সমুদ্রপাড়ে খাল বিলীন, কৃষিকাজে বিপর্যয়!

- মেজবাহউদ্দিন মাননু

চাষাবাদের খালগুলো আর সচল থাকছে না

কলাপাড়া, পটুয়াখালী : স্থানীয় কৃষকদের ভাষায় নামটি কাছারির খাল। এখন পানিতে টই-টুম্বুর। খালটিতে শাপলা ফুটে বিচিত্র রুপ নিয়েছে। আশপাশের অন্তত পাঁচ বর্গ কিলোমিটার এলাকার কৃষি জমির পানি ওঠা-নামা করে খালটি দিয়ে। শুকনো মৌসুমেও পানি থাকে। ধুলাসার ইউনিয়নের চাপলী বাজারের একটু পাশেই এ খালটির অবস্থান। খালটির শেষ দিকে বাঁধঘেষা কয়েকটি বসতিও রয়েছে। তাদের দাবি ১৯৮০ সালে তারা খালেরপাড়ে বসতি গেড়েছেন। পুরনো নারিকেল গাছ রয়েছে। আর তখন খালটির গভীরতা ছিল অন্তত কুড়ি ফুট। অথচ ১৯৮৪ সালের দিকে ওই খালকে চাষযোগ্য কৃষিজমি দেখিয়ে ভূমি অফিস ১৩ জনকে বন্দোবস্ত দিয়েছে। তারা এতোদিন ঘাপটি মেরে ছিলেন। ২০১৪ সালের শেষদিকে খালটি দখল করে বাড়িঘর ও পুকুর করা হয়েছে। সেখানকার জামাল শিকদার, শহীদ শিকদার খাল দখল করে এসব করছেন। তবে বন্দোবস্তের মূল মালিক তাদের বাবা মোসলেম শিকদার। এমনকি খালের শেষাংশে বসবাস করা একটি পরিবারকে উচ্ছেদের জন্য তারা হুমকিও দিয়ে আসছে। এখালটি দখলের কারণে দুই পাড়ের জমির মালিক ও প্রান্তিক চাষীরা চরম উৎকন্ঠায় পড়েছেন চাষাবাদ নিয়ে।

লালুয়া ইউনিয়নের মনিরগুঠিয়া গ্রামের নিমলার খালটি দখল করে বাঁধ দিয়ে করা হয়েছে মাছের ঘের। স্থানীয়রা জানালেন, ৬৪৮ ও ৭০১ দাগের অংশ দখল চলছে এভাবে। আলেফ মৃধার নেতুত্বে সেলিম ফকির, ইয়াসিন ফকির, আনছারগং খালটি দখল করেছে। মিঠাগঞ্জের তেগাছিয়া বাজারের স্কুলের পাশের খালটিতে অন্তত ৩০টি বাঁধ দেয়া হয়েছে। একই দৃশ্য আজিমউদ্দিন-চরপাড়া স্লুইস খালের। এখালের আবার মানুষের বসতবাড়ি মিলিয়ে ছত্তার বয়াতী নামে একজনকে চাষযোগ্য জমি দেখিয়ে বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছে। গ্রামটির শতাধিক মানুষ এ অবৈধ দখলকাজ বন্ধে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু ভুমি অফিসের কানুনগো সেখানে যেতে পারেন নি। অন্তত দেড় বছর আগের অভিযোগ ছিল এটি। ময়ুরের খালটি তো যে যার মতো দখল করে নিয়েছে। আবগঞ্জের খালের দৃশ্য ওই। চরপাড়ার স্লুইস খালটির আগার দিকে ভরাট করে চাষাবাদ করা হচ্ছে। নীলগঞ্জের টুঙ্গিবাড়িয়া, নীজকাটা, পাখিমারা, নবাবগঞ্জের একই হাল। হাজীর খালটি দখল করে মাছ চাষ করছে সেখানকার এক ছাত্রলীগের কর্মী। টিয়াখালীর অন্তত ১০টি খালের অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে। ভরাট করে সেখানে বাড়িঘর তোলা হয়েছে। চাকামইয়ার তারিকাটার দীর্ঘ খালটিতে অন্তত ২৫টি বাঁধ দেয়া হয়েছে। ডালবুগঞ্জের খাপাড়াভাঙ্গা গ্রামের এক কোরালিয়ার দীর্ঘ ¯øুইস খালটিতে সেখানকার দুলাল হাওলাদার গং আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে নিজের দখলে নিয়েছে। সেখানে এখন অন্য কেউ মাছও শিকার করতে পারছে না। মহিপুরের সুধিরপুর, মুলামের খালের একই দশা। চাকামইয়ার আনিপাড়ার দীর্ঘ খালটিতে বাঁধ আর দখল চলছে এক যুগ আগে থেকে। স্লুইস সংযুক্ত এখালটিতে এখন সাধারণ মানুষ মাছ শিকার করতে পারছে না। প্রভাবশালীরা যা খুশি তাই করছে। এভাবে ফ্রি-স্টাইলে যে যার মতো খাল দখল করে চলছে। কিন্তু প্রত্যেকটি তহশিলের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তারা সরকারের এ স্বার্থ রক্ষায় ন্যুনতম আন্তরিক নয়। উল্টো কোন সচেতন কৃষক কৃষিকাজের স্বার্থে তাদেরকে অবহিত করলে ধমক দেয়া হয়।

