাপাড়া, পটুয়াখালী : ষাটোর্ধ শাহজাহান মিয়ার বাড়ি বড় বালিয়াতলী গ্রামে। ২০০৭ সালের প্রকৃতির বুলডোজার খ্যাত সুপার সাইক্লোন সিডরের কথা আজও এ মানুষটি ভুলতে পারেন নি। আশ্রয়কেন্দ্র অনেক দুরে থাকায় সবাইকে নিয়ে চরম ঝুঁকি নিয়ে এ মানুষটি বাড়ির দেড় তলা টিনশেড ঘরটিতেই ছিলেন। কোনমতে রক্ষা পেয়েছেন। তবে ঘরটি কাঁত হয়ে যায়। এ মানুষটি এখন ঘুর্ণিঝড়কালীন আশ্রয় নিয়ে দুশ্চিন্তামুক্ত। পাঁচ মিনিটের পথ পেরিয়ে যেতে পারেন এমন কাছে দুটি বহুতল আধুনিক বহুমুখি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কাম আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে।

বড়বালিয়াতলী গ্রাম ছাড়াও আশপাশের অন্তত তিন হাজার মানুষ আশ্রয় নেয়ার সুযোগ রয়েছে। একই মন্তব্য লেমুপাড়া আদর্শ গ্রামের নুর আলমের। সিডরে প্রায় দেড় কিলোমিটার দুরে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছে। লালুয়ার দূর্যোগ ঝুঁকিতে বাস করা গ্রামের মানুষ বানতিপাড়ায় সিডর আইলায় যাদের ভাসতে হয়েছে জলোচ্ছ্বাসে। অস্বাভাবিক জোয়ার যাদের নিত্য দূর্যোগে পরিণত হয়েছে। সিডরে এসব মানুষ হারিয়েছে কয়েকটি তরতাজা প্রাণ। তাদের এলাকায় নির্মিত হয়েছে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক বহুমুখি ব্যবহারের আশ্রয় কেন্দ্র। যেটিতে পরিচালিত হচ্ছে একটি মাদ্রাসা শিক্ষার কার্যক্রম।

এলাকার শিক্ষানুরাগী মিয়া মোহাম্মদ চান খান জানান, তাদের এলাকার মানুষ এখন দুর্যোগকালীন ঝুঁকি থেকে মুক্ত। ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কালীনাথ হালদার জানালেন, সিডরের সময় কোন আশ্রয় কেন্দ্র না থাকায় তিনিসহ এখানকার তিনটি গ্রামের মানুষ চরম ঝুঁকি নিয়ে বাড়িঘরে অবস্থান করেন। তার ঘরটিও বিধ্বস্ত হয়েছিল। এখন বহুতল একটি আধুনিক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। যেখানে স্বাচ্ছন্দে শিশু শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া করছে।

এছাড়া ইসলামপুর, নেয়ামতপুর, ছলিমপুরের মানুষ দূর্যোগকালে নিরাপদ আশ্রয় নেয়ার সুযোগ পেয়েছে। গৈয়াতলা গ্রাম সংলগ্ন বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয়ে জলোচ্ছাসে দুই শিশুর প্রানহানি ঘটেছিল সেখানে। নীলগঞ্জ ইউনিয়নে তখন মোট আট জনের প্রানহানি ঘটে। সিডরের তান্ডবে মানুষ চরম বিপদশঙ্কুল পরিস্থিতির শিকার হয়েছিল। তখন কোন আশ্রয় কেন্দ্র ছিল না। বর্তমানে সেখানে দক্ষিণ গৈয়াতলা স্কুল কাম বহুমুখি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়েছে।

এভাবে চাকামইয়ার কাছিমখালী গ্রামে একটি বহুতল আধুনিক আশ্রয়কেন্দ্র করা হয়েছে। চরচাপলী গ্রামটিতে সবচেয়ে ঘনবসতি মানুষের বসবাস। সাগরের কোলঘেষে গ্রামটি। এখানকার একটিমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন ছিল। ছিল জরাজীর্ণ একটি আশ্রয়কেন্দ্র। সিডরে সেখানকার তিনজন মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ আশ্রয়ের সংকুলান হতো না। বর্তমানে একটি আধুনিক সাইক্লোন শেল্টার করেছে এলজিইডি বিভাগ। মোট কথা সিডরের সময়ে এ জনপদের মোট জনসংখ্যার এক পঞ্চমাংশ মানুষও নিরাপদে আশ্রয় নেয়ার মতো কোন সুযোগ ছিল না। ভয়াল ওই সিডর কলাপাড়ার ৯৪ জন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। এখনও নিখোঁজ রয়েছে সাত জেলে। সরকারি উপজেলা প্রশাসনের সক্ষমতা ছিলনা সকল মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থানের সুযোগ সৃষ্টির।

কিন্তু সিডর পরবর্তী সময় সাগরপারের দূর্যোগের গ্রাসে থাকা জনপদে সরকারিভাবে এবং বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা দূর্যোগকালীণ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মানের কাজ শুরু করে।

