রিং বাঁধ রামনাবাদ পাড়ের চাষিদের ভাগ্য বদলে দিল

মেজবাহউদ্দিন মান্‌নু

কলাপাড়ার রামনাবাদের তীরে আমনের বাম্পার ফলনকলাপাড়া (পটুয়াখালী) : তিনটি বছরের দুর্বিষহ খাদ্যাভাবের লাঘব কাটাতে পেরে রামনাবাদ পাড়ের নয়টি গ্রামের শত শত কৃষক পরিবারে এখন বইছে স্বস্তির সু-বাতাস। পর পর তিনটি বছর মাইলের পর মাইল কৃষি জমি অনাবাদী পড়ে ছিল। ঘরে তুলতে পারেনি এক ছটাক খোরাকি ধান। তিন বছরের ধার-কর্জ দেনার ভারে কাহিল মানুষগুলো এবছর বাম্পার ফলন পেয়ে মহাখুশি। অনাবাদি মাঠে ভরা সোনালি ধান। যেন ধানের ভারে নুইয়ে পড়ছে ধান গাছ।

এবছর সারা বছরের খোরাকি ধান ঘরে তুলবেন এমন বাস্তবতা এসব মানুষের কাছে যেন স্বপ্নের বাস্তব প্রতিফলনের মতো। কেউ ধান কাটছেন। কেউ কাটার অপেক্ষায় রয়েছেন। মোট কথা তিনটি বছর অনাবাদি থাকা ধুসর মাঠে এখন আমন ধানে একাকার। কেউ কেউ বলছেন গত এক যুগের মধ্যে এতো ভাল ফলন তারা আর দেখেননি। কানি জমিতে (আট বিঘা) সর্বনিম্ন এক শ’ মণ থেকে কেউ কেউ দেড় শ’ মণ ধান পাওয়ার আশা ব্যক্ত করেছেন।

রামনাবাদ পাড়ের চারিপাড়া, পশুরবুনিয়া, বানাতিপাড়া, নেওয়াপাড়া, নয়কাটা, চৌধুরীপাড়া, মঞ্জুপাড়া, ছোট পাঁচ নং, বড় পাঁচ নং গ্রামগুলোতে অন্তত দেড় হাজার কৃষক পরিবারের সদস্যরা এখন আমন ধান কাটা নিয়ে মহাব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তিনটি বছর এ মানুষগুলোর বিবর্ণ মুখে ছিল বিষাদের ছাপ। ধার-দেনায় একেকটি দিনের খাবার জোটাতে হয়েছে। তিন বছর আগে চারিপাড়া সংলগ্ন বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয়ে এসব কৃষকের এমন সর্বনাশ হয়ে যায়। তিনটি বছর ফলাতে পারেনি আমন ফসল। একমাত্র আমন ফসল নির্ভর কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েন।

এ বছর ভাঙ্গা দু’টি স্পটে রিং বেড়িবাঁধ করায় আপাতত দুর্ভোগ কাটল। যার সুফল হিসাবে আমনের বাম্পার ফলন পেয়ে দেড় সহস্রাধিক কৃষক পরিবারে বইছে এখন আনন্দের বন্যা। সরকারের এমন উদ্যোগের কারণে এসব কৃষক পরিবার যেন ঘুরে দাড়িয়েছে। ফের কোমর সোজা করে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে। যেসব মানুষগুলো বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় ছিল তারাও ফের সংসার সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

সত্তর বছর বয়সী কৃষক আদম আলীর বাড়ি পশুরবুনিয়া গ্রামে। জানালেন, পরপর তিনটি বছর তার ছয় বিঘা জমিতে এক ছটাক আমন ধান ফলাতে পারেন নি। তার ভাষায়, ‘ জমি সব খিল (অনাবাদি) আছিল। বীজ ধানের টাহাও গ্যাছে। দেনা অইছি এক লাখেরও বেশি। সাত জনের সংসারে খোরাহি আছিল না। এই বছর যা দেহা যায় কড়ায় (তিন শতক) এক মন ধান পামু।’ মানুষটির চোখে-মুখে স্বস্তির ছাপ লেগে আছে। আদম আলীর দাবি কেউ কেউ কানি জমিতে (৮বিঘা) এক-দেড় শ’ মণ ধান পাবে।