কলাপাড়ায় যেভাবে খাল দখল চলছে তাতে খাদ্যে উদ্ধৃত্ত এজনপদে কৃষিকাজে ব্যাপক বিপর্যয় শুরু হয়েছে। কৃষি উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। এবছরই আউশের আবাদ ভেস্তে গেছে। উপজেলা কৃষি অফিসের দু’বছর আগের দেয়া তথ্যানুসারে কলাপাড়ায় বর্তমানে খাদ্য চাহিদার দ্বিগুনের বেশি খাদ্যশস্য উদপাদন হচ্ছে। যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। যার অন্যতম একটি কারণ খাল দখল ও ভরাট। কৃষক মৈত্রির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট বালিয়াতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা মোসাম্মৎ মর্জিনা জানান, খাল ভরাট এবং দখলের কারনে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। কৃষকের বীজতলা থেকে শুরু করে আমনচারা পচে যায়। আর দখলদাররা শুকনো মৌসুমে লোনা পানিতে তলিয়ে দেয় কৃষি জমি। রবিশস্য কিংবা শীতকালীন সবজির আবাদ করতে পারছে না। সকল খালের পানির প্রবাহ সচল রাখতে দখলমুক্ত করা প্রয়োজন বলে এ কৃষক নেত্রীর দাবি। আর এ কারণে কৃষিকাজে বিপর্যয় শুরু হয়েছে।

কুয়াকাটার মাঝিবাড়ি এলাকায় জে এল নং ৩৪ এর লতাচাপলী মৌজার এক নং খাস খতিয়ানের ৪৭৫৬ ও ৪৭৫৭ দাগের একটি খাল ভরাট করে দেড় একর জমি দখল করে নবোদয় হাউজিং কোম্পানি তাদের প্রকল্পভুক্ত করে নেয় ২০০৪ সালের চারদলীয় জোট সরকারের সময়। এনিয়ে তৎকালীন সহকারী কমিশনার ভূমি উদ্ধারে চেষ্টা চালায়। এমনকি নবোদয় হাউজিং লিমিটেডের পক্ষ থেকে ‘সাগর নীড়’ প্রকল্প খাস খতিয়ানের খাল ভরাট করা জমিতে নার্সারী ও উন্নত জাতের শাকসবজি চাষ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ চেয়ে উল্টো ভূমি মন্ত্রনালয়ে আবেদন পর্যন্ত করে। ভূমি অফিসের সার্ভেয়াররা খাল ভরাটে বাধা দেয়নি। উল্টো তারা জমির ধরন পরিবর্তন করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। আজ পর্যন্ত ওই ভরাট খাল উদ্ধার করা হয়নি। সেখানে লাগানো হয়েছে নারিকেল গাছ।

