সুুন্দরবনের অভয়াশ্রয়ে ডলফিন রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেই

সুন্দরবন এলাকায় বিচরণরত ইরাবতী ও শুশুক ডলফিনশরণখোলা (বাগেরহাট) : সাড়ে ৩ বছর আগে ডলফিন ইরাবতি ছিল বিশ্বের বিলুপ্ত প্রজাতির তালিকায়। এখন বাংলাদেশের জল সীমায় সন্ধান মিলেছে ডলফিন ইরাবতির এক নতুন চারণ ক্ষেত্রের। বিশ্বের সর্বচ্চো সংখ্যক ইরাবতি ডলফিন রয়েছে সুন্দরবনসহ বঙ্গোপসাগর উপকুলে। বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট সুন্দরবনের নদ-নদী, সুন্দরবন উপকূল ও বঙ্গোপসাগরের সোয়াস অব নো গ্রাউন্ডসহ ১২০ কি. মি. পর্যন্ত গভীর সমূদ্রে রয়েছে ৫ হাজার ৪শ’ ইরাবতি ডলফিন।

শুধু ইরাবতি ডলফিনই নয়, এখানে আরো ৬ প্রজাতির ডলফিন রয়েছে। গত ৩ বছর আগে এই ডলফিন রক্ষায় সুন্দরবনের ৩ টি এলাকার ৩১ দশমিক ৪ কিলোমিটার নদী ও খালকে ডলফিনের জন্য অভয়াশ্রয় ঘোষণা করে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়। ডলফিন রক্ষার এই ঘোষণা গত ২ বছর ধরে রয়েছে কাগজে-কলমে। এখনো এই অভয়াশ্রয়ে অবাধে চলছে বিভিন্ন প্রকার জাল দিয়ে মাছ শিকার। মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে বন মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া এই অভয়াশ্রয়ের বুক চিরে  চালু হওয়া অভ্যন্তরীন ও আন্তর্জাতিক নৌ-রুট। এ নতুন নৌ-রুট চালুর ফলে হুমকির মুখে পড়েছে ডলফিনের অস্তিত্ব।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সাড়ে ৩ বছর আগে ওয়ার্ল্ড লাইফ কনজারভেশন সোসাইটি, এনওয়াই ও বাংলাদেশ সিটাসিন ডাইভারসিটি প্রজেক্টের দেশী-বিদেশী প্রাণী বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে সুন্দরবনসহ বঙ্গোপসাগরে ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে বিলুপ্ত ইরাবতিসহ ৬ প্রজাতির ডলফিন ও ১ প্রজাতির তিমির সন্ধান পায়।

এরপর ‘প্রক্টেকটেড এরিয়ার নেটওয়ার্কের ফর সিটাসিন ডাইভারসিটি (প্যান সিডি) নামে একটি প্রকল্প তৈরি করে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠায়। ডলফিন রক্ষায় প্যানসিডি প্রকল্প বাস্তবায়নে সুন্দরবনের পূর্ব-উত্তর কোনে ঘাগড়ামারী ক্যাম্প হতে ঢাংমারী ষ্টেশন হয়ে করমজল পেট্রোল পোষ্ট পর্যন্ত ১০ দশমিক ১ কিলোমিটার চ্যানেল, মোংলা বন্দরের নীচে সুন্দরবনের জোংড়া পেট্রোল পোষ্ট থেকে পশুর নদী হয়ে নন্দবালা ও মিরাগামারী ক্যাম্প বরাবর শ্যালা নদী দিয়ে আন্ধারমানিক ক্যাম্প পর্যন্ত ও উরুবুনিয়া খাল হয়ে চাঁদপাই খাল থেকে ১৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার চ্যানেল এবং দুধমুখী ক্যাম্প সংলগ্ন খালের ২ কিলোমিটার উত্তরে বেতমার খাল থেকে বড়শিয়ালা খাল ও দক্ষিনে ভোলা নদী পর্যন্ত ৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার অর্থাৎ সুন্দরবনের সর্বমোট ৩১ দশমিক ৪ কিলোমিটার নদী ও খাল চ্যানেল ফাঁস জাল, কারেন্ট জাল, নেট জাল, বেন্দী জাল ও রেনু পোনা ধরা জাল দিয়ে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করে ডলফিনের জন্য অভায়াশ্রয় কেন্দ্র ঘোষণা করা হয়।