বিভিন্ন তথ্যসুত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিইডি) কলাপাড়ায় ১২ টি স্কুলকাম আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ সম্পন্ন করেছে। আরও পাঁচটির নির্মান কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া আরও নয়টি নির্মাণের পরিকল্পনা চুড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দূর্যোগ ও ত্রাণ মন্তনালয় দুইটি আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ সম্পন্ন করেছে। আরও তিনটির কাজ চলমান রয়েছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর ১০টি স্কুল, পাঁচটি মাদ্রসা ও তিনটি কলেজ কাম আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করেছে।

নতুন সাইক্লোন শেলটার

এছাড়া বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সেভ দি চিলড্রেন একটি নতুন আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। মেরামত করেছে ১১টি। আমেরিকান নৌবাহিনী করেছে তিনটি। কারিতাস নির্মাণ করেছে আধুনিক  বহুমুখি সুবিধা সংবলিত আটটি আশ্রয় কেন্দ্র। যেখানে একেকটিতে দুই সহস্রাধিক মানুষ দূর্যোগকালে আশ্রয় নেয়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়ও ফায়েল খায়ের প্রতিষ্ঠান তিনটি এবং হীড বাংলাদেশ একাধিক আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। মোট কথা কলাপাড়ায় অন্তত ৬০টি নতুন আশ্রয় কেন্দ্র সিডরের পরে নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মানাধীন রয়েছে আরও আটটি। পরিকল্পনা চুড়ান্ত রয়েছে অন্তত আরও ১০টির।

এছাড়াও পর্যটন এলাকা কুয়াকাটায় আধুনিক মানের বিভিন্ন পর্যায়ের অর্ধশত বহুতল স্থাপনা রয়েছে। যেখানে দূর্যোগকালে মানুষ আশ্রয়ের সুযোগ পাচ্ছে। রয়েছে সরকারি বেসরকারি অফিস ভবন। পাকা-আধা পাকা বাড়িঘর। মোট কথা কলাপাড়ার প্রায় তিন লাখ মানুষের অর্ধেক জনগোষ্ঠী এখন দূর্যোগকালে নিরাপদে আশ্রয় নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণের ফলে।

সাগরপাড়ের এই জনপদে সিডরকালের পরিস্যংখ্যান মতে মাত্র ৫০ হাজার ২০০ মানুষ আশ্রয় নেয়ার সুযোগ ছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কাম আশ্রয় কেন্দ্র ছিল ৮০টি। এর মধ্যে ১৭টি ছিল ব্যবহার অনুপযোগী। সাবেক প্রতিমন্ত্রী স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ মাহবুবুর রহমান জানান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় কলাপাড়ার উপকূলে পর্যাপ্ত সংখ্যক আশ্রয় কেন্দ্র করা হচ্ছে। দূর্যোগকালে একটি মানুষও যেন নিরাপদ আশ্রয়ের বাইরে না থাকে এমন পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এসব স্থাপনা বহুমুখি সুবিধা সংবলিত করা হচ্ছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবিএম সাদিকুর রহমান জানান, কলাপাড়ায় ইতোমধ্যে ৬০টিরও বেশি আশ্রয় কেন্দ্র সিডর পরবর্তী সময় নির্মাণ করা হয়েছে। আরও প্রয়োজনীয় সংখ্যক আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। সকল মানুষকে দূর্যোগঝুকি থেকে নিরাপদ আশ্রয় দেয়ার সরকারি উদ্যোগ রয়েছে। তবে এখন অন্তত এক শ’ আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা প্রয়োজন বলে বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যানগণ জানিয়েছেন।

চম্পাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রিন্টু তালুকদার জানান, তার ইউনিয়নে এখন অন্তত ১০টি আশ্রয় কেন্দ্র জরুরি ভিত্তিতে নির্মাণ করা প্রয়োজন। দূর্যোগে মানুষকে ঝুকিমুক্ত  রাখতে সচেতনতার কাজ করছেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড কনসার্নের উপজেলা সমন্বয়কারী জেমস রাজীব বিশ্বাস। তিনি জানান, দূর্যোগকালীন করনীয় বিষয়ে তারা সিডর পরবর্তী অন্তত ৩০০২ জন নারী-পুরুষকে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। সর্বোপরি দূর্যোগ ঝুঁকি থেকে সাগরপাড়ের মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখতে এখন কলাপাড়া অনেক এগিয়ে।

উপজেলা রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির সহকারী পরিচালক মোঃ আসাদুজ্জামান জানান, সিডর পরবর্তী সময় কলাপাড়ায় যে পরিমাণ আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে, তাতে কলাপাড়ার অন্তত অর্ধেক জনগোষ্ঠী অনায়াসে নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারবে। এছাড়া বাকিসব মানুষকেও ব্যক্তিগত স্থাপনাসহ সরকারি বেসরকারি অফিস ভবনে দূর্যোগ কালীন আশ্রয় নেয়ার সুযোগ রয়েছে।

//প্রতিবেদন/উপকূল বাংলাদেশ/০৭১১২০১৬//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য