কুয়াকাটার প্রবীণ মানুষেরা জানান, পর্যটন এলাকায় কুয়াকাটার খাল, মাইটভাঙ্গার খাল, কাচারির খাল, ল²ীর খাল, চাপলীর খাল, গোড়া খাল, বসুন খাল, খাজুরার খাল, নয়াপাড়ার খাল, কচ্ছপখালীর খালসহ অন্তত ৬০টি খাল এ ইউনিয়ন থেকে ভরাট করে দখল করে নেয়া হয়েছে। আর এসব ক্ষেত্রে সবাই বেশি দায়ী করছেন ভূমি প্রশাসনকে। খালকে কৃষি জমি দেখিয়ে বন্দোবস্ত দেয়ায় ভরাট ও দখল প্রক্রিয়া বেশি হয়েছে। সর্বশেষ ২০১১ সালের প্রথম দিকে সরকারিভাবে লতাচাপলী, চরচাপলী, কাউয়ারচর ও গঙ্গামতি মৌজার খাস জমি বন্দোবস্ত প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। সরকারি খাল রক্ষায় ও খাস জমি উদ্ধারে ওই নির্দেশনায় বেনামে ভূমিহীন সাজিয়ে বন্দোবস্ত কেসের খাস জমি উদ্ধারে পর্যটন এলাকার ত্রæটিপূর্ণ বন্দোবস্ত কেস শণাক্ত করতে গঠিত বিশেষ কমিটি  কাজ শুরু করে। ২০১১ সালে ভুমি মন্ত্রনালয়ের ৭ এপ্রিলের ২৬৯ নম্বর স্মারকে পটুয়াখালীর জেলাপ্রশাসক ৯ মে এক চিঠিতে এলক্ষ্যে তখন পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়। যার প্রধান হলেন, অতিরিক্তি জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)।

এছাড়া এই কমিটির অন্যান্য সদস্য ছিলেন, রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর পটুয়াখালী, কলাপাড়া ভূমি অফিসের কানুনগো এবং এসএ শাখার সার্ভেয়ার। এছাড়া কলাপাড়ার সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) সদস্য সচিব করা হয়েছে। তখন শুধুমাত্র লতাচাপলী মৌজার আট শতাধিক বন্দোবস্ত কেস শণাক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে এই কাজের অগ্রগতি রহস্যজনকভাবে থমকে আছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়াস্থ উপবিভাগীয় প্রকৌশলী অফিসের দেয়া তথ্যানুসারে কলাপাড়ায় অন্তত ছোট বড় সাত শ’ খাল ছিল। যার অধিকাংশ ভরাট এবং দখল হয়ে গেছে। তারা ২০০১ সালে কলাপাড়া উপজেলার গুরুত্বপুর্ণ ৮৮ টি খাল জরুরি ভিত্তিতে পুনর্খননের জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করেছিলেন। ওই সংখ্যক খাল পুনর্খনন করলে অন্তত ২৫৭ দশমিক ৮০ কিলোমিটার এলাকায় কৃষি কাজের স্বার্থে পানির প্রবাহ থাকত। দৃশ্যমান এ খালগুলো থাকলেও আরও অন্তত পাঁচ শ’ খাল কিংবা খালের শাখা ভরাট ও দখল হয়ে গেছে।