ওয়ার্ল্ড লাইফ কনজারভেশন সোসাইটি, এনওয়াই ও বাংলাদেশ সিটাসিন ডাইভারসিটি প্রজেক্টের প্রাণী বিশেষজ্ঞ রুবায়েত মনসুর জানান, বিলুপ্ত প্রজাতির ইরাবতি ডলফিনের চারণক্ষেত্র আবিষ্কারের সময়ে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় ওই এলাকায় আরও ৫ প্রজাতির ডলফিন ও ১ প্রজাতির তিমির সন্ধান মেলে।

ইরাবতী ছাড়া অন্য ডলফিনের মধ্যে রয়েছে ইন্দো-প্যাসেফিক হাম্প ব্যাক্ট ডলফিন, ফিনলেজ ডলফিন, ইন্দো-প্যাসেফিক বটল নোস ডলফিন, স্পিনার ডলফিন, স্পটেড ডলফিন ও গংগেজ রিভার ডলফিন ছাড়াও রয়েছে ব্রাইডস হোয়েলস নামের এক প্রজাতির তিমি। অনুসন্ধানে ডলফিনের এই নতুন চারণক্ষেত্রের সন্ধান মেলায় গোটা বিশ্বে ডলফিন ইরাবতি ডলফিনের চারণক্ষেত্র হিসেবে পরিচিতি পায়।

প্রাণী বিশেষজ্ঞদের যৌথ অনুসন্ধান জরিপ রিপোর্ট থেকে জানাগেছে, এই ডলফিন চারণক্ষেত সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের নদ-নদীসহ বঙ্গোপসাগরের সোয়াস অব নো গ্রাউন্ডে বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক বিলুপ্ত প্রজাতি ইরাবতি ডলফিন রয়েছে ৫ হাজার ৪শ। এছাড়াও এই জল সীমার ১৩ টি ষ্পটে ৪০টি ইন্দো-প্যাসিফিক হাম্প ব্যাক্ট ডলফিনের দেখা পাওয়া গেছে, উপকূল থেকে ১১ মাইল সুন্দরবনের মধ্যে ১ হাজার ৩৮২ টি ফিনলেস ডলফিন, ১ হাজার ইন্দো-প্যাসিফিক বটল নোস ডলফিন, সুন্দরবন উপকূলের ১৪ টি স্পটে সন্ধান মিলেছে ষ্পিনার ডলফিনের।

তবে ষ্পিনার ডলফিনের সংখ্যা জরিপ রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়নি। সুন্দরবন উপকূলের ৮ টি ষ্পটে সন্ধান মিলেছে ৮শ ষ্পটেড ডলফিনের ও সুন্দরবনসহ উপকূলের ১৩ টি ষ্পটে ২২৫ টি গংগেজ রিভার ডলফিন দেখতে পাওয়া গেছে।

এছাড়া ব্রাইডস হোয়েলস প্রজাতির ৫০ টি তিমির দেখা মিলেছে। প্রাণী বিশেষজ্ঞদের নতুন এই তিমি চারণক্ষেত্রের সন্ধান লাভের খবর ২০০৯ সালের জুন মাসে ইন্টারনেটে দেয়া হলে গোটা বিশ্বের মিডিয়া গুরুত্ব সহকারে প্রচার করে। তবে এখনো দেশী মিডিয়ায় এই বিষয়টি নিয়ে তেমন প্রচার-প্রচারণা নেই।

