সমুদ্রনির্ভর অর্থনীতি ডানা মেলছে

- হাসান আল জাভেদ

ব্লু ইকোনমি প্রতীকি চিত্র

ঢাকা : ব্লু-ইকোনমি বা নীল অর্থনীতি হচ্ছে সমুদ্র সম্পদনির্ভর অর্থনীতির বিপ্লব। এ বিপ্লব বাস্তবায়নের পথে বাংলাদেশ। বিশাল সমুদ্র জয়ের পর এবার দুয়ার খুলছে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে আগুয়ান হওয়ার। আসছে ২০১৭ সালের মার্চের প্রথম সপ্তায় ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠেয় ‘ইন্ডিয়ান ওশন রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ)’ সম্মেলনের মধ্যে বাংলাদেশ সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির বৈপ্লবিক যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। ভারত মহাসাগর তীরবর্তী ‘আইওআরএ’-র সদস্য ২১টি দেশের সরকার/রাষ্ট্রপ্রধানরা সম্মেলনে উপস্থিত থাকার কথা। পররাষ্ট্র ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়ায় বাংলাদেশ এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র অঞ্চল, ২০০ নটিক্যাল মাইলের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কর্তৃত্ব পায়। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠারও অধিকার পায়। বিশাল এই সমুদ্রসীমাকে ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির চাকা বদলে দিতে বদ্ধপরিকর বাংলাদেশ সরকার।

মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ভারত মহাসাগর তীরবর্তী আইওআরএভুক্ত ২১টি দেশই ব্লু ইকোনমি বা সমুদ্রনির্ভর অর্থনৈতিক বিপ্লবে আগ্রহী। এজন্য ‘আইওআরএ’ সদস্যভিত্তিক দেশগুলো প্রথমত গভীর সমুদ্রের বদলে ভারত মহাসাগরের তীর ঘেঁষে কন্টেইনার বা মালবাহী আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে ‘কোস্টাল শিপিং’ চালুতে উদ্যোগী হয়ে উঠেছে। সদস্য দেশগুলো ঐকমত্য হলে এতে জাহাজের জ্বালানি ব্যয় অনেকখানি কমে আসবে, বাঁচবে সময়ও। বাংলাদেশসহ ভারত মহাসাগর তীরবর্তী ২ বিলিয়ন জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থাটির সদস্যভুক্ত দেশগুলো আসন্ন ওই সম্মেলন নিয়ে সম্ভাব্য এ চুক্তি সম্পর্কিত খসড়া তৈরি করেছে। এ নিয়ে ইতিপূর্বে জাতিসংঘেও আলোচনা করেছে বাংলাদেশ। আলোচনা হয়েছে, ‘বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি বিয়নড এরিয়াস অব ন্যাশনাল জুরিডিকশন (বিবিএনজে)’ শীর্ষক সংস্থার সঙ্গেও।

চুক্তি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কোস্টাল শিপিং ছাড়াও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সদস্যভুক্ত এই সংস্থাটির মাধ্যমে গভীর মহাসাগরের নিরপেক্ষ এলাকা নিয়েও আলোচনা হবে মার্চের সম্মেলনে। কারণ বাংলাদেশসহ অন্যান্য উপকূলীয় দেশগুলো মহাসাগরের নির্দিষ্ট সীমারেখার মালিকানা পেয়েছে। এর বাইরে গভীর সমুদ্রের বড় একটা অংশই দেশ-নিরপেক্ষ বা মালিকানাবিহীন। সমতার ভিত্তিতে গভীর ওই সমুদ্রেও ন্যায্য হিস্যা পেতে আগ্রহী সদস্যভুক্ত প্রতিটি দেশ। এতে করে ওই অঞ্চলের মাধ্যমে অর্থনীতিতে অবদানই শুধু নয়, তৃতীয় কোনো ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকবে না ওই বিশাল অঞ্চলে।

সূত্র বলছে, গভীর সমুদ্রের ন্যায্য অধিকার পেলে বেশি লাভবান হবে বাংলাদেশ। এতে সমুদ্রভিত্তিক ব্লকের (খনিজসম্পদ) সংখ্যা বাড়বে; টহল জোরদারের মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকবে নিরাপত্তা; মৎস্য আহরণের বিপুল সম্ভাবনাও থাকবে। বিশেষ করে, সারা বিশ্বে টুনা মাছ খুবই জনপ্রিয়। সুস্বাদু ও দামি এই মাছটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মানের হোটেলগুলোতে আমদানি করা হয়ে থাকে। টুনা মাছের বিচরণ গভীর সমুদ্রে। আর মালিকানা পেলে বাংলাদেশের ফিশিং ট্রলার গভীর সমুদ্রে টুনাসহ অন্যান্য মাছ আহরণ করতে পারবে।

মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রতি বছর বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় গড়ে এক হাজার হেক্টর করে ভূখ- বাড়ছে। ব্লু ইকোনমি রূপরেখা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সমুদ্রে ভূখ- (ডেল্টা প্ল্যান) আরও বাড়ানো সম্ভব। কৃত্রিমভাবে বাঁধ তৈরি করে পলিমাটি জমাট/ চর জাগানোর মাধ্যমে সৃষ্ট ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূখ-ে মালদ্বীপের মতো দৃষ্টিননন্দন পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলাও সম্ভব। এতে দেশের অর্থনীতি বহুমাত্রিকতা পাবে।

জানা গেছে, সম্মেলনে সমুদ্রসীমায় পেট্রোলিয়াম শেয়ারিং কনট্রাক্টের (পিএসসি) মাধ্যমে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তর আলোচনা হবে।

ইন্ডিয়ান ওশন রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) সদস্যভুক্ত দেশগুলো হচ্ছেÑ বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, কমোরোস, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, কেনিয়া, মালয়েশিয়া, মোজাম্বিক, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ইয়েমেন, ভারত, সিসিলি, সোমালিয়া, মাদাগাস্কার, মৌরিতাশ, ওমান, দক্ষিণ আফ্রিকা, তানজানিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

এদিকে সাগরকেন্দ্রিক অর্থনীতি চাঙা করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে গত আগস্টে চুক্তি করেছে সরকার। জানা গেছে, এ চুক্তির মাধ্যমে ইইউর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের বিস্তৃত সমুদ্র সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে চায় সরকার। এ চুক্তির আওতায় আগামী দুই বছর সমুদ্র অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ গবেষণা করবে সমুদ্র গবেষণায় দক্ষ ইইউ। এরপর এ সম্পদ কীভাবে ব্যবহার করা যায় সে বিষয়ে সরকারের কাছে সুপারিশমালা তুলে ধরা হবে।

এ গবেষণায় ইতোমধ্যেই একজন ফরাসি ও একজন বাংলাদেশি গবেষক কাজ শুরু করেছেন এবং সরকার তাদের সব রকম সহযোগিতা করছে বলেও তিনি জানান।

এ ছাড়া সমুদ্রসম্পদ আহরণ ও সমুদ্রসীমার ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভারত ও চিনের সঙ্গে পৃথক সমঝোতা স্মারকে স্বার করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে গত বছর জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় দিল্লির সঙ্গে এবং চলতি অক্টোবরে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফরের সময় চিনের সঙ্গে সমুদ্র সম্পদবিষয়ক সহযোগিতার জন্য পৃথক সমঝোতা স্মারকগুলো স্বারিত হয়।

//দৈনিক আমাদের সময়ের সৌজন্যে//০১১১২০১৬//


এ বিভাগের আরো খবর...
২৯ এপ্রিল স্মরণ, উপকূল সুরক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংস্কার দাবি ২৯ এপ্রিল স্মরণ, উপকূল সুরক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংস্কার দাবি
ভয়াল ২৯ এপ্রিল, উপকূলে নিয়ে আসে কষ্ট-বেদনা! ভয়াল ২৯ এপ্রিল, উপকূলে নিয়ে আসে কষ্ট-বেদনা!
উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী, রফিকুল ইসলাম মন্টু’র ছবির গল্প উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী, রফিকুল ইসলাম মন্টু’র ছবির গল্প
উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী শেষ || উপকূল সুরক্ষায় নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ বিশিষ্টজনদের উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী শেষ || উপকূল সুরক্ষায় নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ বিশিষ্টজনদের
ঢাকার দৃক গ্যালারিতে ৩ দিনব্যাপী উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনীর সমাপ্তি ঢাকার দৃক গ্যালারিতে ৩ দিনব্যাপী উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনীর সমাপ্তি
ঢাকায় উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে রফিকুল ইসলাম মন্টু’র তোলা ছবি ঢাকায় উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে রফিকুল ইসলাম মন্টু’র তোলা ছবি
দৃক গ্যালারিতে চলছে উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী, আজ শুক্রবার শেষদিন দৃক গ্যালারিতে চলছে উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী, আজ শুক্রবার শেষদিন
উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী || উপকূলে নজর বাড়ানোর দাবি দর্শনার্থীদের উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী || উপকূলে নজর বাড়ানোর দাবি দর্শনার্থীদের
রাজধানীর দৃক গ্যালারিতে ৩ দিনব্যাপী ‘উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী’ শুরু রাজধানীর দৃক গ্যালারিতে ৩ দিনব্যাপী ‘উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী’ শুরু
দৃক গ্যালারিতে ‘উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী’ চলবে শুক্রবার পর্যন্ত দৃক গ্যালারিতে ‘উপকূল আলোকচিত্র প্রদর্শনী’ চলবে শুক্রবার পর্যন্ত

সমুদ্রনির্ভর অর্থনীতি ডানা মেলছে
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)