কলাপাড়া উপজেলার ২০১১ সালের ল্যান্ডজোনিং রিপোর্ট অনুসারে উপজেলার লতাচাপলী এবং ধুলাসার ইউনিয়নে মোট জমির পরিমাণ ২৫ হাজার দুই শ’ ৭৩ একর। এর মধ্যে কৃষি জমির পরিমাণ ১৩ হাজার চার শ’ ৪১ একর। কী পরিমাণ কৃষি জমি কমে যাচ্ছে এটি একটি ছোট্ট উদাহরণ মাত্র। শুধুমাত্র খাল দখল করে ভরাটের কারণে কৃষি জমি চাষাবাদের উপযোগিতা হারিয়ে ফেলছে। বর্তমানে যে হারে খাল দখল করে বাড়িঘর কিংবা মাছের ঘের করা হয়েছে তাতে সাগরপারের এ জনপদে কৃষিকাজে মহাবিপর্যয় শুরু হয়ে গেছে। এমনিতে কৃষি জমি কমে যাচ্ছে। তারওপরে কৃষি জমি চাষাবাদের খাল দখল ও ভরাট হয়ে কৃষি উৎপাদনে মহা বিপর্যয় নেমে আসছে।

অভিজ্ঞ মহলের অভিমত ‘কৃষি জমি সুরক্ষা এবং ভূমি ব্যবহার আইনের’ যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরী নইলে সাগরপারের এই জনপদে কৃষি উৎপাদনে ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মসিউর রহমান এব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে কৃষি জমি রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া জরুরি বলে মতামত ব্যক্ত করেন।

কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ল্যান্ড জোনিং কমিটির সদস্য-সচিব দীপক কুমার রায় জানান, কৃষি জমি রক্ষায় সরকারের নির্দেশনা অনুসারে কাজ চলছে।

// প্রতিবেদন/উপকূল বাংলাদেশ/১৭০৯২০১৬//


এ বিভাগের আরো খবর...
বরগুনার পুলিশ লাইন স্কুলে দেয়াল পত্রিকা ‘বেলাভূমি’র যাত্রা শুরু বরগুনার পুলিশ লাইন স্কুলে দেয়াল পত্রিকা ‘বেলাভূমি’র যাত্রা শুরু
আলোকযাত্রা ভোলা দলের উদ্যোগে দু’দিনের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন আলোকযাত্রা ভোলা দলের উদ্যোগে দু’দিনের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন
ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ায় সবুজ উপকূল ২০১৭ কর্মসূচির প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ায় সবুজ উপকূল ২০১৭ কর্মসূচির প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত
কুয়াকাটায় সবুজ উপকূল ২০১৭ কর্মসূচির প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত কুয়াকাটায় সবুজ উপকূল ২০১৭ কর্মসূচির প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত
পটুয়াখালীর চরমোন্তাজে সবুজ উপকূল ২০১৭ কর্মসূচির প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত পটুয়াখালীর চরমোন্তাজে সবুজ উপকূল ২০১৭ কর্মসূচির প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত
ভোলার চরফ্যাসনে সবুজ উপকূল ২০১৭ কর্মসূচির প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত ভোলার চরফ্যাসনে সবুজ উপকূল ২০১৭ কর্মসূচির প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত
গাছের চারা লাগিয়ে আলোকযাত্রা বরগুনা দলের বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন পুলিশ সুপার গাছের চারা লাগিয়ে আলোকযাত্রা বরগুনা দলের বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন পুলিশ সুপার
আলোকযাত্রা দলের পাশে আছি, বললেন বরগুনা পুলিশ সুপার আলোকযাত্রা দলের পাশে আছি, বললেন বরগুনা পুলিশ সুপার
আলোকযাত্রা ভোলা দলের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ আলোকযাত্রা ভোলা দলের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ
সবুজ উপকূল ২০১৭-এর আয়োজন উপকূলের ২০ স্থানে সবুজ উপকূল ২০১৭-এর আয়োজন উপকূলের ২০ স্থানে

সমুদ্রপাড়ে খাল বিলীন, কৃষিকাজে বিপর্যয়!
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)