প্যানসিডি প্রকল্পে বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগরসহ সুন্দরবনের নদ-নদীর পানি, পানির উষ্ণতা ইরাবতি ডলফিনের বংশ বৃদ্ধির জন্য খুবই সহায়ক। তবে ফারাক্কা বাঁধের কারণে গঙ্গার পানি প্রবাহ এখন সুন্দরবনে কম আসা ও সমূদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি এই এলাকায় চিংড়ির রেনু পোনা আহরণে কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহারের ফলে ইরাবতি ডলফিনের বংশ বৃদ্ধি এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ কামাল আহমেদ চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, সুন্দরবনের ৩১ কিলোমিটার ডলফিনের অভয়াশ্রয়ের বুক চিরে এখন অভ্যান্তরীন ও আন্তর্জাতিক নৌ-রুটের বার্জ কার্গো ও অয়েল ট্যাংকার চলাচল করছে। বন মন্ত্রণালয়ের কোন অনুমোদন ছাড়াই নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে  অভ্যান্তরিণ নৌ-রুট চালু করায় চরম হুমকির মুখে পড়েছে ডলফিনের সংরক্ষণ ও প্রজোনন। আন্তমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে বন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিষয়টি উত্থাপন করা হলেও এখনো এর কোন সমাধার মেলেনি। এই নৌ-রুট এখন ডলফিনের জন্য থ্রেট হিসেবে দেখা দিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, সুন্দরবনসহ উপকূলে ডলফিনের নতুন অভায়শ্রমের সন্ধান মেলায় গত সাড়ে ৪ বছর ধরে পূর্ব সুন্দরবনে ইকো-ট্যুরিজমে রেকর্ড সংখ্যক দেশী-বিদেশী পর্যটক আসছে প্রায় ৩ লাখ। পর্যটকদের অন্যতম আকর্শনীয় বিষয় হচ্ছে ডলফিন।

//শেখ মোহাম্মদ আলী/ উপকূল বাংলাদেশ/শরণখোলা-বাগেরহাট/২৫১২২০১৫//


এ বিভাগের আরো খবর...
‘কুকরির জনারণ্যে সম্প্রীতির সুবাতাস’ -আবুল হাসেম মহাজন ‘কুকরির জনারণ্যে সম্প্রীতির সুবাতাস’ -আবুল হাসেম মহাজন
বরগুনায় বাণিজ্যিক সূর্যমুখী চাষে লাভবান কৃষক বরগুনায় বাণিজ্যিক সূর্যমুখী চাষে লাভবান কৃষক
পাইকগাছার পড়ুয়ারাদের প্রকৃতিপাঠ, সবুজে গড়ছে জীবন পাইকগাছার পড়ুয়ারাদের প্রকৃতিপাঠ, সবুজে গড়ছে জীবন
উপকূলের উদীয়মান সংবাদকর্মী ছোটন সাহা’র ছুটে চলার গল্প উপকূলের উদীয়মান সংবাদকর্মী ছোটন সাহা’র ছুটে চলার গল্প
কমলনগরে পড়ুয়াদের সবুজ জগত, অনুপ্রেরণায় ‘সবুজ উপকূল’ কমলনগরে পড়ুয়াদের সবুজ জগত, অনুপ্রেরণায় ‘সবুজ উপকূল’
শ্যামনগরে পড়ুয়ারা গড়ে তুলেছে পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন শ্যামনগরে পড়ুয়ারা গড়ে তুলেছে পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন
জনতার প্রিয় মানুষ এমপি মুকুল জনতার প্রিয় মানুষ এমপি মুকুল
একুশে বইমেলায় সাংবাদিক ছোটন সাহার ‘মেঘের আঁধারে’ একুশে বইমেলায় সাংবাদিক ছোটন সাহার ‘মেঘের আঁধারে’
‘সমৃদ্ধশালী মডেল ঢালচর গড়তে চাই’ : আবদুস সালাম হাওলাদার ‘সমৃদ্ধশালী মডেল ঢালচর গড়তে চাই’ : আবদুস সালাম হাওলাদার
কুয়াকাটায় জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সাংবাদিক প্রশিক্ষণ সমাপ্ত কুয়াকাটায় জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সাংবাদিক প্রশিক্ষণ সমাপ্ত

সুুন্দরবনের অভয়াশ্রয়ে ডলফিন রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেই
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)