বাবুল হাওলাদার আবাদ করেছেন ২৪ বিঘা, মজিবর মোল্লা ১২ বিঘা, আবু হাওলাদার ৩০বিঘা, মোশাররফ হাওলাদার ৪০ বিঘা। সবার মন্তব্য তিন বছর পরে ধানের ফলন পেয়ে তারা খুবই খুশি। এলাকার মেম্বার চারিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মজিবর রহমান জানান, তিন বছর পর তার ৩২ বিঘা জমি আবাদ করতে পেরেছেন। তার দাবি মানুষ কোটি কোটি টাকার ফসল পাচ্ছে। তা ছাড়া রাস্তাঘাট দিয়ে অন্তত পায়ে হাটা যায়। জোয়ারে ডুবছেনা। ফের হাস-মুরগি পালন করতে পারছে।

মোট কথা নয়টি গ্রামের দেড় হাজার পরিবারে ফের জীবনের ছন্দ ফিরে এসেছে। তবে প্রত্যেকের শঙ্কা এবছর যদি আবার ওই রিং বাঁধটি বিধ্বস্ত হয়, তাইলে ফের সব ডুবে যাবে লোনা পানিতে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মসিউর রহমান জানান, রামনাবাদ পাড়ের ওই জমি তিনটি বছরের প্লাবনে জমে থাকা পলিমাটির কারণে জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি পয়েছে। পাশাপাশি কৃষকরা উন্নত জাতের ধান চাষ করেছে। ব্যবহার করেছে সুষম মাত্রার সার ও কীটনাশক। ফলে তারা বাড়তি ফলন পাচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের জানান, রামনাবাদ পাড়ের বিধ্বস্ত বাঁধ এলাকায় দু’টি স্পটে দুই দশমিক ৬৮ কিলোমিটার রিং বেড়িবাঁধ জরুরি ভিত্তিতে করা হয়েছে। আগস্ট মাসে এ বাঁধ করা হয়। যার জন্য ব্যয় হয়েছে এক কোটি সাত লাখ টাকা।

এলাকার চেয়ারম্যান মীর তারিকুজ্জামান জানান, মাত্র এক কোটি টাকা ব্যয় করায় কৃষকের অর্ধশত কোটি টাকার ফসল উৎপাদনের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। তবে প্রতি বছর বাঁধটি রক্ষায় কৃষকের স্বার্থে মেরামত করা প্রয়োজন রয়েছে।

//মেজবাহউদ্দিন মাননু/উপকূল বাংলাদেশ/কলাপাড়া-পটুয়াখালী/১৮১২২০১৫//


এ বিভাগের আরো খবর...
জনতার প্রিয় মানুষ এমপি মুকুল জনতার প্রিয় মানুষ এমপি মুকুল
একুশে বইমেলায় সাংবাদিক ছোটন সাহার ‘মেঘের আঁধারে’ একুশে বইমেলায় সাংবাদিক ছোটন সাহার ‘মেঘের আঁধারে’
‘সমৃদ্ধশালী মডেল ঢালচর গড়তে চাই’ : আবদুস সালাম হাওলাদার ‘সমৃদ্ধশালী মডেল ঢালচর গড়তে চাই’ : আবদুস সালাম হাওলাদার
কুয়াকাটায় জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সাংবাদিক প্রশিক্ষণ সমাপ্ত কুয়াকাটায় জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সাংবাদিক প্রশিক্ষণ সমাপ্ত
তৃতীয়বারের মত ডিআরইউ অ্যাওয়ার্ড পেলেন রফিকুল ইসলাম মন্টু তৃতীয়বারের মত ডিআরইউ অ্যাওয়ার্ড পেলেন রফিকুল ইসলাম মন্টু
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় ‘সবুজ উপকূল’ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় ‘সবুজ উপকূল’
সবুজ উপকূল, সাগরপাড়ে আলোর হাতছানি সবুজ উপকূল, সাগরপাড়ে আলোর হাতছানি
‘সবুজ উপকূল’ পড়ুয়াদের সৃজনশীল মেধার বিকাশ ঘটাচ্ছে ‘সবুজ উপকূল’ পড়ুয়াদের সৃজনশীল মেধার বিকাশ ঘটাচ্ছে
‘সবুজ উপকূল’-এর পথে হাঁটছে অসংখ্য সবুজযোদ্ধা ‘সবুজ উপকূল’-এর পথে হাঁটছে অসংখ্য সবুজযোদ্ধা
উপকূল বাঁচিয়ে রাখতে ‘সবুজ উপকূল’ মাইলফলক উপকূল বাঁচিয়ে রাখতে ‘সবুজ উপকূল’ মাইলফলক

রিং বাঁধ রামনাবাদ পাড়ের চাষিদের ভাগ্য বদলে দিল
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)